সুকুমার রায়
হাসির ভেতরে লুকিয়ে থাকা কিম্ভূতের গান

সুকুমার রায়
শুনতে পেলুম পোস্তা গিয়ে—
তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে?
গঙ্গারামকে পাত্র পেলে? জানতে চাও সে কেমন ছেলে?
মন্দ নয় সে, পাত্র ভালো—
রং যদিও বেজায় কালো,
তার ওপরে মুখের গঠন
অনেকটা ঠিক পেঁচার মতন।
বিদ্যে বুদ্ধি? বলছি মশাই
ধন্যি ছেলের অধ্যবসায়।
উনিশটিবার ম্যাট্রিক-এ সে
ঘায়েল হয়ে থামল শেষে।
বিষয় আশয়? গরিব বেজায়—
কষ্টে-সৃষ্টে দিন চলে যায়।
মানুষ তো নয় ভাইগুলো তার—
একটা পাগল একটা গোঁয়ার,
আরেকটি সে তৈরি ছেলে
জাল করে নোট গেছেন জেলে।
কনিষ্ঠটি তবলা বাজায়,
যাত্রাদলে পাঁচ টাকা পায়।
গঙ্গারাম তো কেবল ভোগে
পিলের জ্বর আর পান্ডু রোগে।
কিন্তু তারা উচ্চ ঘর—
কংস রাজের বংশধর।
শ্যাম লাহিড়ি, বনগ্রামের
কি যেন হয় গঙ্গারামের—
যাহোক, এবার পাত্র পেলে?
এমন কি আর মন্দ ছেলে?
‘সৎ পাত্র’ ছড়াটি পড়লেই বোঝা যায়, সুকুমার রায়ের হাসি কখনোই নির্বিকার হাসি নয়। এখানে ‘পাত্র ভালো’ বলে যে-সব ‘গুণ’ গোনা হচ্ছে, তার প্রতিটি আসলে এক-একটি দোষ—রং কালো, মুখ পেঁচার মতো, ম্যাট্রিকে উনিশবার ফেল, ভাইয়েরা পাগল-গোঁয়ার-জেলখাটা, নিজে পিলের জ্বরে আর পান্ডু রোগে ভোগা। কিন্তু শেষে “কিন্তু তারা উচ্চ ঘর— কংস রাজের বংশধর” বলে দিয়ে সুকুমার বাংলা সমাজের বিয়ে-ব্যবস্থার সমস্ত ভণ্ডামিকে এক নিঃশ্বাসে ধরে ফেলেছেন।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে ‘কংস রাজের বংশধর’ কথাটি আসলে এক বিরাট ঠাট্টা—কংস তো রাক্ষস-রাজা, কৃষ্ণের শত্রু; এমন ‘উচ্চ বংশ’ যার পূর্বপুরুষ কংস, সে-বংশের গুণকীর্তন করতে গিয়ে সুকুমার আসলে বংশগৌরবের সমস্ত ধারণাকেই হাস্যকর করে তুলেছেন। এই একটি ছড়াই প্রমাণ, সুকুমার কেবল ‘শিশুসাহিত্যিক’ নন—তিনি এমন এক লেখক, যাঁর হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে সমাজের সবচেয়ে নির্মম সত্য, যা নিয়ে বড়াই করা হয় তার প্রতি বিদ্রুপ আর সেই সত্যের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় সত্য বলে ফেলতে পারার এক অপার আনন্দ।
আর সেই আনন্দের সবচেয়ে খাঁটি উৎসটি লুকিয়ে আছে তাঁর ভাষা-নির্মাণ কৌশলের ভেতরে। ‘খিচুড়ি’ ছড়ায় তিনি নির্দ্বিধায় ঘোষণা করেন:
হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেলে ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না।”
ব্র্যাকেটের ভেতরের এই ‘ব্যাকরণ মানি না’ কথাটিই তাঁর ভাষাদর্শনের সারকথা। ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’, ‘হাতিমি’, ‘গিরগিটিয়া’, ‘বিংশাগল’—এইসব শঙ্কর প্রাণীরা কেবল মজার নয়; এগুলো ভাষার গঠনগত নিয়ম ভেঙে নতুন অর্থ তৈরির এক-একটি পরীক্ষা।
‘বক কহে কচ্ছপে— “বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।’
—এখানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রাণী মিলে এমন এক তৃতীয় প্রাণী তৈরি হয়েছে, যা অসম্ভব, কিন্তু পাঠকের মনে কোনো অস্বস্তি তৈরি করে না; বরং মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতার ভেতর দিয়েই সুকুমার আসলে সমাজের সেই জোরজবরদস্তিমূলক মিশ্রণগুলোকে চিহ্নিত করেন, যেখানে পরস্পরবিরোধী উপাদান জোড়া দেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২১ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যখন একটি বিরল মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কার করেন—যা একই সঙ্গে গ্রহাণু আবার ধূমকেতু—তখন আনন্দবাজার পত্রিকা রিপোর্টের শিরোনামেই লিখেছিল: “হাঁসজারু নাকি বকচ্ছপ? বিরলদর্শন মহাজাগতিক বস্তুর হদিশ মিলল পৃথিবীর কাছেই”।
