চাকরি গেল আলোচিত ৬ পুলিশ কর্মকর্তার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেষ পর্যন্ত চাকরি হারালেন আলোচিত ছয় পুলিশ কর্মকর্তা। কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত ও পলায়নের অভিযোগে তাদের চাকরিচ্যুত করেছে সরকার। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সহকারী কমিশনার গোলাম রুহানী। গোলাম রুহানী কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ছোট ভাই। গতকাল বুধবার রাষ্ট্রপতির (ভারপ্রাপ্ত) অনুমোদনের পর এ বিষয়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।
চাকরি হারানোদের তালিকায় আরও রয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা; একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না’, বলে আলোচনায় আসা মো. ইকবাল হোসাইনও। ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের সাবেক এই উপকমিশনার (ডিসি) সর্বশেষ খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত তিনি।
বরখাস্ত হওয়া অন্য কর্মকর্তারা হলেন— বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীম এবং কক্সবাজার এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বরখাস্ত হওয়া এই ছয় কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। এর পরিপ্রেক্ষিতে কারণ দর্শানোর পাশাপাশি তাদের কর্মস্থলে হাজির হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরও যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিতির মেয়াদ ৬০ দিনের বেশি হওয়ায় এই ছয়জনের বিরুদ্ধে অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। পরে বিভাগীয় মামলার তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩ (খ) ও ৩ (গ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়নের’ অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিধি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মতামতের ভিত্তিতে ‘গুরুদণ্ড’ হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সবশেষ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪ (৬) বিধি অনুসারে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাদের ‘চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের’ গুরুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে ইকবাল হোসাইনের কথোপকথনের একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ৪৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে তাকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়। ইকবাল হোসাইন বলেছেন, ‘গুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।’ ওই ভিডিওতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঘিরে পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ও স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর আলমকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের সামনে ইকবাল হোসাইন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মোবাইল ফোনে একটি ভিডিও দেখাচ্ছিলেন। এ সময়ই তিনি আলোচিত কথাগুলো বলেন।
ঊর্ধ্বতন ২৩ কর্মকর্তাকে রদবদল: পুলিশের ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজিসহ ঊর্ধ্বতন ২৩ কর্মকর্তাকে গতকাল একযোগে বদলি ও নতুন দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে আলাদা চারটি প্রজ্ঞাপনে তাদের বদলি ও পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ঢাকার হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ফরিদা ইয়াসমিনকে সংযুক্ত করা হয়েছে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে। হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মীর মোদ্দাছছের হোসেনকে পদায়ন করা হয়েছে রাজশাহীর সারদা বিপিএতে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে।
হাইওয়ে পুলিশের সুপার (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খানকে করা হয়েছে ঢাকা এসবির পুলিশ সুপার (সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি)। হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিমকে এপিবিএনের পুলিশ সুপার এবং পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার হিসেবে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া এপিবিএনের পুলিশ সুপার দীপক জ্যোতি খীসাকে হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার এবং র্যাবের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ছালেহ উদ্দিনকে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
আলাদা আরেক প্রজ্ঞাপনে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনকে করা হয়েছে গাজীপুরের পুলিশ সুপার। গাজীপুরের বর্তমান পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিনকে বদলি করা হয়েছে হাইওয়ে পুলিশে।
সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মো. আমিরুল ইসলামকে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে হাইওয়ে পুলিশে এবং খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে এপিবিএনে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার পুলিশ স্টাফ কলেজের পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুককে খুলনা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া আলাদা আরও দুটি প্রজ্ঞাপনে ডিআইজি, উপ-পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার ও বিশেষ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১০ কর্মকর্তাকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারি করা এসব বদলি ও পদায়নের আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।




