জাপানের রাজ পরিবারে উত্তরাধিকার সংকট, তবুও উপেক্ষিত নারীরা

২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জাপানের টোকিওতে ইম্পেরিয়াল প্যালেসে রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান জাপানের সম্রাট নারুহিতো (বাম দিক থেকে তৃতীয়)। ছবি: সিএনএন
দিন দিন সংকট বাড়ছে জাপানের রাজপরিবারে উত্তরাধিকারীর। বৈধ উত্তরাধিকারী এখন মাত্র তিনজন। তবু নারীদের সম্রাট হওয়ার সুযোগ দিতে রাজি নয় সরকার। এতে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্ক।
জাপানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দায়িত্ব পালন করতে পারেন একজন নারী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু একই সময়ে দেশটির রাজপরিবারে উত্তরাধিকার সংকট দেখা দিলেও নারীদের সম্রাট হওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে সরকার।
এখন জাপানের ক্রিস্যান্থেমাম সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী মাত্র তিনজন। তাদের মধ্যে দুজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজতন্ত্রগুলোর একটি এখন পড়েছে উত্তরাধিকার সংকটে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাপানের রাজপরিবারের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারেন শুধু পুরুষ সদস্যরাই। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোয় রাজপরিবারে ছেলের তুলনায় মেয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ নিয়ম এখন প্রশ্ন তুলেছে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই।
সংকট মোকাবিলায় রাজপরিবারের সাবেক পার্শ্বশাখার পুরুষ সদস্যদের আবার রাজপরিবারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এতে পুরুষ উত্তরাধিকারীর সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করছে সরকার। প্রস্তাবটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে সংসদের।
তবে এ পরিকল্পনা জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্কের। অনেক গবেষক, বিরোধী রাজনীতিক ও সাধারণ নাগরিক প্রশ্ন তুলছেন, যখন নারীরা সিংহাসনে বসতে পারেন, তখন তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না কেন।
টোকিওর চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজবংশ–বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া বলেছেন, একজন নারীকে সম্রাট হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার পক্ষে যুক্তিসংগত কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তার ভাষ্য, ‘অতীতে জাপানে আটজন নারী সম্রাট ছিলেন। তবে ১৮৮৯ সালে মেইজি যুগে প্রণীত ইম্পেরিয়াল হাউজ আইনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় নারী সম্রাটের পথ।’
ওকাওয়া আরও বলেছেন, ‘জাপানের সংবিধানে কোথাও নারীকে সম্রাট হতে নিষেধ করা হয়নি। তাই এটিকে ঐতিহ্যের বিষয় হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।’ তার মতে, নারীদের আগেভাগেই অযোগ্য ঘোষণা করা মূলত নারীবিদ্বেষের প্রকাশ।
বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা গেছে, সম্রাটের ধারণার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন অধিকাংশ জাপানি নারী।
টোকিওর বাসিন্দা কানা সাকাকুরা বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশে দীর্ঘদিন ধরেই নারী রাজপ্রধান রয়েছেন।’ তার মতে, এখনো নারীদের নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখতে অনীহার একটি সামাজিক পরিবেশ রয়েছে জাপানে।
তবে নারী উত্তরাধিকার নিয়ে জনসমর্থন থাকলেও এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি সরকার। পুরুষ উত্তরাধিকার নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং তার ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি।
চলতি বছরের শুরুতে পার্লামেন্টে আলোচনার সময় তাকাইচি বলেছেন, ‘রাজবংশের পুরুষ বংশধরদের মধ্যেই উত্তরাধিকার সীমাবদ্ধ রাখা যথাযথ হবে।’
সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনীতেও সিংহাসনে বসার সুযোগ রাখা হয়নি কোনো রাজকন্যাকে। এমনকি কোনো রাজকন্যা সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলে তার সন্তানও উত্তরাধিকারী হতে পারবেন না সিংহাসনের।
বর্তমান সম্রাট নারুহিতোর একমাত্র সন্তান জনপ্রিয় রাজকন্যা আইকো। কিন্তু নারী হওয়ায় তিনি আইন অনুযায়ী সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নন। ভবিষ্যতে তার ছেলে সন্তান হলেও এ অধিকার পাবেন না তিনিও।
বর্তমানে সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রয়েছেন সম্রাটের ৯০ বছর বয়সী চাচা প্রিন্স হিতাচি, ৬০ বছর বয়সী ছোট ভাই প্রিন্স আকিশিনো এবং আকিশিনোর ১৯ বছর বয়সী ছেলে প্রিন্স হিসাহিতো।
গত ৪০ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া রাজপরিবারের প্রথম পুরুষ সদস্য হিসাহিতোকে সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী মনে করা হচ্ছে ভবিষ্যৎ সম্রাট হিসেবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অনেক বড় ছিল জাপানের রাজপরিবার। তখন রাজপরিবারের একাধিক পার্শ্বশাখা থাকায় দেখা দিত না উত্তরাধিকার সংকট। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ইম্পেরিয়াল হাউজ আইনে সংশোধন এনে ছোট করা হয় রাজপরিবার। বাদ দেওয়া হয় ১১টি পার্শ্বশাখাকে। ফলে সদস্যসংখ্যা ৬৭ থেকে নেমে আসে ১৬ জনে।
এ ছাড়া প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো রাজকন্যা সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলে রাজপরিবার ছাড়তে হয় তাকে। এতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও কমে গেছে সদস্যসংখ্যা।
নতুন প্রস্তাবে সাবেক পার্শ্বশাখার অবিবাহিত, নিঃসন্তান ও অন্তত ১৫ বছর বয়সী সদস্যদের রাজপরিবারে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাদের সন্তানরা উত্তরাধিকারী হতে পারবেন ভবিষ্যতে।
এ ছাড়া সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলেও রাজকন্যারা যাতে রাজপরিবারে থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে তাদের সন্তানদের জন্য উত্তরাধিকারের পথ বন্ধ থাকবে আগের মতোই।
অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া বলেছেন, ‘এসব উদ্যোগ শুধু সাময়িক সমাধান। কারণ পুরো ব্যবস্থাই সীমিতসংখ্যক পুরুষ উত্তরাধিকারীর ওপর নির্ভরশীল।’ তার মতে, নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বাদ রাখলে রাজতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে সাবেক এক রাজপরিবারের শাখার বংশধর সুনেয়াসু তাকেদা বলেছেন, ‘পুরুষ বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যই জাপানের স্থিতিশীলতার ভিত্তি।’
তার মতে, জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে পরিবর্তন করা উচিত নয় এ ঐতিহ্য। এতে সম্রাটের প্রতি মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে দেশের ভিত্তিই।
তবে টোকিওর বাসিন্দা আকিও কুবোতার মত ভিন্ন। তিনি বলেছেন, ‘অতীতেও জাপানে নারী সম্রাট ছিলেন। বর্তমান বিশ্বে যখন নারী-পুরুষ সমতার কথা বলা হচ্ছে, তখন শুধু সম্রাটের পদটি পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত রাখা অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়।’
সূত্র: সিএনএন







