ইঁদুরসংক্রান্ত ফাইল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইঁদুর সম্পর্কে একটা ফাইল এলো প্রতিষ্ঠানপ্রধানের টেবিলে। একটু অবাক হয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ফাইলটা একপাশে রেখে অন্যান্য ফাইল দেখতে শুরু করলেন। ফাইলগুলো দেখার পর দুপুরের দিকে এক গ্লাস পানি পান করলেন তিনি। একটু হাপিয়ে উঠেছেন। শিক্ষাসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিচিত্র ধরনের ফাইল আসে, তিনি দেখেন, সিদ্ধান্ত জানিয়ে মন্তব্য লেখেন। কিন্তু ইঁদুর যে ফাইলের বিষয় হতে পারে, তিনি এই ফাইল হাতে না পেলে বুঝতে পারতেন না। দুনিয়া কত অজানারে, তিনি মৃদু হেসে ফাইলটা খুলে বসলেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ কর্মী শফিক হাসান নোটটা দিয়েছেন। হাসান লিখেছেন, আমাদের বাঁধাই করা পুস্তকগুলো জমা করে রাখার জন্য দোতলায় একটি ছোট রুম আছে। রুমের মধ্যে অনেক ময়লা-আবর্জনাও জমেছে। কয়েক দিন আগে বিশেষ প্রয়োজনে রুমের দরজা খুলতেই একটি ইঁদুর আমার পায়ের নিচ দিয়ে দৌড়ে চলে যায়। প্রথমে ভয় পেলেও পরে বুঝতে পারলাম, ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু রুমের মধ্যে ঢুকে দেখি, সর্বনাশ! এরই মধ্যে অনেক বই খাবার বিবেচনা করে কেটে নষ্ট করেছে ইঁদুর মহাশয়রা। এমনকি কয়েকটি মূল্যবান বইয়ের ওপর বিষ্ঠা ত্যাগ করেছে। এ পরিস্থিতিতে ইঁদুর ধ্বংস করতে না পারলে সমূহ ক্ষতি হতে পারে। সুতরাং অতি তাড়াতাড়ি আমাকে কিছু পরিমাণ গাইম্যাক্সিন পাউডার দিলে আমি রুমের মধ্যে ছিটিয়ে দিতে পারি। ফলে, রুমের মধ্যে ইঁদুরের যাতায়াত কমতে ও মূল্যবান বইগুলো রক্ষা পেতে পারে।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান একটু বয়স্ক এবং বিদ্বান। তিনি খুব বিরক্ত হলেন। সামান্য ইঁদুর নিয়ে এত বড় নোট! তিনি আরেকবার পানি পান করে নোট লিখলেন— সামান্য ইঁদুর দেখে কেন ভয় পেলেন বুঝলাম না। ইঁদুর তো বাঘ নয়, যে আপনাকে খেয়ে ফেলবে! যাইহোক, গাইম্যাক্সিনের কথা লিখেছেন কিন্তু ওসব তো বিষ। নিঃশ্বাসে এই বিষ টেনে শরীরে ঢুকলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। ইঁদুর তাড়ানোর জন্য অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা আছে কি না, জানানোর নির্দেশ দেওয়া হলো। আর একটা বিষয়, ন্যায় ও সততার জন্য যা কিছু কেনা হবে, সবই টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার নির্দেশ দেওয়া হলো।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান নোট ছেড়ে দিলেন। হাসানের কাছে ফাইল এলে তিনি খুলে পড়ে খুবই ক্ষিপ্ত হলেন। কয়েকটা ইঁদুর মারা দরকার, আর কী সব...। অনেকক্ষণ থ মেরে বসে রইলেন তিনি। কিন্তু ইঁদুরতো মারা দরকার। নইলে মূল্যবান বইগুলো কেটে নষ্ট করবে অন্ধকারের ইঁদুররা। দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে তো!
তিনি ফাইলটা টেনে নিয়ে কয়েকবার নোটটা পড়লেন। পড়ার পর তিনি লিখলেন, গাইম্যাক্সিনের বিকল্প হিসেবে ইঁদুর মারার কল কেনা যায়। খুব কৌশলী এক প্রকার কল, কলের ভেতরে ইঁদুর খাদ্যের জন্য ঢুকলেই কলের দুই পাশের ধারালো মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইঁদুর দুইভাগ হয়ে যাবে। এ ধরনের তিনটি কল কেনার জন্য আদেশ দেওয়া যেতে পারে।
হঠাৎ অফিসপ্রধানের তলব ইঁদুরের ফাইলসহ। শফিক হাসান ইঁদুরের ফাইল নিয়ে প্রধানের কক্ষে গেলে তিনি গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে জানতে চাইলেন...
