স্পেনের দাবানল ঠেকাচ্ছে ক্ষুধার্ত গাধারা

গবেষণায় দেখা গেছে, চরানো গবাদিপশু দাবানলের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ছবি: সিএনএন
দাবানল ঠেকাতে সাধারণত দমকলকর্মী, ড্রোন বা আধুনিক প্রযুক্তির কথাই শোনা যায়। কিন্তু স্পেনে এই কাজে নেমেছে একদল গাধা। শুকনো ঘাস ও ঝোপঝাড় খেয়ে তারা কমিয়ে দিচ্ছে দাবানলের জ্বালানি। একই সঙ্গে নতুন জীবনও পাচ্ছে এসব প্রাণী।
কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের একটি মৌসুম পার করছে দক্ষিণ ইউরোপ। চলতি গ্রীষ্মেই স্পেনে পুড়ে গেছে ২ লাখ ৪০ হাজার একরের বেশি বনভূমি। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি দাবানল।
দাবানল মোকাবিলায় এখন স্যাটেলাইট, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে বিভিন্ন দেশ। তবে বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণে কাতালোনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় নীরবে কাজ করছে একেবারে ভিন্ন এক দমকল বাহিনী। তারা হলো নির্যাতনে আহত একদল গাধা।
উদ্ধার করা সেই গাধার একটি পাল বনাঞ্চলের শুকনো ঘাস ও ঝোপঝাড় খেয়ে সহায়তা করছে দাবানলের ঝুঁকি কমাতে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানির পাইপ বহন করছে না এসব গাধা। বরং তারা শুকনো উদ্ভিদ খেয়ে এমন প্রাকৃতিক ফাঁকা এলাকা তৈরি করছে, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে রাখছে কার্যকর ভূমিকা।
কাতালোনিয়ার অলাভজনক সংগঠন ‘টিভিসা ডংকি ফায়ারফাইটার্স’ আহত ও নির্যাতিত গাধাগুলোকে উদ্ধার করে পুনর্বাসনের পাশাপাশি চরতে পাঠায় বনাঞ্চলে। শুকনো ঘাস ও ঝোপঝাড় খেয়ে বনভূমিতে প্রাকৃতিক অগ্নিনিরোধক করিডর তৈরি করে তারা। এটি ধীর করে দেয় দাবানলের বিস্তার।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা জোয়ান সেদো সান্স ২০২০ সালে মাত্র কয়েকটি গাধা নিয়ে শুরু করেন এই উদ্যোগ। বর্তমানে ৬২টি গাধা রয়েছে তার দলে। যারা দক্ষিণ কাতালোনিয়ার সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন বন ও চরে বেড়ায় পাহাড়ি এলাকায়।
জোয়ান সেদো সান্স বলেছেন, ‘আমরা এমন প্রাণীদের দ্বিতীয় সুযোগ দিতে পেরে কৃতজ্ঞ, যারা সত্যিই নতুন একটি জীবনের যোগ্য।’
২০১৩ সালে নিজের এলাকায় দাবানলের ভয়াবহতা দেখে এই ধারণা আসে তার মাথায়। তিনি ভেবেছিলেন, গাধাগুলো যদি আশপাশের ঘন ঝোপঝাড় খেয়ে ফেলে, তাহলে কমতে পারে আগুনের ঝুঁকি। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ প্রকল্পে।
বর্তমানে টিভিসার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও প্রকল্পটির দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবক জর্দি গার্সিয়ার হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি।
জর্দি গার্সিয়া বলেছেন, ‘প্রকৃতির মাঝে কাজ করতে পারা এবং এসব প্রাণীকে নতুন জীবন দেওয়ার সুযোগ পাওয়া সত্যিই আনন্দের।’
উদ্ধার করা অনেক গাধার অতীত ছিল কষ্টের। রবার্তো নামের একটি গাধা একসময় দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। আকারে বড় হওয়ায় প্রতিযোগিতায় জিততে না পারায় তাকে পাঠানো হয়েছিল জবাইখানায়।
জোয়ান সেদো সান্স জানিয়েছেন, রবার্তো খুবই বিশেষ। আমার মনে হয় সেও সেটা বুঝতে পারে।
আরেকটি গাধা পালোমাকে অতিরিক্ত বিস্কুট ও চিনি খাওয়ানোর কারণে উদ্ধার করা হয় অত্যন্ত স্থূল অবস্থায়।
তার ভাষ্য, ‘এ ধরনের খাবার কোনো গাধার জন্য উপযুক্ত নয়। এটাও এক ধরনের নির্যাতন।’
বর্তমানে একসঙ্গে থাকে সব গাধা। তাদের চিকিৎসাসেবা দেন স্বেচ্ছাসেবীরা। আশপাশের খামার ও একটি স্থানীয় থিম পার্ক থেকে পাওয়া দান করা খাদ্য দিয়েই ব্যবস্থা করা হয় তাদের খাবারের।
জোয়ান সেদো সান্সের মতে, এতে উপকৃত হচ্ছে সবাই। গাধাগুলো মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাচ্ছে, আর বনাঞ্চলও আগুনের ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকছে।
বার্সেলোনার অটোনোমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃণভোজী প্রাণীবিষয়ক গবেষক ড. জর্দি বার্তোলোমে ফিলেইয়া জানিয়েছেন, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের গ্রীষ্মে খুব সহজেই আগুন ধরে শুকনো ঘাস। গাধা স্বাভাবিকভাবেই এসব ঘাস খেয়ে ফেলে, ফলে দাবানলের জন্য কমে যায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি।
