বাণিজ্য গতিশীলে করা বাণিজ্য আদালত গতিহীন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিশেষায়িত ‘বাণিজ্যিক আদালত’ প্রতিষ্ঠা করা হলেও নেই পৃথক বিচারক ও অবকাঠামো সুবিধা। এমন আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রচারের অভাব এবং নতুন আদালতে মামলা পরিচালনায় অনাগ্রহ রয়েছে আইনজীবীদেরও।
ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন গতিশীল করার যে ভাবনা থেকে এমন আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে অনেকটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও।
বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠায় চলতি বছর ১ জানুয়ারি অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। অধ্যাদেশটি পরে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬’ এর মাধ্যমে আইনে পরিণত হয়। আইনটি ১০ এপ্রিল ২০২৬ প্রণীত হলেও এর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে।
এতে বলা হয়, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রজ্ঞাপন দিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাণিজ্যিক আদালত গঠন করবে। কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রজ্ঞাপন দিয়ে বাণিজ্যিক আদালতের ভৌগোলিক এখতিয়ার নির্ধারণ করবে এবং সময় সময় এখতিয়ারের সীমানা বৃদ্ধি, হ্রাস বা পরিবর্তন করতে পারবে। বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজদের মধ্য থেকে বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক নিযুক্ত হবেন।
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বাণিজ্যিক আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে আপিল ও রিভিশন শুনানির জন্য হাইকোর্টে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক আপিল বেঞ্চ গঠন করে দেবেন। আইনের ১৩ ধারায় বলায় হয়েছে, ‘সরকার বা, ক্ষেত্রমত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ, বাণিজ্যিক আদালতের কার্যক্রম নির্বিঘ্নভাবে পরিচালনার জন্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব করিবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করিবে।’ এই আইনের আলোকে গত ১ মার্চ সরকার সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ক্রমে সারা দেশে ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালত গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু এসব আদালতের জন্য এখনো কোনো পৃথক বিচারকের পদ সৃজন করা এবং পৃথক অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে নবগঠিত ৭৫টি বাণিজ্যিক আদালতে ‘অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ’ পদমর্যাদার বিচারকরা নিজ আদালতের দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এসব আদালতের জন্য বিচারকের পদ সৃজনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। পদ সৃজন হলেই বিচারক নিয়োগ করা হবে এসব আদালতে। বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত পরিচালনায় বিচারকের পাশাপাশি আছে অবকাঠামো সংকট। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সারা দেশে বিচারিক আদালতে বর্তমানে ২৩৫০ জনের বেশি বিচারক কর্মরত। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে কমপক্ষে ২৫০ জনের বেশি বিচারক বিচারকক্ষ ভাগাভাগি করে বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক জায়গা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক বিরোধ এসব আদালতে মীমাংসা হওয়ার কথা। ফলে এসব আদালত বিশেষভাবে সজ্জিত করা ও অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ রাখা হবে। আদালত প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ভাড়া করা ভবনে বাণিজ্যিক আদালতের কার্যক্রম শুরুর বিষয়টিও বিবেচনা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না হওয়ায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
এ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করতে ব্যাপকভাবে আগ্রহী কিছু উন্নয়ন সহযোগী। এর মধ্যে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএনডিপি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। কিন্তু বিচারকের পদ সৃজন না হওয়া এবং পৃথক অবকাঠামো না থাকায় উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতাও সঠিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
রেজিস্ট্রার জেনারেল বললেন, বাণিজ্যিক আদালত পরিচালনার জন্য শুধু বিচারক নিয়োগ করলেই হবে না; তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বাণিজ্যিক আইন, বিশেষ করে মার্কেন্টাইল ল’ বিষয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন বিচারকদের এসব আদালতে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন আইন ও আদালত সম্পর্কে প্রচারের অভাব আছে। পাশাপাশি বিশেষায়িত আদালতে মামলা পরিচালনার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদেরও আগ্রহ কম। নতুন আদালতে মামলা পরিচালনা করতে নতুন আইন জানতে হয় এবং নতুন করে মামলা ড্রাফটিং করতে হয়। এ কারণে সাধারণত আইনজীবীরা নতুন আদালত এড়িয়ে চলেন। দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে প্রচলিত অন্যান্য আদালতেই বিরোধগুলো নিয়ে হাজির হচ্ছেন তারা।
বাণিজ্যিক আদালতে ২৪ ধরনের বিশেষায়িত বাণিজ্যিক বিরোধের মীমাংসা করা হবে। তবে এসব বিরোধ নিয়ে মামলা পরিচালনার প্রাথমিক পর্যায়ে বাধ্যতামূলকভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে হবে পক্ষদের। এমনকি মামলা চলাকালেও রায়ের আগে পক্ষরা চাইলে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধের মীমাংসা করতে পারবে।



