সিনেমা নয় এক আদি রিচুয়াল
- মেজবাউর রহমান সুমনের রইদ মুক্তি পেয়েছে ঈদুল আজহা উপলক্ষে। সিনেমাটির বিরুদ্ধেও দুর্বোধ্যতা আর উত্তীর্ণ শিল্প হয়ে ওঠার আলোচনা চলছে যুগপৎ। নানা মাধ্যমে আলোচনা সমালোচনার মুখে পড়েছে রইদ, হচ্ছে এর নানাদিক নিয়ে আলোচনা। চলচ্চিত্রটি দেখে তা নিয়ে লিখেছেন কবি ও কথাকার শরৎ চৌধুরী

ঘরগুলো পুড়ে ফানাফানা হওয়ার ঘটনাটা সেলুলয়েডের দৃশ্যে আটকে থাকেনি। দূরত্ব অতিক্রম করে পাল্টে দিয়েছে। যজ্ঞের আহুতি অতিক্রম করে যারা একবার চলে গেছে ওপারে, সেখান থেকে পুরনো মানুষ আর ফিরে আসে না। ব্যক্তিগত বিষাদের গভীরতর লাভার মতো ধিকি িধকি করতে থাকে। এর উত্তাপ মাংসের ভেতরে বসবাস করতে শুরু করে। এই সত্য আপনি কারও সঙ্গেই আর ভাগাভাগি করতে পারবেন না। আপনার শরীর খুলে খুলে পড়ে গেলেও তার নির্যাস থাকে। কেউ দেখে না, যদিও সে থাকে।যেন ফিরে এসেছে কোরআনের সেই অমোঘ বাণী— ‘আর আমি বললাম, তোমরা নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু হবে। পৃথিবীতে তোমাদের জন্য নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাসস্থান ও জীবনোপকরণ রয়েছে।’ (সূরা আল-বাকারা, ২:৩৬)
আর মহাকালের যাত্রায় দুনিয়ার মানুষ, আমরা এখনো শিখে চলেছি, ক্ষুধা; মাংসেরও অধিক, লালসা; তৃপ্তিরও অধিক। নারকীয় অনন্ত চক্রের এক শাশ্বত বিচ্ছেদ। কেননা যুক্ত থাকার বাসনা থেকে আমাদের কোনো মুক্তি নেই। কে পুরুষ, কেইবা নারী। দর্শন তো দেখা নয় কেবল, বসবাসও। পরিশুদ্ধির আত্মযজ্ঞের যে অসহনীয় বসবাস, তা নর-নারীর অনন্ত গল্পে ভূতের মতো হানা দেয়। যে ভূত আছে আমরা জানি। যে ভূত তাড়ানোর কোনো প্রতিকার আমাদের নেই, সেও জানি। বরং মন খুলতে থাকে যত, ততটাই আলোর অভাব এবং অস্পষ্টতার ভাব সংক্রামিত হতে থাকে নিঃশব্দে। আমরা সিনেমা হল থেকে দৃশ্য-শব্দের আড়ালে নিঃশব্দ অতিমারী অসুখ নিয়ে বের হই। এরপর যত ঘনিষ্ঠ হব, যতদূরে চলে যাব, ততই দহন। বাসায় ফিরব, কিন্তু ঘরে আর ফিরব না। মুখ থাকবে, কিন্তু মুখোশ খুলে পড়েছে; পরিচিত আয়নায় পরিচিত মুখ দেখে আর শান্তি আসবে না। এমনকি আমাদের শিশুটিকে কোলে নিলেও, আমাদের প্রিয়তম মানুষটি দেহান্তরি হলেও। কিংবা আগামী সহস্র বছর এক বিছানায় লিপ্ত থাকলেও আমাদের আর মুক্তি নেই। সুমন, আমাদের অভিশাপ দিয়েছেন বা অভিশাপের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। এই অভিশাপ থেকে আমাদের কারোরই মুক্তি নেই। রইদ— তাই একটি ধ্যান, আমাদের আদি বিচ্যুতির। আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাখ্যাহীন বৈকল্যের এক ঘোলা তেলতেলে শরীরী সাধনা। দান্তের ইনফার্নো। নফসের সীমারেখা। মানুষের সেই অভ্যন্তরীণ সত্তা, যা অধিকার করতে চায়, নিজের করতে চায়, ভোগ করতে চায়, নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— সে ভালোবাসতে জানে না, সে মালিক হতে চায়। সাধুর ট্র্যাজেডি শুধু প্রেমের নয়; নফসের ট্র্যাজেডি। সে পাগলিকে চায়। কিন্তু সে কি তাকে বুঝতে চায়? নাকি নিজের করে পেতে চায়? সুফি চিন্তায় নফসে আম্মারা মানুষকে কামনা, ক্রোধ ও অধিকারবোধের দিকে ঠেলে দেয়; নফসে লাওয়ামা আত্মসমালোচনার দিকে নিয়ে যায়; আর নফসে মুতমাইন্নাহ শেখায় ছেড়ে দিতে। আমার কাছে রইদ অনেকটা এই যাত্রার চলচ্চিত্র। শুরুতে অধিকার, তারপর হারানো, তারপর