কয়েক দিন পর প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছ থেকে প্রতিনোট এলো— এই ধরনের নিষ্ঠুর যন্ত্র কেনা আমি সমর্থন করতে পারি না। খোলা কলের ওপর যদি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মীর পা আটকে যায় সেটা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন করবে। নানা ধরনের প্রশ্ন উঠবে। খুব তাড়াতাড়ি অন্য প্রস্তাব দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিচ্ছি।
শফিক হাসান কয়েক দিন আগে আবার পুস্তকের রুমটায় গিয়েছিলেন এবং দেখলেন পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ। কারণ, ইঁদুররা মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে বইয়ের কাগজগুলো খাদ্য হিসেবে আহার করছে। অনেকগুলো গর্ত বানিয়েছে। গর্তের ভেতর থেকে হাজার হাজার ক্ষুদ্র টুকরো কাগজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বইগুলো বুঝি রক্ষা করা হলো না! শফিক হাসান রুম থেকে বের হয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের রুমের দিকে যাচ্ছেন কিন্তু দোতলা থেকে নিচতলায় নামার সময়ে সিঁড়ির মুখে দেখা প্রধানের সঙ্গে। তিনি শরীর কাঠামোয় বেশ বলশালী। মাথার আধাপাকা লম্বা চুল ব্যাকব্রাশ করে পেছনের দিকে রেখেছেন। মাথার মধ্যেখানে সিঁথি।
স্যার? শফিক হাসানের ডাকে একটা সিঁড়ি নেমে তিনি দাঁড়ালেন, এখন কথা বলার টাইম নেই। আমাকে এখনই সচিবালয়ে যেতে হবে, মাটি বিক্রি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। আপনি আগামীকাল আমার সঙ্গে দেখা করুন।
প্রধান দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন সঙ্গে তিনজন পাইক বরকন্দাজ নিয়ে। অনাহুত অতিথির মতো শফিক হাসান দাঁড়িয়ে রইলেন সিঁড়ির মাথায়। জানেন, আগামী সপ্তাহে অফিসপ্রধান অফিসে আসবেন না। তিনি একটা সভায় যোগ দিতে চট্টগ্রাম যাবেন। চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পরদিন সরকারি ছুটি। ইঁদুরবিষয়ক ফাইলের সিদ্ধান্ত এখনো হলো না! ওদিকে ইঁদুররা বসে নেই।
বিমর্ষ মনে শফিক হাসান রুমে ফিরে গেলেন। ইঁদুরের ফাইল খুলে ভাবতে থাকলেন— সবটাই কি অফিসপ্রধানকে জানাতে হবে? তাও সামান্য ইঁদুর সম্পর্কে? এ অফিসের দেখভাল করার দায়িত্ব তো আমারও। আমি যদি বাইরে থেকে নিজের টাকায় ইঁদুরের ওষুধ এনে ছিটিয়ে দিই? ইঁদুররা মারা পড়ল, রুমের বইগুলো বাঁচল। কিন্তু আবার চিন্তা করলেন শফিক হাসান, অফিসপ্রধান বড় কড়া। তার আদেশ-নিষেধের একচুল নড়ানো যাবে না। নড়াতে গেলেই বিপদ...। তিনি ফাইলটা বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলেন রুমের মধ্যে নিজের চেয়ারে।
আট দিন পর পরিচালকের কাছে নতুন নোটে ফাইল যায়। সেই নোটে শফিক হাসান লেখেন— বাজারে ইঁদুর ধরবার এক ধরনের কাঠের বাক্স পাওয়া যায়। রাতে সেই বাক্সের মধ্যে খাবার রাখলে, খাবারের লোভে ইঁদুর বাক্সের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে খাঁচা থেকে বন্দি ইঁদুরটি বের করে মেরে ফেললেই কম্ম সাবাড়। ইঁদুরও মরল, বইগুলোও রক্ষা পেল। এখন জনাবের অনুমতির ওপর টোটাল পরিস্থিতি নির্ভরশীল।
