যে জীবন মনে পড়ে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৃষ্টি থামার আগের শহর আর বৃষ্টি থামার পরের শহর— দুটো যেন আলাদা পৃথিবী। খানিক আগেই ঝুম বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন শুধু ফোঁটায় ফোঁটায় ঝিরঝিরে পড়ে চলছে। ফুটপাতে মানুষে ঠাসাঠাসি। কেউ ছাতা গুটিয়ে হাঁটছে, কেউ দোকানের কার্নিশের নিচে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে। প্লাস্টিকের শেডে বৃষ্টির পানি টুপটাপ পড়ে আর সেই শব্দ শহরের কোলাহলের ভেতরেও আলাদা করে শোনা যায়। টিনের চালে বৃষ্টির পড়ার শব্দ যারা শুনেছেন তাদের কাছে এ শব্দ খানিকটা বিরক্তিকরই।
এই বৃষ্টিতে ভিজে, বিরক্ত, ব্যস্ত পৃথিবীর মাঝখানে বসে আছেন গুলেজান বেগম। মাথায় মলিন ওড়না, হাতে একটি পুরনো টিনের বাটি। বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে ওড়নার প্রান্ত, কিন্তু চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই। যেন এ ভেজা, ঠান্ডা, দমবন্ধ করা শহরের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। অথবা সবই মেনে নিয়েছেন তিনি। চেহারা দেখে তার বয়স বোঝা কঠিন। ৬০ পার করেছেন— এটা বোঝা যায় তার হাতের চামড়ার ভাঁজে, চোখের কোণের গভীর রেখায়। কিন্তু তার চেয়ে বেশি বোঝা যায় তার দৃষ্টিতে— যেন জীবনের অনেকটাই হেঁটে পেরিয়ে এসেছেন, এখন আর তাড়াহুড়া নেই।
আজ তার টিনের বাটিতে খুব একটা কিছু পড়েনি। কয়েকটা ভেজা দশ টাকার নোট, কিছু খুচরো পয়সা। অথচ শহরের রাস্তায় হাঁটুসমান পানি, গাড়ি বন্ধ, মানুষ বিরক্ত— এমন দিনে সাধারণত ভিক্ষা একটু কমে। আজকের দশা আরও খারাপ। বাটিটা যে প্রায় শূন্য তা নিয়েও গুলেজান বেগমের কোনো আক্ষেপ নেই। এই শহরে বা এই পৃথিবীতে তার উপস্থিতির মতোই সব অবহেলা যোগ্য।
গুলেজান তাকানও না কারও দিকে। কেউ টাকা দিলেও তিনি চোখ তুলে ঠিকমতো দেখেন না। যেন এই টাকা, এই মানুষ— সবকিছুই তার কাছে অচেনা। অচেনা মানুষের দিকে তাকিয়েইবা কী লাভ। চেনা চোখের তাপ বহুদিন পান না তিনি।
‘আমি যদি সব মনে রাখি... আমি বাঁচব কীভাবে?’ সব ভুলে গিয়ে তো বেঁচে ছিলাম। আবার সব মনের মধ্যে ভিড় করলে বাঁচব কীভাবে?
নিজের স্বজন বলতে যা বোঝায় তেমন কেউ আছে কি না, তাও ঠিক মনে নেই তার। গুলেজান থাকেন গুপ্তিপাড়া বস্তিতে। একটা টিনের চাল, পলিথিন টাঙানো দেয়াল, মাটির ওপর সিমেন্টের ফাটল ধরা মেঝে। সেই ঘরেই তার রাত কাটে। দিনও কাটে নগণ্য জীবনের সবটুকু নিয়ে।
কিন্তু নিজের ‘বাড়ি’ বলতে যে জায়গা, তার কোনো ঠিকানা গুলেজানের মাথায় ঠিকমতো নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়— তার একটা বাড়ি ছিল, নদীর ধারে। বড় একটা আমগাছ ছিল উঠোনে। আবার কখনো মনে হয়—সবটাই কল্পনা। হয়তো তার কোনো বাড়িই ছিল না কোনোদিন।
তার কি বিয়ে হয়েছিল? কখনো কখনো মনে হয়, হ্যাঁ— একজন মানুষ ছিল, লম্বা, শীর্ণ, হাসলে চোখ চিকচিক করত। আবার কখনো মনে হয়— না, এসব গল্প হয়তো অন্য কারও।
এসব প্রশ্ন কেউ গুলেজানকে জিজ্ঞেস করে না। আর সে নিজেও এখন আর খুব একটা মনে করার চেষ্টা করে না। বারবার একা একা ভাবতে ভাবতে তার স্মৃতিগুলো যেন ফিকে হয়ে গেছে, রঙ হারানো পুরনো ছবির মতো।
কিন্তু আজ কী যেন হয়েছে।
বৃষ্টির দমকটা যখন একটু থামল, শহরের শব্দগুলো ফের ফিরে এলো— হর্ন, চিৎকার, দোকানে দরদাম। সে ফাঁকেই গুলেজানের বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঢেউ উঠল।
তিনি হালকা করে কেঁপে উঠলেন।
‘আমগাছটা...,” তিনি যেন খুব আস্তে নিজেকেই নিজে বললেন। ‘ওই আমগাছটা তো ছিল...”
‘খালা, বসে আছেন অনেকক্ষণ?’ জিজ্ঞাসাটি মায়াময়। কিন্তু তাতে গুলেজানের খুব ভাবান্তর হলো না।
গুলেজান তাকালেন, কিন্তু উত্তর দিলেন না।
ছেলেটা নিচু হয়ে বাটিতে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট রাখল। তারপর একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল,
‘আপনার নাম কী?’ প্রশ্নটি গুলেজান নিজেকেই করলেন আবার— আমার নাম কী? উত্তর পেতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিতে হলো। মনে পড়লে তার। গুলেজান এবার ধীরে বললেন, ‘গুলেজান... গুলেজান বেগম।’ কেন, আমার নাম দিয়া আপনে কী করবেন? ছেলেটা একটু চমকে উঠল।
‘গুলেজান বেগম?’ সে যেন নামটা কোথাও শুনেছে।
‘আপনি কি আগে...,’ ছেলেটি থেমে গেল, ‘না, থাক।’
গুলেজানও আবার চুপ। ছেলেটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল গুলেজানের মুখের দিকে। তারপর ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিল।
‘খালা, একটা ছবি তুলতে পারি?’
গুলেজান না বললেন না, হ্যাঁও না। ক্যামেরায় ক্লিকের শব্দ হলো কয়েকটি। এরপর ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখল ছেলেটি।
ছেলেটার নাম ওয়াসিফ। সে একটি অনলাইন পোর্টালের সাংবাদিক। শহরের বৃষ্টি-পরিস্থিতি, জলজট আর মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে ফটোস্টোরি করতে হবে তাকে। কিন্তু গুলেজানের ছবি তোলার পর তার মাথায় ঘুরতে লাগল সেই নাম— ‘গুলেজান বেগম’। দুদিন আগে সে আর্কাইভে একটি পুরনো রিপোর্ট পড়েছিল। প্রায় ত্রিশ বছর আগের একটা রিপোর্ট। নদীভাঙনে হারিয়ে যাওয়া এক নারী— গুলেজান বেগম। সেই রিপোর্টে লেখা ছিল— তিনি ছিলেন এক গ্রামীণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ওয়াসিফের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘খালা, আপনি কোনোদিন স্কুলে পড়াতেন?’ গুলেজান প্রথমে কিছু বুঝতে পারলেন না। তারপর হঠাৎ তার চোখে একঝলক আলো এলো।
‘স্কুল?’ তিনি ফিসফিস করে বললেন। তারপর যেন দূর কোথাও তাকালেন। ‘হ্যাঁ... বাচ্চারা ছিল... তারা কবিতা বলত...।’ তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। স্মৃতির দরজা এবার একটু একটু করে খুলতে লাগল। নদীর পাড়ে একটা ছোট্ট স্কুলঘর। মাটির মেঝে, টিনের ছাদ। বাচ্চাদের কোলাহল। আর একজন মানুষ— তার স্বামী।
‘ওর নাম ছিল...,’ গুলেজান চেষ্টা করলেন মনে করতে, ‘সালাম... না... শফিক?’ তার কপাল কুঁচকে গেল। হঠাৎ তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। ‘পানি... পানি আসতেছিল...,’ সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘রাতের ভেতর সব নিয়ে গেল...’