সুকুমারের কল্পনা এতটাই শক্তিশালী যে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারকে বোঝানোর জন্যও তাঁর তৈরি শব্দই সবচেয়ে উপযুক্ত হয়ে ওঠে এমনকী সংবাদকক্ষেও। ‘কিম্ভূত’ ছড়ায় সেই বিদঘুটে জানোয়ার শেষে কেঁদে বলে—
“নই ঘোড়া, নই হাতি, নই সাপ বিচ্ছু,
মৌমাছি প্রজাপতি নই আমি কিচ্ছু।”
এই ‘কিছু না হওয়া’র আর্তি আসলে প্রতিটি মানুষেরই—আমরা কে, কী আমাদের পরিচয়, এই প্রশ্নেরই শিশুতোষ কিন্তু গভীর প্রকাশ আছে সুকুমারের সাহিত্য জুড়ে।
এইসব আনন্দের শেকড় খুঁজতে গেলে প্রথমে আমাদের ফিরতে হবে বাংলাদেশের এক গ্রামে। সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতায়, তবে তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে। রায় পরিবারের পূর্বপুরুষ রামসুন্দর দেব নদীয়ার চাকদহ থেকে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে শেরপুর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে মসূয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সুকুমারের প্রপিতামহ লোকনাথ রায় ছিলেন গণিতশাস্ত্র ও জরিপ কাজে পারদর্শী, আর পিতামহ কালীনাথ রায় সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষায় পাণ্ডিত্যের জন্য ‘মুনশী শ্যামসুন্দর’ নামে পরিচিত ছিলেন। মসূয়া গ্রামের পরিবেশ ছিল বিচিত্র— আম-জাম-কাঁঠালের বনে ছাওয়া, বড় বড় পুকুরে ভরা অঞ্চলের নিজস্ব আবহাওয়া, আর অন্য দিকে ঘন বন মিশে গিয়েছিল সে সময়ের বাংলাদেশ না হওয়া পশ্চিমবঙ্গের দিকে থেকে আসা সুন্দরবনের সঙ্গে। সুকুমারের পিতামহের আমলেও গ্রামের মধ্যে বড় বড় বাঘ ঘুরে বেড়াত, গরু-বাছুর, ছাগল, হাঁস, কুকুর ধরে নিয়ে যেত, এমনকি মানুষও। কিন্তু এই ভয়ংকর পরিবেশের বিপরীতে মাটি আর পানি ছিল অসাধারণ মিষ্টি—সুগন্ধি চাল, লাল গোল আলু, সোনালি সুমিষ্ট আনারসের খ্যাতি কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। লীলা মজুমদার তাঁর ‘সুকুমার’ বইয়ে মসূয়া গ্রামের এই ফল-ফসলের উপযোগী মিষ্টি মাটির কথা বলেছেন, যে মাটি জন্ম দিয়েছে অনেক মহৎ মানুষেরও। ১৮৯৮ সালে সুকুমারের বাবা আরেক শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী সপরিবারে মসূয়া ও ময়মনসিংহ যখন আসেন, তখন সুকুমারের বয়স ছিল মাত্র এগারো। এই গ্রামেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন, তারপর কলকাতার সিটি স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। মসূয়ার সেই মাটি, সেই গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি সুকুমারকে সারাজীবন এক ধরনের সরলতা ও মাটির কাছাকাছি থাকার বোধ দিয়েছিল—যে সরলতা তাঁর ‘পাগলা দাশু’-র হাসিতে, ‘কাঠবুড়ো’-র দাড়িমুখো বৃদ্ধে, আর ‘কাতুকুতু বুড়ো’-র রহস্যময় ভয়ে বারবার ফিরে ফিরে আসে।
