সাখাওয়াত টিপুর কবিতা

কবির প্রতিকৃতি ল্যুক ফ্রাঙ্কুইস গার্নিয়ার
অভাবের প্রেম
মধ্যরাতে জেগে ছিলাম তোমার অপেক্ষায়
উড়ে কি আসবে তুমি আমার আকাশে, হায়!
তারা ডুবে যাবে, আর তারা একতারা হাতে
সুরের তরঙ্গে তারাকে মেলাবে অন্ধকার রাতে!
আমি ঘুমহীন চোখে আকাশে তাকিয়ে খান
কানের পাশেই কেবল উড়ছে ধ্রুপদি কামান!
কান জেগে ছিল, জেগে ছিল চোখের পাতাটি
কার অপেক্ষায় ভোররাতে একা মহাকাশে হাঁটি
আলম্ব ধোঁয়ার সারি যদি মেলে সফেদ সোয়ারে
আমার বাড়িটি কি উঠেই যাবে আইনেস্পেয়ারে
হায় তুমি উঠে গেলে কোথাও পাব না খুঁজে
রব আমি নিশিদিন একাকী দু’চোখ বুজে!
কী হবে আকাশে থেকে, মাটিতে কত না ভেদ
মহাবল কি কমাতে পারবে মহাকর্ষের বিচ্ছেদ?
বিজ্ঞানই ভালোবাসি, আমি কেন তবে প্রকৃতির দাস
নিয়ত তোমার অভাবে আমার বাড়ে রিক্ত হা-হুতাশ!
হে নৈঃশব্দ্য
ঘুম ছাড়া অবলা রাত্রির কোনো চোখ নেই
আছে হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে আজন্ম না ফেরার অনুভব
আছে ঘোর স্বপ্ন থেকে পালিয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস
যেভাবে গেলেই কেউ বলবে, আহ্ বড় শান্তি!
ভাবি—যদি শিরা কেটে একা একা মরে যাই
যদি মরে গিয়ে বেঁচে যাই চিরায়ত অন্ধকারে
হয়তো মায়াকান্নায় নাক ডুবিয়ে বলবে কেউ—
বেচারার সব দোষ জীবনানন্দ দাশের ট্রামের
যে শব্দ আমাকে অর্থহীন করেছে সে নির্বাক
আঙুলের ফাঁক গলে অসময়ে কাঁপছে একাকী
তাড়া নেই কোনো, তারা শুধু বেহালার তারে
মৃত্যু আমাকে ডাকছে নিঃসঙ্গ সাগরপাড়ে।
মথুরা গায়েন
ছবির আড়ালে তুমি অনেক চঞ্চল
যদি ছবি হও তবে স্থির কেন বল
ছুঁয়ে দেখি সোনা কাচের ওপরে কাঠ
মায়া সভ্যতার আগে যেন ত্রোস্তপাঠ
আঙুলে যে লেগে আছে সমস্ত ইন্দ্রিয়
নিতে পারো হাত মুখ যতি বায়বীয়
যে জীবন আমার না সেই কি তোমার
দেহ ছেড়ে বের হয় অতীন্দ্রিয় ভার
দুপুর গড়ায় রোজ মহাকাশ ডোরে
ইশারা স্মৃতির তারা রাতমাখা ভোরে
ফলিত মাঠের পর গোপন শরীর
জানু পাতা বোবাতুর মাদুলি বধির
আমি তব বিন্দুসম তুমি যত দূর
বাগে কি ইন্দ্রিয় সহে না করে কসুর
এখন কি গান গাইবে মথুরা গায়েন
স্তনের আড়ালে মুখ ঠোঁটে রাখা ধ্যান
ভাষা বদলের খেলা
ভিডিও কলে আমরা—একা
কেবল নিজের কথা বলি না!
আমরা শুনি অসম্ভবের শব্দ।
পরস্পরকে আমরা দেখি, তবু
না বলা কথায় কথা আছে ঢের
কথ্য ব্যথা আছে অনেক দূরের
পরস্পরকে আমরা দেখি—দেখি
চোখের পাতা কীভাবে নড়ছে
ঠোঁটের ভাষা কীভাবে বদলাচ্ছে
আমরা শুনি নৈঃশব্দ্যের কথা।
তোমার ঠোঁট আমার ঠোঁটে
এক ক্যামেরায় একেক রকম
সারা রাত ভিডিও কলে আমরা
কেবল কথা বলি না,— ঢের
ঘরের ভেতর দেখি নিজেদের।
হায় তাকিয়ে আছি মুখের দিকে
আমরা শুধুই আমরাই, যদিও—
কোনো শব্দ নাই, সুরও নাই
শুনতে শুনতে লাল হচ্ছে কান
দেহের ভেতর দুই-হাতি টান
অনেক দূরের শুনে যাচ্ছি গান!
বদলে যাওয়া ভাষার আভাস
বলতে বলতে দীর্ঘ হচ্ছে শ্বাস
চুলেরা উড়ছে ফ্যানের বাতাসে
বুকের ভে-ত-র অনেক দূরের
ক’কুঠুরি সাক্ষী রেখে অগ্নিপাখি
গুনগুনিয়ে বার্তা নিয়ে মগ্নরাতে
একতরঙ্গে জাগায় শুধু রক্তলীলা
থাকো তুমি লগ্ন স্বরে অন্ধকারে
দিব্যচোখে তীব্র চোখের ভেতর।