হাসান শফিকের ছয় নম্বর নোটের পরিপ্রেক্ষিতে অফিসপ্রধান ভীষণ বিরক্ত হলেন। ইঁদুর মারতে রক্তারক্তি ঘটাতে হবে কেন? তিনি বুঝতেই পারছেন না ঘটনাটা! সামান্য ইঁদুর মারার বিষয়ে এতবার নোট চালাচালি করলে, অফিসের অন্যান্য কাজ কীভাবে চলবে? তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে নোটে লিখলেন— প্রস্তাবটি জটিল মনে হচ্ছে। ইঁদুরের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করা, খাদ্য বাক্সে রাখা, রাতের পরে দিনে বাক্সে আটকা পড়া [আদৌ যদি ধরা পড়ে] ইঁদুরটিকে ধরে হত্যা করার জন্য একজন পিয়ন নিযুক্ত করতে হবে। সেই পিয়ন যে আটকে পড়া ইঁদুর হত্যা করতে সক্ষম হবে, নিশ্চয়তা কোথায়? এমনিতেই অফিসে কর্মীর সংখ্যা কম। সুতরাং ইঁদুর মারতে কর্মী দেওয়া যাবে না। সব দিক বিবেচনা করে আপনি আরেকটি প্রস্তাব দিন, যাতে হত্যাকাণ্ড থাকবে না এবং ইঁদুর মারার জন্য নতুন করে কোনো কর্মী নিয়োগ দিতে হবে না। ফাইলটা পেয়ে অফিসপ্রধানের নোট পড়ে খুব ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন শফিক হাসান। নিয়ম শৃঙ্খলার নামে এত নোট চালাচালি হলে কাজ হবে কীভাবে? তিনি ফাইলটা ছুড়ে দিয়ে নিচে ফেলে চুপচাপ বসে রইলেন কিছুক্ষণ। ভাবনার মধ্যে মনে পড়ে শফিক হাসানের, মাস চারেক আগে পাশের রুমের মনজিল স্যার কোর্ট টানিয়ে রাখার জন্য দেয়ালে একটা বড় পেরেক ঠুকছিলেন। পেরেক ঠোকার শব্দ পেয়ে প্রধান রুমে আসেন এবং দেয়ালে পেরেক ঠোকা অবস্থায় হাতে হাতুড়িসমেত দেখেন মনজিল হোসেনকে। রুমে পৌঁছে প্রধান নোট দিয়ে মনজিল হোসেনকে তিন দিনের বেতন কেটে নিয়েছিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শফিক হাসান আবার ফাইলটা তুলে টেবিলের ওপর রাখেন।
কিন্তু শফিক হাসান ইঁদুর-সংক্রান্ত ফাইল আর ওপরে পাঠাননি। তিনি লোহার আলমারির মধ্যে অনেক ফাইলের মধ্যে যত্ন করে রেখে দিলেন। অফিসের অন্যান্য কাজের মধ্যে ডুবে যাওয়ায় তিনি দুই-তিন মাস আর ইঁদুরের ফাইল সম্পর্কে ভাবেননি। হঠাৎ অফিসপ্রধানের তলব ইঁদুরের ফাইলসহ। শফিক হাসান ইঁদুরের ফাইল নিয়ে প্রধানের কক্ষে গেলে তিনি গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে জানতে চাইলেন, ইঁদুর-সংক্রান্ত ফাইল আর আমার কাছে আসছে না কেন?
শফিক হাসান মৃদু হাসেন।
আমি হাসির কী বললাম? প্রধান একটু তেড়ে ওঠেন। হাসি প্রসারিত হয় শফিকের। স্যার, আর ওই ইঁদুরের ফাইলের ওপর নোট লেখার প্রয়োজন হবে না?
চেয়ারে হেলান দেওয়া আরামের শরীর দ্রুত টেনে সামনে এনে প্রশ্ন করেন— কেন প্রয়োজন হবে না? ইঁদুররা কি জায়গা ছেড়ে চলে গেছে?
না স্যার, ইঁদুরের উপদ্রব দূর করার জন্য যেসব নোট প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তার প্রয়োজন নেই। কেননা, এতদিনে গুদামঘরের সব পুস্তকই ইঁদুর খাইয়া ফেলিয়াছে!






