অনিশ্চিত প্রতিদিন

লাল-নীল ডানার প্রজাপতিটির পা আছে, ডানা আছে, শুঁড় আছে; চোখ-কান-নাক আছে। খয়েরি রঙের তেলাপোকাটারও পা আছে, ডানা আছে, শুঁড় আছে; চোখ-কান-নাক আছে।
অথচ এই বর্ণিল প্রজাপতিটি মেরে ফেললে হয়— নির্মমতা, আর চিটচিটে তেলাপোকাটি মেরে ফেললে হয়— স্বস্তি। দুটোই মৃত্যু। দুটোতেই জীবনের অবসান। ফারাক শুধু দৃষ্টিভঙ্গির, চিন্তার বিভাজনের।
খুন হয়েছে আরও কিছু— ৪৭ লাখ প্রাণের, মানুষের প্রাণের; মাত্র ২৫ বছরে! ৯/১১-এর পর আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়ায় চলেছে এ নৃশংসতা! এখানে দুটোই আছে— একশ্রেণির কাছে নির্মমতা, আরেক শ্রেণির কাছে স্বস্তি। কিন্তু দুই ধরনের প্রজাতি প্রজাপতি কিংবা তেলাপোকার মতো কোনো ফারাক নেই; এখানে এক জাতি, এক সভ্য পরিচয়ের দাবিদার— মানুষ! যাকে খুন করা হয়েছে অবলীলায়, যাকে খুন করেছে ওই মানুষই!
০২
কায়দাটা পছন্দ হয়েছে— ফাইল আটকে কিস্তিতে ঘুষ!
কিস্তির সঙ্গে আমাদের পরিচয়টা তো আজকের নয়, জন্ম থেকেই। আমাদের জন্ম এখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয় না। বাড়িতে নয়, হাসপাতালে, শল্যচিকিৎসায় হয়। ইংরেজিতে যাকে বলে সিজারিয়ান।
হাসপাতালে যাওয়ার সময় যেকোনো একটা পরিবহনে যেতে হয়, ভাড়া নামক জন্মানোর প্রথম কিস্তিটা দিতে হয় ওখানেই। হাসপাতালের বেডে যাওয়ার আগে পরিশোধ করতে হয় ভর্তি হওয়ার বিল। আরেক কিস্তি। তারপর টেস্টের ফি, ওষুধের দাম, পেট কাটার ডাক্তারের মজুরি— ক্রমে ক্রমে দিতে হয়, যেন অবিকল কিস্তি, কিস্তির পর কিস্তি।
তারপর স্কুল। একই স্কুলে প্রতি বছর প্রতি ক্লাসে এক গাদা ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, এটা-ওটার চার্জ, আরও কত কী!
অবিকল কিস্তি।
জীবনের শেষ দিনটা থেকে চলে যাওয়ার দিনও কিস্তি। কাপড় কেন, গোলাপজল কেন, বাঁশ কেন, কবর খোঁড়ার মানুষ আনো— প্রতিটি স্থানে প্রতি রকম ব্যয়, যেন কিস্তির ধারাবাহিকতা।
আমাদের জীবনটাই কিস্তিময়, সেখানে আমাদের মতো দেশে কাজ সহজ করার টোটকা ঘুষ কিস্তিময় হলে অবাক হওয়ার কী আছে!
ঘুষের এই মহামারীর কথা আমাদের প্রধানমন্ত্রী জানেন, অর্থমন্ত্রী জানেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা জানেন, চিকিৎসক-প্রকৌশলীরা জানেন, পত্রিকার জাঁদরেল সম্পাদকরা জানেন, দেশকে রক্ষা করার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানরা জানেন; সবাই জানেন, তবু কেন এই নির্মম অসভ্যতা ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলছে আমাদের দেশে?
আমরা বরং একটা স্বপ্ন দেখি। ‘আসুন, এবার রাষ্ট্রকে, দেশকে আমরা পুনর্গঠন করি’—আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দুদিন আগে। আমরা আশা করব দুদিন পর তিনি এ-ও বলবেন— ‘আসুন, এবার রাষ্ট্রকে, দেশকে আমরা ঘুষমুক্ত করি।’
০৩
বাজারে গিয়েছেন আপনি গত কয়দিন?
