বিশ্বকাপ মানেই উৎসব, কিন্তু দেশে নেই সেই পতাকার ঢেউ

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপ এলেই একসময় বাংলাদেশ বদলে যেত। জুন-জুলাইয়ের আকাশে শুধু মেঘ নয়, উড়ত হাজার হাজার আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকা। গ্রামের টিনের চাল থেকে শহরের বহুতল ভবন সবখানে ফুটে উঠত দুই দেশের রং। ঢাকার অলিগলি, চায়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, এমনকি দূর গ্রামের বাঁশের সাঁকো পর্যন্ত ভাগ হয়ে যেত দুই শিবিরে। কেউ নীল-সাদা, কেউ হলুদ-সবুজ।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র ১১ দিন বাকি। অথচ এবার সেই উন্মাদনা যেন কোথাও নেই। পতাকার দোকানগুলো এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ছাদে ছাদে রং করার প্রতিযোগিতা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক আছে, কিন্তু রাস্তায় নেই আগের সেই উৎসবের আবহ।
একসময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল বাংলাদেশে এক ধরনের অঘোষিত জাতীয় উৎসব। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের আগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্রাজিলের পতাকার রঙে দেয়াল রাঙানো হয়েছিল। ২০১৮ ও ২০২২ সালে সেই উন্মাদনা আরও বড় আকার নেয়। কোথাও পুরো বাড়ি আর্জেন্টিনার নীল-সাদা রঙে রাঙানো হয়েছে, কোথাও আবার ব্রাজিলের হলুদ-সবুজে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দেখা যেত শত শত ফুট দীর্ঘ পতাকা।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বরগুনার বেতাগীতে আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা ৩০২ ফুট দীর্ঘ পতাকা টাঙিয়েছিলেন। জবাবে ব্রাজিল সমর্থকেরা বানান ৫০০ ফুটের পতাকা। দুই পক্ষের এই ‘পতাকা যুদ্ধ’ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল।
রাঙামাটিতে তিনটি সেতু পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে ফেলা হয়েছিল। স্থানীয়রা সেগুলোকে ডাকতে শুরু করেছিলেন ‘আর্জেন্টিনা ব্রিজ’ আর ‘ব্রাজিল ব্রিজ’ নামে।
ফরিদপুরে এক আর্জেন্টিনা সমর্থক বিশ্বকাপ উপলক্ষে কাতারের স্টেডিয়ামের আদলে ছোট ছোট স্টেডিয়ামও নির্মাণ করেছিলেন।
বিশ্বকাপ এলেই গুলিস্তান, নিউমার্কেট কিংবা জেলা শহরের বাজারগুলো ভরে যেত পতাকা আর জার্সির দোকানে। রাস্তাজুড়ে উড়ত মেসি, নেইমার, ম্যারাডোনা কিংবা রোনালদোর ছবি। আকাশের দিকে তাকালে মনে হতো, বাংলাদেশ নয়, যেন দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশ।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-প্রেমের পেছনে সবচেয়ে বড় নাম দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার জাদুকরী পারফরম্যান্স এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল বহু বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। পরে সেই ভালোবাসার উত্তরাধিকার বহন করেন লিওনেল মেসি। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় যেন সেই আবেগকে পূর্ণতা দেয়।
অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের বড় হওয়া পেলে, রোনালদো, রোনালদিনহো কিংবা নেইমারের জাদু দেখে। বাংলাদেশের বহু পরিবারে বাবারা ব্রাজিল সমর্থক, ছেলেরা আর্জেন্টিনা সমর্থক এমন দৃশ্যও খুব পরিচিত।
এবার এত নীরবতার পেছনে কিছু কারণও রয়েছে। প্রথমত, মেসির বিশ্বকাপ জয় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। দ্বিতীয়ত, উৎসবের বড় একটি অংশ এখন চলে গেছে মোবাইল ফোনের পর্দায়। আগে পতাকা বানানো, দেয়াল রাঙানো কিংবা মিছিল ছিল সমর্থনের ভাষা; এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফেসবুক পোস্ট, রিলস আর টিকটক।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বিশাল পতাকা বানানো বা বাড়ি রং করার আগ্রহ অনেকের মধ্যেই কমে এসেছে। তবু ফুটবলপ্রেম মরে যায়নি।
ঢাকার কিছু এলাকায় ইতোমধ্যে ছোট ছোট পতাকা দেখা যাচ্ছে। অনলাইন দোকানগুলোতে জার্সির বিক্রিও বাড়তে শুরু করেছে। আড্ডায় এখনও সেই পুরোনো তর্ক—মেসি নাকি নেইমার, আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল।
আর ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, সেলেসাওরা বিশ্বকাপে আসছে ঠিক ২৪ বছর শিরোপাশূন্য থাকার পর।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার শিরোপা জয়ের পর স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেয় জুলে রিমে ট্রফি। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকে আর বিশ্বকাপ জেতা হয়নি।
সেই ২০০২ সালের কথা এখনও ব্রাজিল সমর্থকদের মনে গেঁথে আছে। জাপানের ইয়োকোহামায় জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে জোড়া গোল করে রোনালদো যখন ট্রফি হাতে তুলেছিলেন, পুরো ব্রাজিল নেমে এসেছিল রাস্তায়। সেই দিন থেকেই শুরু হয় একটি স্বপ্ন—‘হেক্সা’। অর্থাৎ ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।
কিন্তু ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২—প্রতিবারই হেক্সা মিশন ব্যর্থ হয়েছে। তাই এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আবারও নতুন আশায় বুক বাঁধছেন ব্রাজিল সমর্থকেরা।
হয়তো এবার আর ১০ তলা ভবন রঙ করা হবে না। হয়তো ৫০০ ফুটের পতাকা বানিয়ে নতুন রেকর্ডও গড়া হবে না। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজলে বাংলাদেশের লাখো মানুষ আবারও রাত জেগে টিভির সামনে বসবে।
পতাকার সংখ্যা হয়তো কমেছে, কিন্তু আবেগের রং ফিকে হয়নি। বিশ্বকাপ শুরু হলে সেই পুরোনো গল্প আবারও ফিরবে—শুধু একটু অন্য রূপে।
তথ্যসূত্র: ফিফা এবং প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন






