শীতের সকালে ইচক দুয়েন্দের সঙ্গে

ইচক দুয়েন্দে
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিন পর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় আমার মাথার ওপর দিয়ে একটা উড়োজাহাজ উড়ে গেল। উড়োজাহাজটা এত নিচে দিয়ে উড়ে গেল, আমি স্পষ্ট দেখলাম এর জানালা দিয়ে নানাদের আধিয়ার কিসমতুল্লাহ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। আমার সঙ্গে স্কুল ফেরত ছেলেমেয়েরা উড়োজাহাজটা দেখতে পেলেও কিসমতুল্লাহকে কেউ দেখতে পায়নি। বাড়িতে ফিরে মামাকে ঘটনাটা বললে হাসতে হাসতে মামার হেঁচকি উঠে গেল। একটু ধাতস্থ হয়ে মামা বললেন, ‘গাধা! উড়োজাহাজ যত নিচে দিয়েই উড়ে যাক, জানালায় বসে থাকা কাউকে দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। তার চেয়ে বড় কথা, কিসমতুল্লাহ গত মাসেই মারা গেছেন।’
আমার ছোটবেলার এ গল্প মাত্র একজনই বিশ্বাস করেছিল। আমি আর শামসুল কবীর কচি হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম টিকাপাড়া গোরস্তান পর্যন্ত। আকন্দ আঁশ-শ্যাওড়ায় ভরা জঙ্গলা জায়গায় দাঁড়িয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবরগুলো দেখে আমার কিসমতুল্লাহর কথা মনে পড়েছিল। গল্পটা শুনে কচি বলেছিল, ‘এটা তো হতেই পারে। সবাই সবকিছু দেখতে পায় না।’
রাজশাহীতে আমরা ইচক দুয়েন্দের বাড়ির ছাদে বসে আছি। শীতের সকালে রোদটা বেশ মিষ্টি। বাড়ির পেছন দিকে পরিত্যক্ত টিনের চালের বাড়িতে একটা কাঁঠাল আর গোটা দুই বরইগাছ দেখতে পাচ্ছি। বরই পাতা গরম জলে ভিজিয়ে মৃতদের গোসল করানো হয়। দেশে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই ক্ষুধা, দারিদ্র্যের মতো অনিবার্য আর যুদ্ধ, দাঙ্গা, জাতিগত সংঘর্ষের মতো অপ্রয়োজনীয় কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। যাদের আমরা একসময় ছোট দেখেছিলাম, তারা সবাই বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আমাদের আরও বেশি করে বরইগাছ লাগানো দরকার।
রেলস্টেশনের পেছনে এলএসডির ঢেউখেলানো কালচে-লাল রঙের প্রকাণ্ড টিনের ছাউনির পেছনে একটা লাল রঙের দোতলা বাড়ি ছিল। দুপাশে কচুরিপানা ভরা ডোবার মাঝখান দিয়ে একটা সরু পথ ধরে সেই বাড়িতে যেতে হতো। কচি ছাড়া আর কারা সেই বাড়িতে থাকত, আমি জানি না। কারণ, সেই বাড়িতে আমি কখনো যাইনি। সেই লালঘর থেকে বেরিয়ে ইচক দুয়েন্দে হয়ে উঠেছিল সে। তারপরও তাকে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে। সেসব দিনের কথা আমরা ভুলে গেছি।
জয়পুরহাট নামের ছোট্ট শহরের শিশু-কিশোররা বড় হয়ে গেছে। এখানে কেউ ইচক দুয়েন্দেকে চেনে না। কারণ, এ শহরের মানুষ এখন আর বই পড়ে না। এক সময় শহীদ আবুল কাসেম ময়দানের প্রান্তে পাবলিক লাইব্রেরির অপরিসর কক্ষে বইপড়ুয়ারা ভিড় জমাত। লম্বা দুটি টেবিলে তাদের জায়গা দেওয়া যেত না। এখন লাইব্রেরির টেবিলে আরও দীর্ঘ হয়েছে, কিন্তু কেউ সেখানে বসে না। আলমারি ভর্তি বই কেউ ছুঁয়েও দেখে না। শুধু এ শহরে নয়, এ দেশের কোনো শহরেই কেউ আর বই পড়ে না।
