ঝরাপাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দাচার পেছনের উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো ভলগা—দায়িত্ব থেকে বহু আগেই অবসর নিয়েছে গাড়িটা। এখন বুনো ঘাস, ঝোপঝাড় আর পোকামাকড়ের সঙ্গে তার শান্তিপূর্ণ বসবাস। নৈরাশ্যবাদীরা হয়তো বলবে, উদ্ধারের উপায় না থাকলে জায়গাটাকেই আপন করে নেওয়াই ভালো।
চারদিকে অবহেলার ধুলো মেখে ছড়িয়ে থাকা বাকি জিনিসপত্রগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। কয়েকটা ফলের গাছ টিকে আছে এদিক ওদিক। কিছু বেখাপ্পা চেহারার ফলও ধরেছে তাতে। একটা নাশপাতিতে কামড় বসিয়ে মনে হলো বালু খাচ্ছি। আপেলগুলো লেবুর মতো টক!
এই অস্বস্তি জাগানিয়া দৃশ্যের মধ্যে একমাত্র আরাম দিচ্ছে বুনোফুলগুলো। ফলের গাছগুলো যখন অবহেলায় দিশেহারা, ফুলের গাছগুলো তখন ঠিকই আপন মনে মেলে ধরেছে ভালোবাসার পসরা।
ভলগা গাড়িটার উল্টোদিকের কোনায় রয়েছে একটা টয়লেট। হ্যাঁ, টয়লেটই বটে! দাচায় বাড়ির ভেতরে গোসলের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু টয়লেটটা বাইরেই। ব্যবহার করতে হলে অনেকখানি হেঁটে উঠানের পেছনে একেবারে শেষ মাথায় যেতে হবে। টয়লেটটা একেবারেই সাধারণ। দেয়াল আর দরজা কাঠের। মাথার ওপর টিনের ছাউনি, তবে বাতাস ঢোকার জন্য ওপরের দিকে খানিকটা ফাঁক রাখা। মেঝে বলতে একটা কাঠের পাটাতন। তারই মাঝখানে আসল কাজটা সারার জন্য আয়তাকার এক গর্ত। প্যান বা কমোডের কারবার নেই। চারপাশে ভনভন করছে মাছি! খুটিয়ে দেখতে কাছে যেতেই উৎকট গন্ধ আর মাছির ওড়াওড়িতে আমার প্রায় বমি এসে গেল।
আমার মুখ থেকে সম্ভবত আর্তচিৎকারের মতোই আওয়াজ বেরিয়ে এসেছিল একটা। তা শুনে বাবার বুঝতে দেরি হয়নি ঘটনা কী! আমাকে ঘরে নিয়ে যেতে তাই টয়লেটের দিকে একরকম দৌড়েই এলো সে।
জীবনে এই প্রথমবারের মতো মরতে ইচ্ছা হচ্ছিল আমার। রোজ এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? কথাটা ভাবতেই মাথার ভেতরটা আবার কেমন করে উঠল। এইভাবে বেঁচে থাকার নাম জীবন তাহলে!
বাবা চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে সান্ত্বনা দিল আমাকে। দূরে দাঁড়ানো মার ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি। সেখান থেকেই গলা চড়িয়ে বলল, ‘নাটক বন্ধ করো তো মাশা! তোমার একার কি অসুবিধা হচ্ছে নাকি? এখানে তো বেশিদিন থাকতে হবে না তোমাকে। ভাগ্য ভালো যে, আমরা একটা আস্ত দাচা পেয়েছি। জানো, ক্রামাতোর্স্ক আর স্ভিয়াতোহির্স্কে যাওয়া লোকজন থাকছে ছোট ছোট কেবিনে গাদাগাদি করে। ৫০ জন লোকের জন্য একটা কমন টয়লেট সেখানে!’
