৫০০ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের অগ্রগতি নেই
বন্যা আসে ধেয়ে, প্রকল্প চলে ধীরে
- বিশ্বব্যাংকের ঋণে বাস্তবাবয়ন হচ্ছে দুর্যোগ ঝুঁকি ও ক্ষতি কমানোর প্রকল্প
- সরকারি অংশে ব্যয় বেড়েছে ৩৩৩ শতাংশ
- প্রায় তিন বছরে অগ্রগতি ৭ দশমিক ১০ শতাংশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বন্যা এখন দেশের প্রায় নিয়মিত প্রকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। কখনো কখনো অসময়েও ডুবছে কিছু কিছু এলাকা। এ অবস্থায় সারা দেশে প্রথমবারের মতো ৫০০ বন্যা আশ্রয় নির্মাণসহ দুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এজন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণে হাতে নেওয়া হয় অভিযোজন বৃদ্ধি ও পল্লী ঝুঁকি হ্রাসকল্পে টেকসই অবকাঠামো (রিভার) প্রকল্প। কিন্তু নানা কারণে গতিহীন হয়ে পড়েছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের আর্থিক ৫ দশমিক ৭৭ এবং বাস্তব অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ১০ শতাংশে।
এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকার পর সম্প্রতি প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এতে সরকারি অংশের খরচ বেড়েছে ৩৩৩ শতাংশ। তবে মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। এ অবস্থায় নির্দিষ্ট মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শতভাগ বাস্তবায়ন শঙ্কার মুখে পড়েছে।
পরিকল্পনা সচিব এসএম শাকির আকতার আগামীর সময়কে জানান, অন্তবর্তী সরকারেরও সুপারিশ ছিল। আমরা বর্তমান সরকারের সময়ও গুরুত্ব বিবেচনা করে অনুমোদন দিয়েছি। আশা করছি এবার বাস্তবায়নে গতি বাড়বে। কারণ যেসব সমস্যা ছিল সেগুলো প্রথম সংশোধনীর সময়ই সমাধান করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিক্স ইনডেক্স অনুযায়ী ২০০০-২০১৯ সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে সপ্তম স্থানে বাংলাদেশ। ১৯৯৮ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ অঞ্চল, ২০১৭ সালের বন্যায় ৩২টি জেলা ও ২০১৯ সালের বন্যায় ২৮টি জেলা প্লাবিত হয়। ২০২০ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং ৩৩টি জেলা বন্যা কবলিত হয়। এতে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় নিম্নাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে গৃহহীন লোকেরা আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় উচ্চভূমি, সড়ক বা বেড়িবাঁধের মতো অবকাঠামো ব্যবহার করে। এতে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে মানবেতর জীবন যাপন করেন তারা। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতেই প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়।
স্থানীয় সরকার বিভাগ জানায়, প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৩২৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৪৮ কোটি ৪৭ লাখ এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছিল ৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধনীতে ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় করা হয়েছে ৫ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। এতে সরকারি তহবিলের ব্যয় ১৬৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ২১০ কোটি টাকা। আর বিশ্বব্যাংকের ঋণের ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা বেড়ে হয় ৫ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। শুরু থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ২৪৯ কোটি টাকা, আর্থিক অগ্রগতি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানান, স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পাওয়ার পর অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করে পরিকল্পনা কমিশন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এটির সংশোধনী আটকে যায়। বৈদেশিক ঋণ থাকায় অনুমোদনের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হলেও অজ্ঞাত কারণে অন্তবর্তী সরকারের আমলে আটকে যায় অনুমোদন। তখনকার পরিকল্পনা উপদেষ্টা শেষ কার্যদিবসের আগে এটি অনুমোদন দেওয়ার সুপারিশ করেন। কিন্তু বিএনপি সরকার আসলে আবারও অজ্ঞাত কারণে ঝুলে যায় অনুমোদন। অবশেষে সম্প্রতি প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব কারণেও অগ্রগতি কম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হলো, ৫০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ। এ ছাড়া অন্য প্রকল্পে অসমাপ্ত ২১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম দুর্যোগ কেন্দ্র তৈরি, গবাদি পশুর আশ্রয়ের জন্য সর্বোচ্চ বন্যা লেভেলে ওপরে ২৫০টি বিদ্যালয়ের মাঠ নির্মাণ এবং ২৭৫ কিলোমিটার আশ্রয়কেন্দ্র সংযোগ সড়ক উন্নয়ন করা। আরও আছে, ১ হাজার ৮৩০ মিটার ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণ, ৩৩১ কিলোমিটার কমিউনিটি রাস্তা ও গ্রোথ সেন্টার উন্নয়ন এবং ১৫টি ঘাট উন্নয়ন করা।
প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীর কারণ প্রসঙ্গে এলজিইডি জানিয়েছে, মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) বিশ্বব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৫০ কোটি ডলার নির্ধারিত ছিল। কিন্তু এর ঋণ কমিয়ে ৪৪ কোটি ডলার করে বিশ্বব্যাংক। কমানো ঋণের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য প্রকল্পটি সংশোধন করা দরকার ছিল। এ ছাড়া ঋণের পরিমাণ কমলেও মুদ্রা বিনিময় হার বাড়ায় উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে অতিরিক্ত কাজ অন্তর্ভুক্তি, রেট শিডিউল পরিবর্তন, ভ্যাট ও আইটি দেওয়ার হার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় বাস্তবতার ভিত্তিতে কমিউনিটি রাস্তা এবং বাঁধ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ’ প্রকল্পের অসম্পূর্ণ ২১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণকাজ এই প্রকল্পের আওতায় সম্পন্ন করা হবে।
যেসব উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে
দেশের ১৫ জেলার ৯০টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন এলাকাগুলো হলো, ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী, নগরকান্দা, ভাঙ্গা, চরভদ্রাসন, সালথা, মধুখালী, সদরপুর, ফরিদপুর সদর উপজেলা। এ ছাড়া রাজবাড়ী জেলা সদর, গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, কালুখালী, পাংশা। মাদারীপুর জেলা সদর, রাজৈর, শিবচর, কালকিনি উপজেলা। গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়া, টুংগীপাড়া, কাশিয়ানী এবং মুকসুদপুর।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলি, মিরসরাই, রাউজান, সাতকানিয়া, সীতাকুন্ড, বাশখালী, ফটিকছড়ি এবং পটিয়া উপজেলা। বগুড়ার সারয়িাকান্দি,গাবতলী, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলা। পাবনার ভাঙ্গুরা,বেড়া, চাটমোহর, এবং সুজানগর উপজেলা। সিরাগঞ্জের বেলকুচি, কাজীপুর, শাহজাদপুর, সদর, তাড়াশ, উল্লাপাড়া এবং চৌহালী উপজেলা। রংপুরের গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ,কাউনিয়া, পীরগাছা এবং পীরগঞ্জ। নীলফামারীর সৈয়দপুর, ডোমার, কিশোরগঞ্জ এবং নিলফামারী সদর। গাইবান্ধার স্যাদুল্লাহপুর, সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি এবং গাইবান্ধা সদর। কুড়িগ্রামের সদর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ি, রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী এবং রৌমারী উপজেলা। লালমনিরহাটের সদর, কালীগঞ্জ, হাতিবান্ধা এবং পাটগ্রাম। সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দ্বিরাই, জগন্নাথপুর, ধর্মপাশা, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ, শাল্লা এবং তাহিরপুর। হবিগঞ্জ জেলার আজমেরিগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, হবিগঞ্জ সদর এবং শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা।