কিন্তু সুকুমারের প্রকৃত শিক্ষা ও বিকাশ ঘটে কলকাতার ‘ব্রাহ্ম-সমাজ পাড়া’য়। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার এবং মুদ্রণপ্রযুক্তির উদ্ভাবক; মাতা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা। রায় পরিবারের সব সদস্যই কমবেশি সাহিত্যচর্চা করতেন—বোন সুখলতা রাও ও পুণ্যলতা চক্রবর্তী শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন, ভাই সুবিনয় ও সুবিমলও লেখালেখি করতেন। উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে ছিল নিবিড় পারিবারিক সম্পর্ক। এই বিজ্ঞানমনস্ক ও সাহিত্যরসলালিত পরিবেশেই সুকুমারের মন ও মনন গড়ে ওঠে। শৈশব কেটেছে মধ্য কলকাতার ‘ব্রাহ্ম-সমাজ পাড়া’য়, ১৩ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বিশাল বাড়িতে, যেখানে বাড়ির ভেতরেই ছিল শিবনাথ শাস্ত্রীর পরিকল্পনায় তৈরি হওয়া স্কুল। পুণ্যলতার স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়, ‘বাইরের অংশে আমাদের স্কুল হত, ভিতরের অংশের দোতলায় আমরা থাকতাম আর তিনতলায় আমাদের দাদামশাইরা থাকতেন।’
শৈশবেই সুকুমারের ভাষার প্রতি যে অসাধারণ খেলোয়াড়ি মনোভাব গড়ে ওঠে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ পারিবারিক ‘কবিতায় গল্প বলা’ খেলা। একদিন ‘বাঘ ও বক’-এর গল্প কবিতায় বলার পালা। সুকুমার বললেন, ‘বক সে চালাক অতি চিকিৎসক চুঞ্চু’—ভাইবোনেরা ভেবেছিল এটি অর্থহীন শব্দ, কিন্তু কাকার ব্যাখ্যায় জানা গেল ‘চুঞ্চু’ অর্থ ওস্তাদ। ভাষার এই খেলা—শব্দের ভেতরে লুকানো সম্ভাবনা খুঁজে বের করার খেলা—সুকুমার সারা জীবন খেলেছেন। আর এই খেলারই আরেক নাম ছিল ‘রাগ বানাই’—কারও উপর রাগ হলে শোধ নেওয়ার উপায় না থাকলে তিনি সেই লোকটার সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প বানিয়ে বলতেন, যার মধ্যে বিদ্বেষ থাকত না, থাকত কেবল মজা। সেই মজার মধ্যেই রাগ জল হয়ে যেত। এই শৈশবের অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে, সুকুমারের ননসেন্স কখনোই নিছক পলায়নপরতা নয়—এটি ছিল বাস্তব সমস্যার সঙ্গে মোকাবেলার এক সৃজনশীল কৌশল।
কলকাতার সিটি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করার পর সুকুমার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। কলেজজীবনেই তিনি ‘ননসেন্স ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার মুখপাত্র ছিল হাতে লেখা পত্রিকা ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’— ‘উহ্যনাম পণ্ডিত’ ছদ্মনামে সেটি কে চালাতেন তা আর বলাই বাহুল্য। বত্রিশ রকমের ভাজাভুজির উপরে আধখানা লঙ্কা বসানো—তাই ‘সাড়ে বত্রিশ’ ভাজা। ক্লাবের সভায় ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ’ পর্যন্ত সব বিষয় আলোচনা হতো, আর সেখানেই তাঁর ননসেন্স ছড়ার চর্চা শুরু। ১৯১১ সালে 'গুরুপ্রসন্ন ঘোষ বৃত্তি' নিয়ে তিনি মুদ্রণপ্রযুক্তি ও আলোকচিত্র নিয়ে পড়াশোনার জন্য বিলেতে যান। ম্যাঞ্চেস্টারের স্কুল অফ টেকনোলজিতে তিনি পিতার উদ্ভাবিত হাফটোন পদ্ধতি প্রদর্শন করে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেন। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি ‘East and West Society’-তে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন নিয়ে ‘Spirit of Rabindranath’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন, যা ‘The Quest’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ফেলো (FRPS) হন—এই সম্মান পাওয়া দ্বিতীয় ভারতীয় তিনি। ১৯১৩ সালে দেশে ফিরে তিনি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ এবং পিতার প্রতিষ্ঠিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার দায়িত্ব নেন। বিলেত থেকে ফেরার পর ‘মান্ডে ক্লাব’ নামে আরেকটি আসরও তিনি বসাতেন, যেখানে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অতুলপ্রসাদ সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষেরা আসতেন; কেউ কেউ সেই ক্লাবকে ‘মণ্ডা ক্লাব’ বলে ঠাট্টা করতেন। লীলা মজুমদার লিখেছেন, ‘একটা প্রবাদ আছে যে বা যারা সবচাইতে বেশি কাজ করে, তাদেরই হাতে বাড়তি ফালতু কাজ করার সবচাইতে বেশি সময়ও থাকে। এ-কথাটি যে কত সত্যি, সুকুমারের জীবনই তার প্রমাণ।’
পিতা উপেন্দ্রকিশোর ১৯১৫ সালে মারা যান। এরপর ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ পর্যন্ত আট বছর সুকুমার ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা করেন; শেষ আড়াই বছর তিনি রোগশয্যায় ছিলেন, তবু লেখা ও অলঙ্করণের কাজ চালিয়ে গেছেন। ‘সন্দেশ’ কেবল একটি শিশুপত্রিকা ছিল না—সুকুমারের সম্পাদনায় এটি হয়ে ওঠে এক পরিপূর্ণ পাঠক্ষেত্র, যেখানে প্রবন্ধ, বিশ্বের নানা খবর, উপকথা, ধাঁধা, নাটক, হেঁয়ালি—সবই একসঙ্গে থাকত। ‘সন্দেশ’-এর পাতাতেই ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়, আর ‘খিচুড়ি’ ছড়াটি প্রথম ছাপা হয় ১৩২১ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায়। সম্পাদক হিসেবে সুকুমার অন্য লেখকদের রচনা যথেষ্ট সংশোধন ও পরিমার্জন করতেন। মজার বিষয় হলো, সম্পাদনাকালে তিনি স্বনামে ‘সন্দেশ’-এ প্রায় কিছুই লেখেননি; মৃত্যুর ঠিক আগে ‘উহ্যনাম পণ্ডিত’ ছদ্মনামে তাঁর তিনটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘সন্দেশ’-এর তত্ত্বাবধায়কদের একজন সূজয় শোমের ভাষায়, ‘উপেন্দ্রকিশোরের “সন্দেশ” যদিও শিশুদের জন্য প্রকাশিত হতো, সুকুমার এর মান বাড়িয়ে এটিকে কিশোরদের পত্রিকা বানিয়ে দিলেন।’
আর এই সম্পাদনার ফাঁকেই জন্ম নেয় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিস্ময়কর বইটি। ‘আবোল তাবোল’ প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, সুকুমারের মৃত্যুর ঠিক নয় দিন পর। বইটির ভূমিকায় তিনি নিজেই লিখেছেন: ‘যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়ালরসের বই। সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে।’
এই একটি বাক্যেই তিনি পাঠককে বেছে নিয়ে ফেলেছেন—এ বই তাদের জন্য নয়, যারা রসিকতা বোঝে না। ‘আবোল তাবোল’-এর জগতে সবচেয়ে মজার চরিত্রটি সম্ভবত ‘বাঁদ্যবুড়ো’। সবকিছু উল্টোপাল্টা চললেও নিয়মে চলে শুধু সে-ই—সারাদিন না খেলে তার খিদে পায়, চোখ দিয়েই দেখে, কান দিয়েই শোনে। এই স্বাভাবিকতাই উল্টো জগতে অস্বাভাবিক। ‘কাতুকুতু বুড়ো’ ছড়ায় সতর্কবাণী: ‘আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার, / কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার!’