তিনি আরও জানালেন, গাধা, ছাগল ও ভেড়ার মতো বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণী একসঙ্গে ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। কারণ প্রতিটি প্রাণী ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ খায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এরই মধ্যে পাহাড়ি এলাকায় আগুনের ঝুঁকি কমাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ছাগলের পাল। তবে জোয়ান সেদো সান্সের মতে, বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে গাধার।
তিনি বলেছেন, ‘গাধা যে কাজ করতে পারে, তা ছাগল বা ভেড়া পারে না। ওদের ওজন বেশি, তাই তারা বেশি ঘাস খায় এবং চলাচলের সময় ভেঙে দেয় শুকনো উদ্ভিদের স্তরও।’
গবেষকদের মতে, বন পরিষ্কারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের তুলনায় গবাদিপশু দিয়ে চরানো অনেক ক্ষেত্রেই কম ব্যয়বহুল। তবে এটি দাবানল প্রতিরোধের একমাত্র সমাধান নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলের একটি অংশ।
ড. বার্তোলোমে ফিলেইয়া বলেছেন, ‘শুধু গবাদি পশু চরালেই দাবানল পুরোপুরি বন্ধ হবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তবে আগুনের তীব্রতা কমানো সম্ভব হয়, ফলে তা নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হয়।’
এই গাধাগুলো দমকলকর্মীদের বিকল্প নয়, বরং কাজ করছে সহায়ক হিসেবে। কাতালোনিয়ার বিশেষায়িত দাবানল ইউনিট জিআরএএফ। তারা যেসব এলাকায় অগ্নিনিরোধক করিডর তৈরি করে, সেখানে পরে চরানো হয় গাধাগুলো। এতে জায়গাটি সবসময় থাকে শুকনো ঝোপঝাড়মুক্ত।
জোয়ান সেদো সান্স বলেছেন, ‘এটি সবার জন্য লাভজনক। দমকলকর্মীরা করিডর তৈরি করেন, আমরা সেখানে গাধা চরাই এবং জায়গাটি পরিষ্কার রাখি।’
তিনি জানালেন, গাধার চলাচলে তৈরি হওয়া পথ দিয়ে আগুন লাগলে সহজেই নিয়ে যাওয়া যায় দমকলের পাইপ ও সরঞ্জাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাবানল ঠেকাতে তৃণভোজী প্রাণী ব্যবহার নতুন কোনো ধারণা নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গবাদি পশু চরানোর ফলে বনাঞ্চলে জমতে পারেনি অতিরিক্ত শুকনো উদ্ভিদ।
২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মৌসুম দেখা যায়। শুধু স্পেনেই প্রায় ১০ লাখ একর বনভূমি পুড়ে যায়। এতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসৃত হয় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। আর ধোঁয়া হাজার হাজার মাইল দূরের অঞ্চলগুলোর বায়ুর মানেও প্রভাব ফেলে নেতিবাচক।
এখন প্রকৃতিনির্ভর এমন আরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে। গালিসিয়ায় দাবানলপ্রবণ এলাকায় বুনো ঘোড়া ছাড়া হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে ঘাস পরিষ্কারের জন্য। কাতালোনিয়ায় ‘রামাতস দে ফক’ নামে আরেকটি প্রকল্পে যৌথভাবে কাজ করছেন রাখাল ও দমকলকর্মীরা। প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য বিশেষ লেবেলে বিক্রি করা হচ্ছে মাংস ও পনির।
তবে অর্থায়নের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন পরিষ্কারের যান্ত্রিক ব্যবস্থার মতোই গবাদিপশু দিয়ে বন রক্ষণাবেক্ষণকেও পরিবেশগত সেবা হিসেবে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা উচিত।
জোয়ান সেদো সান্স জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি হেক্টর জমি পরিষ্কারের জন্য রাখালরা মাত্র ৭০ থেকে ৮০ ইউরো পান, যা এ ধরনের উদ্যোগ টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। তার সংগঠন এখনো দান ও বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
তার মতে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু দাবানল প্রতিরোধ নয়, বরং মানুষকে প্রাণী ও গ্রামীণ জীবনের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করানো।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা নতুন কিছু করছি না। আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করতেন, আমরা শুধু সেই ঐতিহ্যের মূল্য আবার ফিরিয়ে আনছি।’
সূত্র: এনডিটিভি








