জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে মিউজিক্যাল চেয়ার

অঙ্কন : ফারজিন জামান
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় হুট করেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগমকে। চার মাসের মাথায় তাকে আবার পদে ফিরিয়ে এনেছে বিএনপি সরকার। এবার সরিয়ে দেওয়া হলো এ এইচ এম সাখাওয়াত উল্লাহকে, যিনি সাহিত্য অঙ্গনে কবি সাখাওয়াত টিপু নামে পরিচিত। আফসানাকে সরিয়ে দেওয়ার পর যেমন আলোচনার জন্ম হয়েছিল, এবারও প্রশ্ন উঠেছে— টিপুর দোষ কোথায়? তাকে কেন পরিচালক পদ ছাড়তে হলো? নিয়োগ ও নিয়োগ বাতিলের এই প্রক্রিয়াকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ এবং ‘নিয়ন্ত্রণ করার আমলাতান্ত্রিক খেলা’ বা ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো যে নীতিমালা অনুযায়ী চলার কথা, তা চলছে না অথবা চলতে দেওয়া হচ্ছে না। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার একটি কাঠামো তো নিশ্চয় আছে। এখানে কারা নিয়োগ পাবেন, কীভাবে পাবেন— তা নিয়েও নিশ্চয় নীতিমালা আছে। সেখানে হুট করে একজনকে নিয়োগ দেওয়া, আবার ইচ্ছা হলো তাকে বাদ দেওয়া— পুরো ব্যাপারটিই ‘স্বেচ্ছাচারিতা’। সাখাওয়াত টিপুকে বাদ দেওয়া হলো, তার দোষ কোথায়? এর আগে আফসানাকেও কেন বাদ দেওয়া হয়েছিল? জনমনে এ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সরকার থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কবি মিনার মনসুর। ২০১৯ সালে তিনি প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ফের পরিচালক হন এবং ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই আরও দুই বছরের জন্য তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেন মিনার মনসুর। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আফসানা বেগমকে গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে দায়িত্ব দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর বই নির্বাচন নীতিমালা সংশোধনে হাত দিয়েছিলেন। মন্ত্রণালয়ের অযাচিত হস্তক্ষেপ কমানো, মন্ত্রী-সচিবদের কোটা বাতিল করার মতো সিদ্ধান্তও নিচ্ছিলেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের তখনকার উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও সচিব মফিদুর রহমানের বিরাগভাজন হন। গত জানুয়ারিতে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই আফসানাকে অব্যাহতিপত্র দেওয়া হয়। তিনি যখন অব্যাহতির খবর জানেন, তখন তিনি গ্রন্থকেন্দ্রের ২৫ জন সহকর্মীকে নিয়ে চার দিনের কর্মশালায় ব্যস্ত ছিলেন কক্সবাজারে। পরদিন কর্মশালা স্থগিত রেখে ঢাকায় ফিরে আর গ্রন্থকেন্দ্রে যাননি। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, তাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিস না দিয়েই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
গ্রন্থকেন্দ্রের একাধিক কর্মী আগামীর সময়কে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে সাংবাদিক ও শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনকে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যেখানে গ্রন্থকেন্দ্রের নতুন কাজের পরিকল্পনা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন আফসানা। এ বিষয়ে সহকর্মীদের নিয়ে তিনি যখন প্রস্তুতি মিটিং করছিলেন, ঠিক তখন একজন সহকর্মীর কাছে জানতে পারেন— তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মীরাও বিষয়টি মানতে পারেননি, কেউ কেউ চোখের পানিও ফেলেছেন। আফসানা বেগমকে ফেরানোর জন্য মানববন্ধন করার পরিকল্পনাও করছিলেন তারা। তবে চাকরিজনিত সমস্যার কথা বিবেচনায় তারা নীরব থাকেন। এবার সাখাওয়াত টিপুকেও কি হুট করেই বাদ দেওয়া হয়েছে, টিপুর দোষ কোথায়? এ নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। সাহিত্য অঙ্গনে সাখাওয়াত টিপুর গ্রহণযোগ্যতা আছে। তার মতো একজন পরিচিত সাহিত্যিককে গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়ে চার মাসের মাথায় বাদ দেওয়া, সাখাওয়াত টিপুর জন্য অসম্মানজনক বলে মনে করছেন অনেকে। তবে টিপু এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।
মন্ত্রণালয় এবং গ্রন্থকেন্দ্র-সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, আফসানাকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারটি হুট করে হলেও সাখাওয়াত টিপুকে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যাপারটি হুট করে ঘটেনি। বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মীরা জানতে পারছিলেন, আফসানা বেগমকে ফেরানো হতে পারে। হলোও তা-ই। আফসানা তো ফিরলেন, তবে সাখাওয়াত টিপুকে কেন চেয়ার ছাড়তে হলো? তার কোনো ব্যাখ্যা জানা গেল না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা জানতে একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। একজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, আফসানা বেগম গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে যোগ্য ছিলেন, কিন্তু তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। তাই সিদ্ধান্তটি রিভিউ করে আফসানাকে ফেরানো হয়েছে। সাখাওয়াত টিপুকে অন্য কোনো দপ্তরে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারেও চিন্তা করা হচ্ছে বলে আভাস দিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মকে ফোন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ফোন রিসিভ করেননি।
পুনরায় দায়িত্বে যোগ দিয়ে আফসানা বেগম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত রোষের শিকার হয়ে আমাকে এখান থেকে চলে যেতে হয়েছিল। আমি এটা ভেবেই আবার এসেছি, পাঠকসমাজের জন্য আমি যে কাজগুলো করতে চেয়েছিলাম, সেই কাজগুলো আবার নতুন করে শুরু করতে পারব। আমার ফিরে আসাটা সার্থক হবে তখনই, যদি আমি সত্যিকার অর্থেই গঠনমূলক কাজ করতে পারি।’






