সাপলুডু ও সাহেব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমার শৈশব কেটেছে লুডু খেলে। অধিকাংশ বাঙালির ক্ষেত্রেই বোধ করি তাই। তবে আমার বেশি আকর্ষণ ছিল লুডুর বোর্ডের উল্টো দিকটায়, যেখানে সাপলুডুর ছক আঁকা। এই খেলার যে উত্তেজনা, সেটা আমি সাধারণ লুডুতে পেতাম না।
সাপলুডুর সাপগুলো এখনো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ বুজলেই সেগুলোকে দেখতে পাই। কয়েকটি মই আর এঁকেবেঁকে থাকা সাপ। তার মাথা একদিকে। লেজ আরেক দিকে। বিশেষ করে ১০০ নম্বর ঘরে পৌঁছানোর আগের ঘরে থাকা সাপটা সবচেয়ে লম্বা। অজগর সম্ভবত। তার লেজ নেমে গেছে অনেক নিচে, বোর্ডের একেবারে শুরুর দিকে। এই সাপ যেন অমোঘ নিয়তির মতো হাঁ-মুখ নিয়ে বসে আছে।
এভারেস্ট শৃঙ্গে ওঠার আগমুহূর্তের সেই কুখ্যাত হিলারি স্টেপস যেন।
খেলাটা কত সহজ। মই পেলে এক লাফে অনেকটা এগিয়ে যাওয়া যায়। আর সাপের মুখে পড়লে নেমে আসতে হয় লেজে। পুরস্কার আর তিরস্কার। শেষ ঘরে যে আগে পৌঁছাবে, সে বিজয়ী। ভাগ্যের খেলা। মজার খেলা।
আমি কখনো এ খেলার পেছনের গভীর দর্শন আর ইতিহাস নিয়ে ভাবিনি। সম্প্রতি ‘দ্য জাগারনট’ নামে এক সাময়িকীতে একটা নিবন্ধ পড়ে মুগ্ধ হলাম। নিবন্ধের শিরোনাম ‘হাউ স্নেকস অ্যান্ড ল্যাডার্স লস্ট ইটস সোল’। অর্থাৎ কী করে সাপলুডু লেখা তার অন্তর্নিহিত নির্যাস হারিয়ে ফেলেছে।
লেখক কৌশিকী নাইডু তার আলোচনায় দেখিয়েছেন, আজকের পরিচিত সাপলুডু একসময় ছিল ভারতীয় দর্শন ও ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে যুক্ত একটি খেলা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে সেই খেলার রূপ ও অর্থ বদলে গেছে। প্রাচীন ভারতে এটি ছিল আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যম। সেখান থেকে তা পরিণত হয়েছে শিশুদের নিছক বিনোদনে।
সাপলুডুর পুরনো ভারতীয় রূপের একটা মজার নাম ছিল। ‘মোক্ষপটম’। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল হিন্দুধর্মের কর্মফল, নৈতিকতা, পুনর্জন্ম এবং মোক্ষলাভের ধারণা। মোক্ষ মানে জন্ম আর মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি। নির্বাণ।
ভারতবর্ষে এই খেলায় মই আর সাপ শুধু ওঠানামার মাধ্যম ছিল না। এগুলোর ছিল প্রতীকী অর্থ। ভালো কাজ যে মানুষকে এগিয়ে দেয়, আর মন্দ কাজ তাকে পিছিয়ে দেয়, এই ধারণা ফুটে উঠত খেলার ছকে। মই হলো সৎকর্ম আর নৈতিক উন্নতির প্রতীক। অন্যদিকে সাপের মুখে পড়া মানে অধঃপতন।
খেলার চূড়ান্ত লক্ষ্যও প্রতিপক্ষকে হারানো নয়; বরং আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীকী যাত্রা। খেলতে খেলতে মানুষ শিখত, জীবনে নিজের কাজের গুরুত্ব কতখানি। প্রতিটি পদক্ষেপের পরিণতি আছে। ভালো কাজের ফল ভালো হতে পারে, আবার ভুল কাজ মানুষকে পিছিয়ে দিতে পারে।
সাপলুডু বা মোক্ষপটমের ভেতরে লুকিয়ে ছিল আস্ত জীবনদর্শন। জীবনকে দেখা হতো নৈতিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা হিসেবে। এখানে এগিয়ে যাওয়া আর পিছিয়ে পড়া, দুটোরই অর্থ আছে। পিছিয়ে পড়ে আবার এগিয়ে যাওয়া। আবার শুরু করা। লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হওয়া।
ইতিহাস বলছে, ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় এ খেলা ইউরোপে পরিচিতি পায়। ব্রিটিশ সংগ্রাহক ও খেলনা নির্মাতারা এই খেলার ভারতীয় সংস্করণের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। পরে সাহেবরা এই খেলাকে নিজেদের সমাজ ও শিশুদের উপযোগী এক পার্লর গেম হিসেবে নতুন করে সাজিয়েছেন।
এই পরিবর্তনে খেলাটির ধর্মীয় ও দার্শনিক তাৎপর্যের বেশিরভাগটাই হারিয়ে গেছে। ভারতীয় সংস্করণে বিভিন্ন ঘরের সঙ্গে যুক্ত নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ধারণাগুলো আর আগের গুরুত্ব নিয়ে থাকেনি। খেলার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সবার আগে শেষ ঘরে পৌঁছানো।
যে খেলা একসময় মানুষকে ভালোমন্দের পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে শেখাত, বেনিয়াদের শাসনে সেটি হয়ে উঠেছে ভাগ্যনির্ভর প্রতিযোগিতা। ছক্কা ফেলো, গুঁটি চালাও, মই পেলে ওপরে ওঠো, সাপ পেলে নিচে নামো। এর বাইরে আর কোনো দর্শন বোঝার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।
আজ আমরা সাপলুডুকে মূলত শিশুদের একটি জনপ্রিয় খেলা হিসেবেই কল্পনা করি। কি সাহেব, কি মোসাহেব। এর শিকড় যে ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে, সে তথ্য অনেকেরই অজানা। অন্তত আমার জানা ছিল না।
সাপলুডুর এই পরিণতির একটা গভীর তাৎপর্য আছে। কী করে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি উপনিবেশিত সংস্কৃতিকে দখল করে তার অর্জিত জ্ঞান, ঐতিহ্য আর চর্চাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়, তার একটা দৃষ্টান্ত এ খেলা। একটি সাংস্কৃতিক উপাদানের বাহ্যিক রূপ টিকে থাকলেই তার আসল পরিচয় টিকে থাকে না।
সাপলুডুর ছক এখনো আছে। সাপ আছে, মই আছে, আছে ছক্কা ফেলার উত্তেজনা। কিন্তু একসময় যে জীবনদর্শন এর সঙ্গে যুক্ত ছিল, তা হারিয়ে গেছে। বস্তু আছে অথচ তার ভেতরের ভাবনাটি নেই।
এতসব ইতিহাস জেনে আমাদের লাভ কী? লাভ আছে। আমরা যখন পরেরবার সাপলুডু খেলব, হয়তো মনে পড়বে, এই খেলার ছকে একসময় শুধু সাপ আর মই ছিল না। ছিল মানুষের জীবন, নৈতিকতা এবং মুক্তির পথ নিয়ে ভাববার একটি আয়োজন। সেই দর্শন আজ আর খেলার নিয়মের অংশ নয়। কিন্তু খেলার ইতিহাসে তার চিহ্ন রয়ে গেছে।



