তবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুপুর দেড়টা। রোদটা বেশ তেতো। হাসপাতালে আউটডোরের পাশে বসে আছেন আরিফুল সাহেব। সামনেই বিশাল নিমগাছ। কোলে তিন বছরের মেয়ে টুনটুনি। মেয়েটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। গায়ে লাল ছোট ছোট ফুসকুড়ি।
আরিফুল সাহেব পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে দিলেন। চশমার বাঁ পাশটা একটু ভাঙা। পাশে বসা এক প্রবীণ লোক হঠাৎ বললেন, ‘কী হয়েছে ভাই? হাম নাকি?’
আরিফুল সাহেব গলায় হতাশা নিয়ে বললেন, ‘ডাক্তার তো বলল হাম। আরও টেস্ট করতে দিয়েছে। দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি। এখনো ডাক পড়েনি।’
প্রবীণ লোকটা গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন, ‘অবস্থা ভালো না ভাই। খবরে দেখলাম এ বছর নাকি এক হাজার শিশু মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৮৬ হাজারের বেশি। ভাবা যায়, কত শিশু মরে গেল!
আরিফুল সাহেব কথা বাড়ালেন না। তিনি টুনটুনির মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। টুনটুনি চোখ মেলল। এত জ্বরের মধ্যেও তার চোখ দুটি কী মায়াবী! সে শুকনো গলায় বলল, ‘বাবা, আইসক্রিম খাব।’
আরিফুল সাহেবের পকেটে মাত্র সাতাশি টাকা আছে। একটা রক্ত পরীক্ষা করানোর টাকাও এতে হবে না। অবস্থা এত খারাপ ছিল না তার। দুই মাস ধরে তিনি বেকার। চাকরি নেই। তিনি টুনটুনির দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন।
‘আইসক্রিম তো এখন খাওয়া যাবে না মা। লাল রঙেরটা খাবি? লাল রঙের ওই যে বরফ-আইসক্রিম?’
টুনটুনি একটু মাথা নাড়ল।
গেটের সামনে থেকে লাল রঙের একটা বরফ আইসক্রিম কিনে আনলেন আরিফুল সাহেব। দাম দশ টাকা। আইসক্রিমটা হাতে পেয়েই টুনটুনির মুখে হাসি। সে জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে বরফটা চুষতে লাগল।
আরিফুল সাহেব নিমগাছটার দিকে তাকালেন। গাছের ডালে একটা কাক বসে আছে। কাকটা আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে আছে বলেই মনে হলো।
হঠাৎ মাইকের শব্দে আরিফুল সাহেব চমকে উঠলেন। রক্ত পরীক্ষার জন্য কাউন্টার থেকে তাকেই ডাকা হচ্ছে। আরিফুল সাহেব পকেটে হাত দিলেন। কাউন্টারে কত চাইবে তিনি জানেন না। বাকি সাতাত্তর টাকায় এই পরীক্ষা হবে কি না, তাও জানা নেই।
টুনটুনি লাল রঙের বরফটা খুব সাবধানে চুষছে। যাতে এক ফোঁটাও নিচে পড়ে না যায়।
আরিফুল সাহেব ভাঙা চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিলেন। মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। দুপুর দুটো বেজে গেছে। নিম গাছের ছায়ায়ও রোদটা ভীষণ তেতো লাগছে তার।