অথচ বই পড়া শুধু নয়, বই ছাপানোর জন্যও আমরা প্রেসে পড়ে থাকতাম। ঘোড়ামারার মুকুল প্রিন্টিং প্রেসটা কি আছে! আমরা মুহূর্তেই চল্লিশ বছর পেছনে চলে যাই। ভিজিকিটি বুড়ো কাঠের আপার-লোয়ার কেসের খোপ থেকে সিসার অক্ষর তুলে যত্নের সঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোঁয়ারি’ কম্পোজ করছেন। গ্যালিতে অক্ষর সাজাবার সময় বারবার বলছেন, ‘বড় ভিজিকিটির কাজ!’ প্রেস মালিক-কাম কম্পোজিটারের নাম আমরা মনে রাখতে পারিনি। তিনি প্রতিটি কথার মধ্যে অন্তত একবার বলতেন, ‘ভিজিকিটি’— তাই তার নামই হয়ে গিয়েছিল ভিজিকিটি।
আমি কচিকে বলেছিলাম, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দুই-একটা গল্প পড়েছি। তার বই তো ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হতে পারে।’ কচি বলেছিল, ‘অন্য ঘর অন্য স্বরের পরে ঢাকায় আর প্রকাশক পাচ্ছেন না। তিনি যে কত বড় মাপের লেখক, প্রকাশকরা এখনো বুঝতে পারেননি।’
মুকুল প্রেসের ট্রেডল মেশিনে ছাপা হয়েছিল খোঁয়ারি। রাজশাহী শহর থেকে ট্রেডল মেশিন উধাও হয়ে গেছে। আসলে আপার-লোয়ার কেস থেকে অক্ষর তুলে সাজানোর ঝামেলা সারা দেশ থেকেই উঠে গেছে এবং ভিজিকিটি বুড়োও যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তারপরও প্রকাশিত হয়েছে ইচক দুয়েন্দের সখাবাবা, লালঘর, টিয়াদুর!
আমি আগেই শুনেছিলাম, ইংরেজি অক্ষরে ‘কচি’ উল্টে দিলে হয় ইচক আর দুয়েন্দে স্প্যানিশ লোককাহিনির একটা চরিত্র। ব্যাপক অর্থে বলা যায় অলৌকিক কোনো শক্তি, ভূত, প্রেত ইত্যাদি...। রাজশাহীর একটা সাহিত্য উৎসবে এসে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সামনে হাসান আজিজুল হকের সমাধিতে পুষ্পস্তবক রেখে আমরা এসে বসেছি একটা শামিয়ানার নিচে। মনিস রফিক ছবি তোলে, অধ্যাপক রুহুল আমীন প্রামাণিক এসে আড্ডায় যোগ দেন। আমরা পুরনো বন্ধুদের আর লেখালেখি ও রাজনীতির জগতের মানুষের কথা বলি। বুমেরাংয়ের প্রকাশক মূর্তজা রেজা, ছাত্রনেতা মোর্শেদ কোরেশী স্বপন প্রয়াত। আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন এনায়েত হোসেন।
গোপালগঞ্জ থেকে একদিন কমরেড এনায়েত ফোন করেছেন। রাজশাহীর মাস্টারদা, কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি কমরেড আবুল হাসনাতের নম্বরটা দরকার, কথা বলতে চান। বললাম, ‘অনেক দিন আগে আমি পার্টি ছেড়েছি, তার নম্বর নেই, তবে জোগাড় করে দেওয়া যাবে।’ কচি নিশ্চয়ই নম্বরটা দিতে পারবে। কল করতেই বলল, ‘কাল সকাল সাড়ে দশটায় দোসর মণ্ডলের মোড়ে আসেন, দেখা হবে আর নম্বরটাও তখন দিয়ে দেব।’
দোসর মণ্ডলের মোড় থেকে মঠপুকুর পর্যন্ত হেঁটে যেতে যেতে কচি বলল, ‘মাস্টারদার নম্বরটা নিয়ে এসেছি তবে সেটা আর কোনো কাজে লাগবে না।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’ কচি বলল, ‘গত রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে উঠে ওজু করার সময় মাস্টারদা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।’
কী আশ্চর্য! কয়েক বছর পরে যেদিন তার খোঁজ করলাম, সেই রাতেই তার যাওয়ার সময় হলো। এর কোনো ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। ছাত্রদের প্রিয় অঙ্ক শিক্ষক, কট্টর নাস্তিক এবং নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট মাস্টারদার মৃত্যুতে আমি যতটা না শোকাহত হলাম, তার চেয়ে বেশি বিস্মিত হলাম তার রূপান্তরের কথা শুনে। মঠপুকুরের পাড়ে বসে কচি বলল, ‘মাস্টারদা পার্টি ছেড়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে। তারপর হয়তো পুরনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দাড়ি রেখেছেন, টুপি পরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে মসজিদে যেতেন। কিন্তু তিনি যে গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদ ধরেছিলেন, সেটা আমারও জানা ছিল না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেও কচি দেয়নি। মার্ক্সবাদী সাহিত্যসহ ওর পড়াশোনা সমসাময়িক যেকোনো কমরেডের চেয়ে বেশি ছিল। মাস্টারদা বলেছিলেন, ‘ও তো ক্যারিয়ারিস্ট। সেলফ সেন্টার্ড ম্যান ক্যান নেভার বি অ্যা কমিউনিস্ট!’ আমি জানতাম, কচি ক্যারিয়ারিস্টি বা আত্মকেন্দ্রিক কোনোটাই নয়। মাস্টারদা কথাটা আমার সামনে বললেও আমি কোনো দিনও কচিকে তা বলিনি। আজ শুধু বললাম, ‘তুমি পার্টি না করলেও একটা দিক থেকে কিন্তু মাস্টারদার ভাবশিষ্য।’ ‘কেমন করে?’ এবার কচি বিস্মিত। ‘মাস্টারদার মতো তুমিও বিয়ে না করার প্রতিজ্ঞা করেছ।’
‘আমাকে বরং অকৃতদার প্রশান্তদার অনুসারী বলতে পরেন। লালঘর তাকেই উৎসর্গ করেছি।’
‘প্রশান্তদার ব্যাপারটা আমি জানি... তরুণ বয়সে তিনি যখন বামপন্থী রাজনীতির আর পদ্মা রঙ্গমঞ্চে নাটক করতেন, সেই সময় ছাত্র ইউনিয়নের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। মেয়েটি সোভিয়েত ইউনিয়ন চলে যাওয়ার পর সেখানেই এক কমরেডের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হলে প্রশান্তদা চিরকুমার ব্রত অবলম্বন করেছেন।’
‘লালঘর’-এর পঞ্চম অধ্যায়ের শুরুতে ‘তিথি বরাভয়ের কথা শুনলে, আজকে আমার এ দশা হয় না।’ লাইনটা পড়ে আমার মনে হয়েছিল কে এই তিথি বরাভয়! যে পুঁই চুলভি, প্রকৃতপক্ষে ইচক দুয়েন্দেকে সাহস জোগায়, তাকে অন্য কারও সঙ্গে মেলানো যায় না। একটা জিজ্ঞাসা আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কচিকে সেই প্রশ্নটা আমি আর করি না। লেখকের লেখার বা তার সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। লেখকরা শুধু চরিত্র নয়, ভূগোল এবং ইতিহাসও অনায়াসে তৈরি করে নিতে পারেন।
কচি কোনোদিনও মাস্টারদা সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলেনি। কিন্তু তার মৃত্যুর দিনেই প্রথমবারের মতো বলল, ‘আমি জানতাম মাস্টারদা শেষ পযর্ন্ত তার বিশ্বাসে অটল থাকতে পারবেন না। আমি কোনো মন্তব্য করি না। আমাকে নিশ্চুপ দেখে কচি আবার বলে, ‘চলেন একজন এক্স-কমিউনিস্টের নামাজে জানাজা পড়তে যাই। বাদ আসর, শিরোইল স্কুলের মাঠে।’
আমি মাস্টারদার জানাজায় যাই না, কচি গিয়েছিল কি না, তাও আর জানা হয়নি।
আমার এবং কচির কারোরই সেসব দিনের আলোচনার কোনো আর কোনো প্রয়োজন ছিল না। তারপরও অপ্রয়োজনে আমরা ছাদে বসে থাকি। আমি ‘টিয়াদুর’ পড়ে শেষ করতে পারিনি। কচি বলে, ‘একসময় আপনার অনেক ধৈর্য ছিল।’ বইয়ের ২৫৫ পৃষ্ঠার একটা জায়গায় আমার দৃষ্টি থমকে গিয়েছিল। আমি সেই লাইনগুলো মনে করার চেষ্টা করি।
‘একদিন পৃথিবীতে মানুষ সন্ধান করবে প্রকৃত ভালোবাসা। বিত্ত নয়, শক্তি নয়, স্বার্থ নয়, শুধু প্রকৃত ভালোবাসা। একদিন প্রকৃত নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হবে যুগলের মিলনের ভিত্তি। তখন তাদের সন্তানরা হবে সত্যিকারের স্বর্গীয়। তাদের মনে থাকবে না হিংসা, বিদ্বেষ। তারা মাতবে না ধ্বংসের খেয়ালে। একদিন পৃথিবী তেমন হবে। সেদিন আমি থাকব না।’
সকালের রোদ বাড়তে থাকলে তা আর মিষ্টি থাকে না। আমরা গার্ডেন চেয়ার দুটো ঘুরিয়ে নিয়ে রোদে পিঠ পেতে দিই।