আসলে এই হচ্ছে আমার মা! খনিকর্মীর মেয়ে বলে কথা। দুঃখকষ্ট তাকে খুব একটা টলাতে পারে না। অল্প বয়সে কারখানায় কাজ করতে গিয়ে কম কষ্ট সইতে হয়নি তাকে। তাই জীবনের অন্যায়-অবিচার তার গা-সওয়া।
বাবা গাড়ি বের করল ভলনোভাখায় যাওয়ার জন্য। ঘরের ইলেকট্রিক্যাল কাজের কিছু জিনিস কেনা দরকার তার। আমিও পিছু ধরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। সাশারও মতলব ছিল সঙ্গে জোটার। কিন্তু মার চাহনি দেখেই তার শখ মিটে গেলো।
শহরে ঢোকার পর পাওয়া প্রথম ক্যাফেতেই থামলাম আমরা। আমি প্রথমেই ঢুঁ মারলাম টয়লেটে। বেরিয়ে দেখি, বাবা একটা টেবিলে বসতে না বসতেই তাকে ঘিরে ধরেছে একদল মানুষ। বেশিরভাগই বয়স্ক লোক। দোনেৎস্কের সর্বশেষ খবর জানতে চাইছে তারা। চোখেমুখে সহানুভূতির ছাপ। আবার কবে নিজেদেরই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয় সে ভাবনাও ভোগাচ্ছে তাদের।
কয়েকটা বাল্ব, কিছু তার আর সুইচটুইচ কিনে বাড়ি ফিরলাম আমরা। রান্নাঘর আর বাথরুমে পানি সাপ্লাইয়ের পাম্পটার ওয়্যারিংয়ের সমস্যা আছে। বাবা ইঞ্জিনিয়ার বলে এটা ঠিক করা তার জন্য ব্যাপারই না। ইংলিশ কমোড কেনা হলো না। এখানে দাম খুব বেশি। বাবা বলল, দরকার হলে মারিওপোল গিয়ে কেনা যাবে। মা’রও সেলাইয়ের কিছু জিনিসসহ ঘরের জন্য এটা সেটা দরকার। তাই ভলনোভাখায় পকেট খালি না করে একবারে মারিওপোল গিয়ে বেশি করে কেনাকাটা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ভাগ্য ভালো বলতে হবে, চুলার গ্যাসের লাইন চালু আছে। কাজেই রান্নাবান্না নিয়ে ভাবতে হবে না। ফ্রিজ অবশ্য নাই। তবে তা নিয়ে মোটেই চিন্তিত দেখলাম না মাকে। রান্নাঘরের নিচের সেলারের ভেতরটা ওপরের তলার তুলনায় অনেক ঠাণ্ডা। বেচে যাওয়া সব খাবার সেখানেই নিয়ে রেখে দিল মা।
রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। সাশা বা আমি কেউই ভেবে পাচ্ছিলাম না, কী করে সময় কাটাবো। আমরা তো এত আগে ঘুমাইনা। বাড়ির ভেতরে চার জায়গায় চারটা লাইট জ্বলছে। বাবা একটু আগেই বাড়ির পেছনের টয়লেটের কাছে একটা লাগিয়েছেন। তা ছাড়া চারদিকে আলো বলতে কিছু নাই। চাঁদও তেমন আলো দিচ্ছে না। দাচার বাইরের রাস্তা আর আশপাশের বাড়িগুলোতেও ভুতুড়ে অন্ধকার। আশেপাশে মানুষজন বলতে আদৌও কেউ আছে কি! এখানে আসার পর থেকে একটা প্রাণীকেও দেখি নাই আমরা।
মোবাইলের নেটওয়ার্কের দেখলাম জঘন্য অবস্থা। কোনমতে মেসেজ দেওয়া চলে। নেট ব্রাউজ করার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের সবার ভলনোভাখায় আসা নিয়ে ইরার সঙ্গে আমার হাল্কা আলাপ হয়েছিল। ও কথা দিয়েছিল যত তাড়াতাড়ি পারে ইগরের কাছে খবরটা পৌঁছে দেবে।
সাশা মোবাইলের নেট দিয়ে আমার ল্যাপটপে কাজ করার জন্য ঘ্যান ঘ্যান শুরু করল। নেটের অবস্থা যা তা- এ কথা যে তাকে কতবার বললাম, হিসাব নাই। সে তার মতো বলেই চলল এক কথা।
ঝামেলার এখানেই শেষ না, আমার ফোনের ডেটাও ফুরিয়ে যাচ্ছে। কাল মা আর বাবা মারিউপোল রওয়ানা হওয়ার পর সাশাকে নিয়ে আমি মোবাইলে ডেটা ভরতে ভলনোভাখায় যাবো বলে ঠিক করলাম। জায়গাটা কাছেই, হেঁটেই যাওয়া যাবে।
আমাদের কাছে ল্যাপটপ একটাই। সেটা মূলত আমিই চালাই। মা চায়, আমি যেন এটা দাচাতেই রেখে যাই। বাবা আর আমি কিয়েভে পৌঁছানোর পর আমার জন্য নতুন একটা ল্যাপটপ কেনা হবে। দাদু আমাকে খামে ভরে যে টাকাটা দিয়েছিল তা দিয়েই কেনা হবে নতুন ল্যাপটপটা।
এখানে আসার পর থেকে বেনিচকা প্রায় পুরো সময় শেকলে বাঁধা রয়েছে। কাল আমি আর সাশা উঠানের ঝোপঝাড় আর আগাছা পরিস্কার করতে নামবো। ওই জংলা ঘাস আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে বেনিচকার জন্য কী বিপদ লুকিয়ে আছে কে জানে! এত ঝোপজঙ্গল সাফ করতে জান বেরিয়ে যাবে। তবে এমনিতে আলসের হাড্ডি সাশা তার প্রিয় কুকুরের ভালোর জন্য জান দিতেও আপত্তি করবে না।
সবাই মিলে হাত লাগানোয় দিনদুয়েকের মধ্যেই দাচাটা মোটামুটি বাসযোগ্য হয়ে উঠলো।
(চলবে)




