৭ হাজার টাকা বিনিয়োগে সাড়ে ৫০০ কোটির সাম্রাজ্য কণিকার

কণিকা টেকরিওয়াল
২১ বছর বয়সে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই। তারপর মাত্র ৫ হাজার ৬০০ রুপি বা বাংলাদেশের টাকায় ৭ হাজার ১৬৪ টাকা বিনিয়োগ। আর সেই টাকায় গড়ে তুলেছেন ৪২০ কোটি রুপি বা ৫৩৭ কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার ৪৭২ টাকার প্রতিষ্ঠান। ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতাও যে হার মানে, তারই প্রমাণ কণিকা টেকরিওয়াল।
পুরুষপ্রধান বিমান চলাচল খাতে সব বাধা পেরিয়ে আজ তিনি ভারতের অন্যতম সফল নারী উদ্যোক্তা। কণিকার এই যাত্রা সাহস, অধ্যবসায় আর স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।
কণিকা বেসরকারি জেট পরিষেবা প্রতিষ্ঠান জেটসেটগোর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। ২০২১ সালে স্থান পান ভারতের স্বনির্মিত ধনী নারীদের তালিকায়। পাশাপাশি ‘শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া’ সিজন ৫-এর বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে টানা দুই বছর জায়গা করে নেন ‘ফোর্বস ৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায়ও।
কণিকা টেকরিওয়ালের জীবনসংগ্রাম শুধু একজন সফল উদ্যোক্তার গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে স্বপ্ন পূরণের এক অনন্য উদাহরণ।
২১ বছরেই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই
ছোটবেলা থেকেই অর্থনীতি ও ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল মারোয়ারি পরিবারে জন্ম নেওয়া কণিকার। তবে পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, উচ্চশিক্ষা শেষে একটি সচ্ছল পরিবারে বিয়ে করবেন তিনি। যা অনেক মারোয়ারি পরিবারের প্রচলিত সামাজিক ধারণারই প্রতিফলন।
ভোপালে স্কুলজীবন শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষা নেন ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২১ বছর বয়স পর্যন্ত পরিবারের ইচ্ছা মেনেই চললেও পরে সিদ্ধান্ত নেন নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার। ঠিক সেই সময়ই তার শরীরে ধরা পড়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের হজকিনস লিম্ফোমা।
‘শার্ক ট্যাঙ্ক ইন্ডিয়া’ অনুষ্ঠানে কণিকা স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘আমার বয়স তখন ২১। প্রায় ৪০ জন চিকিৎসক বলেছিলেন, আমি হয়তো চার মাস বা চার দিন বাঁচব। পরে মুম্বাইয়ের একজন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে আমি বলেছিলাম, ৪০ বছর পর আমরা একসঙ্গে বসে পানীয় পান করব। এখন চলুন চিকিৎসার কথা বলি।’
২০২২ সালে ভোগ ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘ক্যানসার থেকে বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়েছে, জীবন খুবই ছোট। তাই নিজের জন্য বাঁচতে হবে এবং যেটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই করতে হবে।’
২০১৪ সালে কণিকা প্রতিষ্ঠা করেন জেটসেটগো। টাইমস এন্টারটেইনমেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘অনেকে জানতে চান, বিনিয়োগকারীর অর্থ ছাড়াই কীভাবে আমি এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। আজ পর্যন্ত আমি মাত্র সাত হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছি। অথচ এখন আমরা ভারতের সবচেয়ে বড় বেসরকারি জেটবহর পরিচালনা করছি।’
পুরুষপ্রধান বিমান চলাচল শিল্পে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। ২০১৭ সালে দ্য বেটার ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘শুরুর দিকে মানুষ আমার কাজকে গুরুত্ব দিতে চাইত না। কেউ কেউ বলতেন, তোমার কেক বানানোর ব্যবসা করা উচিত। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বললে আমাকে অহংকারী বলা হতো, অথচ একজন পুরুষ একইভাবে কথা বললে তাকে উৎসাহী বা নেতৃত্বগুণসম্পন্ন বলা হতো। তবে এসব আমাকে থামাতে পারেনি।’
সব বাধা পেরিয়ে আজ জেটসেটগো ভারতের সবচেয়ে বড় বেসরকারি জেট ও হেলিকপ্টার বহরের অন্যতম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছেন শিল্পপতি পুনিত ডালমিয়া ও ভারতের সাবেক ক্রিকেটার যুবরাজ সিং। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বর্তমানে মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, নিউ ইয়র্ক ও দুবাইয়ে বিস্তৃত।
ব্যক্তিজীবনে কণিকা টেকরিওয়াল হায়দরাবাদের ব্যবসায়ী এবং বিয়ে করেছেন অরবিন্দো ফার্মার নন-এক্সিকিউটিভ পরিচালক পি. সারথ চন্দ্র রেড্ডিকে। বিয়ের চার বছর পর ২০২৬ সালের ২৮ মে তাদের ঘরে এক পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।
সূত্র: এনডিটিভি