অনুসন্ধান, তারপর অপেক্ষা— এবং অবশেষে উপলব্ধি যে মানুষকে পাওয়া আর মানুষকে নিজের করা এক জিনিস নয়। পাগলি এখানে চরিত্র নয়, আয়না। সে বারবার সাধুর নফস— কামনা, ভয়, ঈর্ষা, একাকিত্ব ও মালিকানা বোধ— উন্মোচন করে। ফলে ছবিটি নারী-পুরুষের গল্পের বাইরে গিয়ে মানুষের নিজের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি হওয়ার গল্প হয়ে ওঠে। লালনের পদটি তাই রইদের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে হয়েছে—
“যেও না আন্দাজী পথে মন রসনা,
কুপথে কুপ্যাঁচে প’লে প্রাণে বাঁচবে না।”
এ যেন নফসের প্রতিই সতর্কবার্তা।
নৃবৈজ্ঞানিকভাবে রইদ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর liminality। নদী, চর, বৃষ্টি, তালগাছ, আধো-আলো— সব মিলিয়ে ছবিটি এক মধ্যবর্তী জগৎ নির্মাণ করে। চর যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি স্থায়ী নয় মানুষের পরিচয়, সম্পর্ক কিংবা আশ্রয়। চরিত্রগুলো সমাজ ও প্রকৃতি, বাস্তব ও মিথ, প্রেম ও বিচ্ছেদের মাঝখানে বাস করে। তারা যেন স্থায়ীভাবে একটি সীমান্তবর্তী অবস্থায় আটকে আছে। এ কারণেই ছবিটির আলো সচেতনভাবেই কম। এটি স্পষ্টতার নয়, আধো-দেখা ও আধো-বোঝার চলচ্চিত্র। আর এখানে এর স্পষ্টতাও। খুবই সহজ এক চলচ্চিত্র। চিরন্তন। অনেকে ছবিটিকে নারীবাদী বা anti-patriarchal বলে পড়ছেন। আমার মনে হয়, এটি তারও পরে। post-patriarchal কারণ ছবিটি পুরুষকে খলনায়ক বানায় না; বরং দেখায় যে পিতৃতন্ত্র পুরুষকেও বন্দি করে। সাধুও মুক্ত নয়। সে নিজেও বন্দি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, রইদ-এ কামনা শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৃষ্টি, রোদ, মৌমাছি, পশু, নদী, তাল— সবকিছু যেন একই শক্তির অংশ। Desire এখানে psychological নয়; ecological। এই দার্শনিক ভার বহন করতে গিয়ে চলচ্চিত্রটির অভিনয়, কস্টিউম, মেকআপ এবং প্রযুক্তিগত নির্মাণও অসাধারণ সংযমের পরিচয় দিয়েছে। নাজিফা তুষি নিজের তারকাসত্তাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছেন। ইমরানও একইভাবে চরিত্রের ভেতরে মিশে গেছেন। অভিনয় চোখে পড়ে না— শুধু মানুষটিকে দেখা যায়। কস্টিউম, চিত্রগ্রহণ ও শব্দ পরিকল্পনার সংযম ছবির জগৎকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। সংক্রামক করেছে। নদী, বৃষ্টি, মৌমাছি, পশু, বাতাস— সবকিছু চরিত্রগুলোর অপ্রকাশিত অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠেছে। এই গল্পের সবচয়ে শক্তিশালী ভর হলো কুলসুম। মানব-মানবীকেন্দ্রিক গল্প প্রজাতি হিসেবে আমাদের যুক্ত করে ঠিকই, কিন্তু উন্মোচন করে কুলসুম। আর সেটিকে বুঝতে আপনাকে হলে যেতে হবে। এ কারণেই ছবিটিকে আমি শুধু চলচ্চিত্র হিসেবে দেখি না। এটি একটি ritual। একটি rite of passage। সুমন ও তার টিম আমাদের জন্য একটি রিচুয়াল তৈরি করে গেছেন। আপনি ছবিটি দেখতে বসেন, ধীরে ধীরে পরিচিত বাস্তবতা খুলে যায়, আপনি এক liminal অঞ্চলে প্রবেশ করেন, তারপর ফিরে আসেন; কিন্তু আগের মানুষ হিসেবে আর ফিরে আসেন না। রইদ প্রেমের গল্প নয়।
রইদ রূপান্তরের গল্প। এই রিচুয়াল সিনেমা হলে শেষ হয় না; হল থেকে বের হওয়ার পর শুরু হয়। আর সেই রূপান্তরের পর বাসায় ফেরা যায়, কিন্তু ঘরে আর ফেরা যায় না।