যদি গিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে অভিনন্দন— সুস্থ ও টিকে থাকার জন্য! পে স্কেল নামক সোনার হরিণ ঘোষণার পর আগুন লেগেছে বাজারে! প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়েছে ৪০-৫০ ভাগ।
এই ৪০-৫০ ভাগ বেশি দামে জিনিস কিনবেন তারা, যারা পে স্কেল পাবেন; যারা পাবেন না, তারাও।
এখন যে প্রশ্নটি করা দরকার— একই দেশে, একই মাটিতে, একই বাতাসে, একই বাজারে এই বিভাজন কেন? ১০০-১৫০ ভাগ বেতন বেশি পাওয়া ‘সুবিধাভোগীজন’ যে দামে সবজি কিনবেন, যাদের বিন্দুমাত্র আয় বাড়েনি, সেই ‘অভাগাজন’ও একই দামে সবজি কিনবেন? এটা কোনো কথা! এটা কোন বিবেচনাবোধ? কেন এ বিকৃত বিভাজন?
বৃক্ষরা সবাইকে সমান ছায়া দেয়। ধনী-গরিব, কালো-সাদাতে কোনো প্রভেদ নেই তার কাছে। রাষ্ট্রের প্রধানদের বৃক্ষের মতো হতে হয়। না হলেই সমস্যা। নদীর ভাঙনে উপড়ে যাওয়া বৃক্ষের মতো সেই প্রধানরা চেয়ারহারা হন তাই একদিন, কোনো কোনোজন পালিয়ে যান চুপিসারে।
০৩
এসএসসির রেজাল্ট বের হয়েছে কয়দিন আগে। দুই যুগের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ রেজাল্ট হয়েছে এবার। দুটো অন্যতম কারণ হলো— ১. অনভিজ্ঞ অনেক শিক্ষক দ্বারা পরীক্ষার খাতা দেখানো, ২. প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর হাতে মোবাইল ফোনের আদিখ্যেতা।
নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ঘোষণা দিয়েছেন— নিউ ইয়র্ক শহরের সরকারি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করতে পারবে না। ছয় লাখ শিক্ষার্থী আছে সেখানে এবং এই ঘোষণা মাত্র এক বছরের জন্য। মামদানি বলেছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের চিন্তা করার ক্ষমতা এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষাই এ সিদ্ধান্তের লক্ষ্য। এক বছর পর এর প্রভাব মূল্যায়ন করে ঠিক করা হবে স্কুলে এআই ব্যবহার হবে, কি হবে না।
আমাদের দেশে এরকম কিছু সম্ভব? আমরা কি একটা বছরের জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি? যদিও গত কয় বছর মোবাইল কিনে না দেওয়া, ব্যবহার করতে না দেওয়া-সংক্রান্ত ব্যাপারে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে কয়েক ডজন। তারপরও, তারপরও একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যতকে সুন্দর করার জন্য কিছু একটা করতে পারি না আমরা?
০৪
স্বপ্নবাজ লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ ও মেজবাউল হক কুমিরের একটি খামার গড়েছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকায়। বিভিন্ন জটিলতায় খামারটি এখন প্রায় যত্নহীন। কিছু কুমির এখনো রয়ে গেছে সেখানে। অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে তারা। ভাবে, আশা করে— কেউ এসে তাদের যত্ন নেবে, নিয়মিত খাবার দেবে, চিকিৎসা করাবে।
আপনি যদি একজন সত্যিকারের মানুষ(!) হন, কিছুটা বোধ এবং মানবিকতা অবশিষ্ট থাকে আপনার, মনুষ্যত্ব খানিকটা এখনো বিদ্যমান, তাহলে আপনি আশপাশে তাকাবেন, এমনকি নিজের আত্মীয়স্বজন-পরিবারের দিকে তাকান— সবার চোখে অসহায়ত্ব, অনিশ্চিত আগামীর কালো ছায়া তাদের চোখে। সরকার যায়, সরকার আসে— বদলে যায় চেয়ারের তোয়ালে, বাণী বদলায়, প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাস বদলায়; কিন্তু আমাদের ভাগ্য আর বদলায় না।
নিয়মের তোয়াক্কা
না করে ভিআইপি সড়কে ব্যাটারিচালিত গাড়ির মতো সাহসী হয়ে উঠি আমরা কখনো কখনো। তারপর আরও
একটু সাহসী হয়ে জীবনের সব বঞ্চনা আর ব্যর্থতা ঝেড়ে টুক করে ঝুলে পড়ি বরিশালের বর্ষীয়ান
সাংবাদিক পুলক ব্যানার্জির মতো। কতজন এরকম ঝুলে পড়ে আমাদের দেশে, প্রতিদিন, এখানে-ওখানে—
কিছু জানি, কিছু জানা হয় না আমাদের কোনোদিনই!



