ঝরা পাতার সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ওকেলো হাঁটতে হাঁটতে আমাদের নিয়ে গেলেন একটা ছোট দোকানে। ‘ব্ল্যাক বার্গার’ নামে এক ধরনের বার্গার বিক্রি হচ্ছিল সেখানে। বার্গারের বানটা সত্যিই কুচকুচে কালো। ওকেলো মজা করে বললেন, ‘অবশেষে এমন একটা জিনিস পাওয়া গেল, যেটা কিনা আমার চেয়েও কালো।’
কৌতুকটায় আমরা কেউই হাসলাম না। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার মধ্যে কাটলো। নৈশব্দটা যে খুব অস্বস্তিকর তা বলবো না, তবে খুব ভালোও লাগছিল না কথাটা।
বার্গার নিয়ে আমরা যার যার বিনব্যাগে ফিরে এলাম। ওকেলো টাকা নিয়ে বলতে শুরু করলেন। শুরু থেকেই বেশ আগ্রহ জাগিয়ে তুললেন তিনি। টাকা কীভাবে সম্পদের মূল্য ধরে রাখে, কেনাবেচার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, আর কীভাবে কোনো কিছুর দাম মাপার একক হয়ে ওঠে—এত সহজ করে তিনি বিষয়গুলো বোঝালেন যে আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম।
ওকেলো
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবে, টাকা হিসেবে যা-ই ব্যবহার করা হোক না কেন—সোনা, রূপা, কিংবা রেশম বা তামাকের মতো অন্য কোনো পণ্য—সেগুলোর নিজস্ব মূল্য ছিল। সোনা যেমন তুমি টাকা হিসেবে ব্যবহার করতে পারতে, আবার তা গলিয়ে দামি গয়নাও বানানো যেতো। রেশম দিয়ে কেনাবেচা করতে পারতে, আবার চাইলে তা দিয়ে কাপড়ও বুনতে পারতে। স্বর্ণমুদ্রার গায়ে রোমান বা অন্য কোন সাম্রাজ্যের রাজকীয় সিলমোহরও থাকতে পারত। কিন্তু তাতে সেগুলোর মূল্যবান ধাতু হিসেবে ব্যক্তিগত সম্পদ হতে বাধা থাকতো না।
এমনকি কাগজের মুদ্রাও ঐতিহাসিকভাবে তামা, রুপা বা সোনার মতো নিজস্ব মূল্য আছে এমন কিছুর বিপরীতেই চালু করা হতো। জিনিসটার প্রথম প্রচলন হয়েছিল একাদশ শতকের চীনদেশে।
মিকিতা
আপনার পয়েন্টটা বুঝতে পারছি। ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ধরে টাকা আসলে ব্যক্তিগত সম্পদের মতোই ছিল। নিজের বলে দাবি করা যায় সোনারূপার মতো এমন বাস্তব কিছুর দ্বারা সমর্থিত ছিল তা। এতে মানুষ এক ধরনের সুরক্ষা পেত, কারণ সরকারকে টাকার বিপরীতে বাস্তব মূল্যবান কিছু মজুত রাখতে হতো। এই না বিষয়টা? তা, এই ব্যবস্থাটা কখন ভেঙে গেল?
ওকেলো
ফিয়াট মুদ্রা নিয়ে ইতিহাসে কয়েকবারই পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ত্রয়োদশ শতকের চীন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ইউরোপ—যখন সেখানে সোনা বা রূপার মজুত ফুরিয়ে এসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুটো ক্ষেত্রেই মুদ্রাস্ফীতি আর অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ব্যবস্থা হয় ভেঙে পড়ে, নয়তো পরিত্যক্ত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপ আবার সোনা-রূপার সংকটে পড়ে। এ অবস্থায় ১৯৪৪ সালে মিত্রশক্তির ৪৪টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ছোট্ট শহর ব্রেটন উডসে বৈঠকে বসে। সেখানেই স্বাক্ষরিত হয় অর্থনীতির আলোচিত ব্রেটন উডস চুক্তি।
চুক্তিটা ছিল সহজ। যুদ্ধের পর মার্কিন ডলারই হবে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি ৩৫ ডলার ছাপানোর বিপরীতে এক আউন্স সোনা মজুত রাখার অঙ্গীকার করে। ঠিক হয়, অন্য দেশগুলো তাদের রিজার্ভ হিসাবে ডলার রাখবে এবং নিজেদের মুদ্রার বিনিময় হার স্থির করবে ডলারের বিপরীতে। এর মাধ্যমে তাদের মুদ্রার পেছনেও পরোক্ষভাবে সোনার মজুতের সমর্থন থাকবে। কারণ ডলারের পেছনে সোনার ভিত্তি থাকবে।
কিন্তু ১৯৭১ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র এত বেশি টাকা ছাপিয়ে ফেলেছিল যে, মজুত রাখা সোনার তুলনায় ডলারের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ হয়ে গিয়েছিল। বিদেশি সরকারগুলো তাদের হাতে থাকা ডলারের বিনিময়ে সোনা চাইতে শুরু করল।
সোনার মজুত দ্রুত কমে যাওয়া ঠেকাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন দ্রুত ব্যবস্থা নিলেন। হুট করেই ডলারের সঙ্গে সোনার বিনিময়যোগ্যতা বন্ধ করে দিলেন তিনি।
সেই মুহূর্ত থেকে ডলার– এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব মুদ্রাই–ফিয়াট মুদ্রায় পরিণত হলো—যার পেছনে সরকারের প্রতি আস্থা ছাড়া বাস্তব কোন কিছুর সমর্থন নেই।
কাতিয়া
যুদ্ধের সঙ্গে এর সম্পর্কটা কী?
