আজ কলকাতা পত্তন দিবস

প্রতি বছর ২৪ আগস্ট তারিখটি ঐতিহ্যগতভাবে ‘কলকাতা পত্তন দিবস’ বা কলকাতার জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে, ১৬৯০ সালের এই দিনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিক জব চার্নক পা রাখেন হুগলি নদীর তীরে সুতানুটি গ্রামে। তার এই আগমনকেই বহু বছর ধরে আধুনিক কলকাতা শহরের সূচনাবিন্দু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
জব চার্নক ও তিন গ্রামের গল্প
ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা— এই তিনটি গ্রাম নিয়েই গড়ে উঠেছিল বর্তমান কলকাতা মহানগরী। জব চার্নক বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপনের উদ্দেশে এই অঞ্চলে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে তা ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাণিজ্যকেন্দ্র রূপান্তরিত হয় একটি সমৃদ্ধ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক নগরীতে, যা একসময় ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীও।
আদালতের রায় নিয়ে বিতর্ক
তবে কলকাতার প্রকৃত জন্মদিন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছে। ২০০৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানায়, কলকাতা শহরের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা বা প্রতিষ্ঠাদিবস নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, জব চার্নকের আগমনের বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলে জনবসতি ছিল এবং শহরটি কোনো একক ব্যক্তির হাতে একদিনে গড়ে ওঠেনি, বরং তা এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফসল। এই রায়ের ফলে সরকারি নথিপত্র থেকে ‘কলকাতার জন্মদিন’ হিসেবে ২৪ আগস্টের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হয়।
ঐতিহ্য ও আবেগের প্রশ্ন
আদালতের রায় সত্ত্বেও বহু ইতিহাসপ্রেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের একাংশ আজও ২৪ আগস্ট তারিখটিকে স্মরণীয় করে রাখেন। তাদের মতে, কোনো একটি তারিখ শহরের সম্পূর্ণ ইতিহাসকে প্রতিনিধিত্ব না করলেও, এটি কলকাতার ঔপনিবেশিক অতীত এবং আধুনিক নগরায়ণের সূচনাকে স্মরণ করার একটি প্রতীকী উপলক্ষ। বিভিন্ন হেরিটেজ ওয়াক, আলোচনাসভা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় এই দিনটি উপলক্ষে, যেখানে আলোচনা হয় শহরের পুরনো স্থাপত্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে।
আজকের কলকাতা
তিনশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে কলকাতা আজ পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, কলেজ স্ট্রিট, চিড়িয়াখানা কিংবা পুরনো জমিদারবাড়িগুলো আজও শহরের ঔপনিবেশিক ও ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করে চলেছে। ‘সিটি অব জয়’ নামে পরিচিত এই শহর তার সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি ও আড্ডার সংস্কৃতির জন্য স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে গোটা ভারতে।
সব মিলিয়ে, আইনি দৃষ্টিতে কলকাতার নির্দিষ্ট কোনো জন্মদিন না থাকলেও, ২৪ আগস্ট তারিখটি শহরের ইতিহাস-সচেতন মানুষদের কাছে আজও এক আবেগঘন স্মৃতিচারণের দিন হয়ে রয়ে গেছে।






