খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও মিলছে না পুষ্টি, বাড়ছে ঝুঁকি
- জিইডির মূল্যায়নে অনিরাপদ খাদ্যের চিত্র

একটি খামারে গুদাম থেকে গমের দানা ট্রাকে তুলছেন এক কর্মী। ছবি : রয়টার্স
সবুজ শস্যে ভরা মাঠ। কৃষকের ঘরে নতুন ধান। ভাণ্ডার উপচে পড়ছে খাদ্যশস্যে। কিন্তু সেই খাবারে কি মিলছে জীবনের আসল স্বাদ? নাকি অজান্তেই শরীরে ঢুকছে মরণব্যাধি? দেশে উৎপাদন বাড়লেও থালায় মিলছে না প্রয়োজনীয় পুষ্টি। উৎপাদনে বাংলাদেশ গড়ছে নতুন ইতিহাস।
অথচ প্রাচুর্যের আড়ালে ভয়াবহ এক সংকট এখন দেশের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে। উৎপাদন ভালো হলেও অনিরাপদ খাদ্যের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে খোদ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) মূল্যায়নে। ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে তুলে ধরা হয়েছে এসব বিষয়।
জিইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দেশে বাড়ছে খাদ্য উৎপাদন; কিন্তু কমছে পুষ্টি। যে কারণে ১ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ ভুগছেন তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায়। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় আছে সাড়ে ৩ কোটি মানুষ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৪ শতাংশ খর্বকায় এবং ১২ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু কৃষ্ণকায়।
পাশাপাশি প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ ভোগেন রক্তস্বল্পতায়। যদিও বাংলাদেশ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করে চাল উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। সেই সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ তিন চাল উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে নিয়েছে স্থান করে।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সর্বত্র সমানভাবে বিস্তৃত নয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খাদ্যনিরাপত্তাহীন জেলাগুলো উপকূলীয়, চরাঞ্চল, হাওর এলাকা, পার্বত্য অঞ্চলে। এ ছাড়া বস্তি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত অনিরাপদ খাদ্য। দেশ যে খাদ্যনিরাপত্তা সংকটের সম্মুখীন, তা মূলত খাদ্য বণ্টন, সহজলভ্যতার অভাব, খাদ্যাভ্যাস এবং সুশাসনের সংকটের কারণেই। ফ্রেমওয়ার্কে কৃষির ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা খামার থেকে শুরু করে পরিবারের খাবার টেবিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
জিইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ আয় করাসহ সব আয় স্তরের মানুষের মোট ক্যালরি গ্রহণের ৭০ শতাংশই আসে ভাত থেকে। এটি প্রমাণ করে, খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্য আয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৬০ শতাংশের ভিটামিন-এ গ্রহণ সুপারিশ করা মাত্রার (প্রয়োজনের) নিচে। প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের আয়রন গ্রহণ অপর্যাপ্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৪০ শতাংশের জিঙ্ক গ্রহণ অপর্যাপ্ত। এগুলো এমন একটি খাদ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য, যা পর্যাপ্ত ক্যালরি উৎপাদনে সফল হলেও পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণ উৎপাদনে ব্যর্থ হয়েছে।
বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় লক্ষ্য নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা রয়েছে। প্রধান সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো থেকে পাওয়া সুবিধার ৩০-৪০ শতাংশ দরিদ্র নয় এমন পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছায়। এ ছাড়া খাদ্যমূল্যের অস্থিরতা এই প্রাপ্তির ব্যর্থতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। মঙ্গা মৌসুমে বার্ষিক গড়ের চেয়ে ৮ থেকে ১২ শতাংশ বেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। খাতভিত্তিক পূর্বাভাসে আরও দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যা মজুরিনির্ভর পরিবারগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখছে। যাদের প্রকৃত কৃষিমজুরি ২০২০ সাল থেকে ধানের দামের তুলনায় কমছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা আগামীর সময়কে বললেন, ‘উৎপাদন পর্যায়ের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আমাদের। কোনো খাদ্য উৎপাদন করতে গেলে বালাইনাশক ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সেটি পরিমিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। কৃষক পর্যায়ে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া নির্দেশনা রয়েছে, কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহারের সাত দিন কিংবা নির্দিষ্ট সময়সীমা পর হারভেস্ট (ফসল তোলা) করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকরা সেটি মানছেন না। ফলে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।’
‘পুষ্টির বিষয়টি আমরা দেখি না। এটি দেখার জন্য সরকারি অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। সেগুলোকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে’— যোগ করলেন গোলাম মোস্তফা।