ওকেলো
আরে বাবা, ভাবো না একটু! মাথাটা একটু খাটাও। ব্যাপারটা মোটেই এত কঠিন কিছু না।
আমি
বিশ্বের সরকারগুলোর তো এখন আর যুদ্ধে যাওয়ার জন্য জনগণের অনুমতি লাগে না। এমনকি জনগণের টাকারও প্রয়োজন হয় না সরকারের। তারা চাইলেই টাকা ছাপতে পারে।
ওকেলো
ঠিক। ভাবো তো, কোনো গণতান্ত্রিক সরকার একজন বিদেশি স্বৈরশাসককে হঠানোর জন্য যুদ্ধ করতে নাগরিকদের তাদের সারা জীবনের সঞ্চয়ের ২০ শতাংশ দিতে বললো। অথচ দেশটা দশ হাজার মাইল দূরে! তারা কী বলতে পারে জবাবে?
আমি
তারা পারলে পরের দিন সকালেই ভোট দিয়ে ওই সরকারকে তাড়াবে। কিন্তু সরকারের তো এখন আর আমাদের তরফ থেকে অনুমোদন বা অর্থ লাগে না। ২০ শতাংশ টাকা ছেপে নিলেই তার কাজ হয়ে যায়।
ওকেলো
ভালো বলেছো। ও হ্যাঁ, তোমাদের শহরের মেয়র কিন্তু একসময় বিখ্যাত বক্সার ছিলেন। তাই মুহাম্মদ আলীর কথা হয়তো শুনে থাকবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করার সময় আলী বিখ্যাত সেই কথাটি বলেছিলেন—‘ভিয়েত কংদের সঙ্গে আমার তো কোনো বিরোধ নেই।’ আরেকবার বলেছিলেন, ‘কোনো ভিয়েত কং আমাকে নিগার বলে গাল দেয়নি।’
আলী শুধু যুদ্ধে যেতে অরাজি হননি—মার্কিন সরকারের দৃষ্টি দেশের ভেতরের সমস্যাগুলোর দিকে ফেরানোরও দাবি জানিয়েছিলেন। আসলে সাধারণ মানুষের যদি সত্যিই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে তারা নিশ্চয়ই নেতাদের বলত, বিদেশে যুদ্ধ করে টাকা নষ্ট না করে আগে দেশের ভেতরের সমস্যাগুলো ঠিক করুন।
যুদ্ধের ব্যয় মেটানোর জন্য টাকাপয়সার প্রয়োজনের বাধাটা উঠে যাওয়ার ফলে পররাষ্ট্রনীতি আর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এজেন্ডার মধ্যকার সীমারেখাটাও ধুসর হয়ে গেল। আর এর সঙ্গে নীরবে দীর্ঘ হতে থাকলো যুদ্ধ শুরুর পক্ষের যুক্তিগুলোর তালিকাটাও।
দেশে আপনার সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে? কোনো সমস্যা নেই। জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে একটা যুদ্ধ শুরু করুন। দেখুন, কীভাবে জনসমর্থনের ঢেউয়ে চড়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসা যায়।
মন্দা চলছে? যুদ্ধ বাধিয়ে দিন—অর্থনীতিতে গতি চলে আসবে। শুরু হয়ে যাবে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া।
আপনার অস্ত্রশিল্পের বন্ধুবান্ধবদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না? যুদ্ধ শুরু করুন, তারপর দেখুন কত সহজে জনগণের অর্থ নিঃশব্দে গিয়ে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে।
গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আমরা ছাড়া আর মাত্র দুচারজন রয়ে গিয়েছিলাম। মেট্রো বন্ধ হয়ে গেছে। তাই দুটো ট্যাক্সি ডাকা হলো। ট্যাক্সির জন্য বসে থাকার সময় কাতিয়া চুপচাপ আমাদের ফেলে রাখা ন্যাপকিন, খাবারের মোড়ক আর কাপগুলো কুড়াল। ওকেলো ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি বললেন, ইউক্রেনীয়রা যে কাজকর্ম বা অনুষ্ঠান করার পর পার্কের মতো জায়গাগুলোর এত যত্ন নেয়, সেটা তার খুব ভালো লাগে।
(চলবে)