নদী।
ভাঙন।
চিৎকার।
আর তারপর— শূন্যতা।
ওয়াসিফ বুঝতে পারল— এ নারী শুধু একজন ভিক্ষুক নন, তিনি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের একটা জীবন্ত অংশ।
ওয়াসিফ প্রতিবেদনটি করল। ৩০ বছরের পুরনো গল্পটির কাটিংসহ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। কদিন ধরেই গুলেজানের শরীরটা ভালো নেই। ফুটপাতে বাটি হাতে দাঁড়ানোর সাধ্য নেই।
২.
একদিন বস্তিতে একটি গাড়ি এসে থামে। সেখান থেকে নেমে আসেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ। চোখে পানি, হাতে একটা পুরনো ছবি। তিনি গুলেজানের সামনে এসে দাঁড়ান।
‘আপনি...,’ তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘আপনি কি আমার মা?’ গুলেজান তাকিয়ে থাকেন। লোকটা ছবিটা বাড়িয়ে দেন— একজন তরুণী নারী, পাশে ছোট্ট একটা ছেলে।
গুলেজানের হাত কেঁপে ওঠে। ছবির দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ল। ‘রাশেদ...?’ তিনি খুব আস্তে বলে উঠলেন। মায়ের মুখে নিজের নামটি শুনে রাশেদের কান্নার দমক বেড়ে যায়। মেঘের গর্জনের মতো একটি শব্দ তিনি বারবার বলতে থাকেন— ‘মা!’ গুলেজান ছেলের মুখে হাত রাখেন, হাত কাঁপে যতটা তারও বেশি কেঁপে ওঠে মন। কিন্তু তার চোখে ভয়। ‘তুই... কোথায় ছিলি এতদিন?’
রাশেদ বললেন— ভাঙনের রাতে তিনি অন্যদের সহায়তায় জীবন বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু বহু চেষ্টাও আর মাকে খুঁজে পাননি তিনি। গ্রামের পর ছেড়ে শহর-নগর কোথায় খোঁজেননি তিনি! গুলেজান শুনতে শুনতে চুপ হয়ে গেলেন। তার চোখে পানি নেই, শুধু এক গভীর শূন্যতা। ‘তুই বড় হইছিস... ভালো আছিস বাবা’— তিনি বললেন। রাশেদ বললেন, ‘চলো মা, তোমাকে নিয়ে যাই।’ গুলেজান মাথা নাড়লেন, ‘না।’ ‘এই শহর... এই রাস্তা...,’ তিনি বললেন, ‘এখানেই তো আমি সব ভুলে গেছিলাম। আবার মনে পড়তেছে... সহ্য হয় না।’ তার গলায় কাঁপন। ‘আমি যদি সব মনে রাখি... আমি বাঁচব কীভাবে?’ সব ভুলে গিয়ে তো বেঁচে ছিলাম। আবার সব মনের মধ্যে ভিড় করলে বাঁচব কীভাবে? আমার সব স্মৃতি আমাকে মেরে ফেলবে।
গুলেজান আকাশের দিকে তাকান। তার বুক থেকে এক দীর্ঘ, গভীর হাহাকার বেরিয়ে আসে— যেন হারিয়ে যাওয়া নদীর শব্দ, ভাঙা ঘরের ক্রন্দন আর বছরের পর বছর জমে থাকা না কাঁদা কান্না একসাথে আকাশ ছুঁতে চায়। রাশেদ নামের মানুষটি হাওয়ায় মিলিয়ে যান। যেমন তিনি হাওয়া থেকেই এসেছিলেন। ভুলে যাওয়া জীবন এবং সেই জীবনের স্বজনরা তো এমনই! আপনার কী মনে হয়?