ফ্রেমওয়ার্কে জিইডি আরও বলেছে, গণখাদ্য বিতরণব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। যেটি বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অন্যতম উপকরণ। এর অন্তর্ভুক্ত কর্মসূচিগুলো হলো উন্মুক্ত বাজারে বিক্রয় (ওএমএস), দুর্বল জনগোষ্ঠী উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচি, দুর্বল জনগোষ্ঠী পুষ্টি কর্মসূচি (ভিজিএফ), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (এফএফপি) এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক খাদ্য সহায়তা। সরকার অনুমোদিত ডিলারদের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে ভর্তুকিযুক্ত চাল ও গমের আটা বিক্রির কর্মসূচি ওএমএস ২০২২-২৪ সালের মুদ্রাস্ফীতি সংকটের সময় সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ হিসেবে প্রমাণিত হয়। ওই সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর আওতায় ১ কোটি ২২ লাখ পরিবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে জিইডি বলেছে, চলতি বছরের ১০ মার্চ ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা ৯৯টি কর্মসূচিকে একীভূত করে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে সরকার। এটি নারী পরিবার প্রধানের নামে নিবন্ধিত এবং পিএফডিএস সংস্কার বাস্তবায়নের একটি প্ল্যাটফর্ম। এই ফ্যামিলি কার্ড খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার হবে।
কেন অনিরাপদ হচ্ছে খাদ্য: খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে অতিরিক্ত মুনাফার লোভ, সচেতনতার অভাব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর শিথিলতার কারণে অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষি ও খামার পর্যায়ে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক, বালাইনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া চাষের জমিতে কীটনাশক এবং পোলট্রি মুরগি, মাছ ও প্রাণিসম্পদে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে।
যদিও উৎপাদক ও কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত অনেকের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ও সচেতনতা নেই। দেশে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ তদারকির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জনবলসহ নানা সংকটে নিয়মিত নজরদারি করতে পারছে না। এ ছাড়া বেশি মুনাফা লাভের আশায় দেশে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যদ্রব্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ফরমালিন ও ভেজাল উপাদান মেশাচ্ছেন।
জিইডি বলেছে, ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন এবং বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য সংস্কার আসে। আইনগত কাঠামোটি বিদ্যমান। তবে তা কার্যকর করার সক্ষমতা নেই। দেশ জুড়ে প্রায় ৫০০ জন পরিদর্শক এবং লাখ লাখ খাদ্য ব্যবসায়ীর উপস্থিতির কারণে, বর্তমান জনবল দিয়ে সরবরাহ শৃঙ্খল জুড়ে পদ্ধতিগত খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব নয়।
দেশের খাদ্য পরিবেশে ভেজাল, তাজা পণ্যে কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ভারী ধাতুর দূষণ এবং খুচরা ও রেস্তোরাঁ পর্যায়ে অণুজীবঘটিত দূষণ উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। এগুলো ভোক্তা সুরক্ষায় ব্যর্থতা এবং একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারের ব্যর্থতা, চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রত্যাখ্যানের হার সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
খাদ্যনিরাপদ রাখতে নতুন উদ্যোগ: ফ্রেমওয়ার্কে খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এফডিসিএ) গঠনের কথা বলা হয়েছে। এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, যা খাদ্যনিরাপত্তা এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রণের কার্যাবলিকে একটি একক ও পর্যাপ্ত ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থার অধীনে একীভূত করবে। এটি নিরাপদ খাদ্য আইনের ম্যান্ডেট এবং বিএফএসএর বাস্তব কার্যকারিতার মধ্যকার ব্যবধান পূরণের জন্য প্রয়োজনীয়। এফডিসিএ ভারী ধাতুর দূষণ এবং কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মতো খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ডিজিডিএ এবং বিএফএসএর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করবে।
তবে, খাদ্য ব্যবসায় যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে এফডিসিএর জন্য একটি নতুন সংসদীয় আইন অথবা নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর সংশোধনী প্রয়োজন।
এ ছাড়া এফডিসিএ পরিদর্শক বছরে ১ হাজার ২০০ প্রশিক্ষিত পরিদর্শক এবং ২০৩১ অর্থবছরের মধ্যে ২ হাজার পরিদর্শক নিয়োগ হবে। জাতীয়ভাবে খাদ্য ব্যবসা পরিচালনাকারী ডেটাবেজ করা হবে। এর বাইরে ২০৩১ সালের মধ্যে তিনটি বিভাগীয় শহরে সুসজ্জিত বিভাগীয় খাদ্যনিরাপত্তা পরীক্ষাগার নেটওয়ার্ক এবং ৩২টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জেলায় র্যাপিড টেস্টিং ইউনিট স্থাপন করা হবে। রপ্তানি খাদ্যনিরাপত্তাও করা হবে সমন্বয়।