‘গোঁফচুরি’ ছড়ায় বড়বাবুর নিজের গোঁফ হারানোর অদ্ভুত অভিযোগ: ‘ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি!’—শেষে দেখা যায় ‘গোঁফের আমি, গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা’। ‘শব্দকল্পদ্রুম’-এ তিনি এমন এক গাছের কথা বলেন, যার ফুল ফোটার শব্দ পটকার মতো—‘ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম দ্রাম্, শুনে লাগে খটকা— / ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পট্কা!’
‘বাবুরাম সাপুড়ে’ ছড়ায় শিশু সাপুড়ের কাছে এমন এক সাপ চায়, যার কোনো বিষ নেই, হিংস্রতা নেই—‘যে সাপের চোখ নেই, শিং নেই, নখ নেই, / ছোটে না কি হাঁটে না, কাউকে যে কাটে না’—এই ছড়াটি আসলে মানুষের মেকি বীরত্ব ও ভয়ভীতি-নির্ভরতার প্রতি এক চমৎকার বিদ্রূপ। ‘ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না’ বলে মুগুর হাতে যে দাঁড়িয়ে থাকে, তার চেয়ে ভয়ানক আর কে হতে পারে? বুদ্ধদেব বসু ‘আবোল তাবোল’ সম্পর্কে লিখেছেন যে এতে ‘হাসির ছুতো করে, ছবি ও কৌতুকের সাহায্যে ভুলিয়ে এনে, শিশুদের এবং বয়স্কদেরও কয়েক ফোঁটা বিশুদ্ধ কাব্যরস অন্তঃস্থ করে দেওয়া হলো’।
সুকুমারের ননসেন্স কেবল হাস্যরসের জন্য নয়—এর ভেতরে রয়েছে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে সংবাদপত্রের সেন্সরশিপ এড়াতে সুকুমার তাঁর ননসেন্স ছড়াকে একটি ‘সাবভারসিভ’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে গবেষকরা মনে করেন। ‘আবোল তাবোল’-এর ছড়াগুলোকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা যায়। ‘আবোল তাবোল’-এর পদ্য থেকে গদ্যে এসে সুকুমার আরও সাহসী হন। ‘হ য ব র ল’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘সন্দেশ’-এ ১৯২২ সালে। গল্পের শুরুটাই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা শুরু: ‘বেজায় গরম। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে চুপচাপ শুয়ে আছি, তবু ঘেমে অস্থির। ঘাসের উপর রুমালটা ছিল, ঘাম মুছবার জন্য যেই সেটা তুলতে গিয়েছি অমনি রুমালটা বলল, “ম্যাও!”’
রুমাল বেড়াল হয়ে যায়, আর বেড়াল বলে: ‘চন্দ্রবিন্দুর চ, বেড়ালের তালব্য শ, রুমালের মা—হল চশমা। কেমন, হল তো?’ এখানে বাংলা বর্ণগুলো জীবন্ত চরিত্র— ‘হ’ থেকে ‘হিজিবিজবিজ’, ‘ব’ থেকে ‘বক’, ‘র’ থেকে ‘রাখাল’।
গল্পের শেষে সেই অবিস্মরণীয় মন্তব্য: ‘মানুষের বয়স হলে সে এমন হোঁৎকা হয়ে যায়, কিছুতেই কোনো কথা বিশ্বাস করতে চায় না’। এই বাক্যটিই ‘হ য ব র ল’-এর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন—কেন বড়রা এত ‘হোঁৎকা’ হয়ে যায়, কেন তারা কল্পনা ও ভাষার খেলার আনন্দ ভুলে যায়। সুকুমার এখানে শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে আসলে বড়দেরই জবাবদিহি চাইছেন। আর ‘পাগলা দাশু’-র দাশু? সে স্কুলপড়ুয়া, তার ‘পাগলামি’ খুবই হাস্যকর—কিন্তু সুকুমারের সৃষ্টির গভীরতা এখানেই যে দাশু আসলে খুব মেধাবী ছাত্র, বিশেষ করে অঙ্কে তার মাথা খুব ভালো। রবীন্দ্রনাথ নিজে ‘পাগলা দাশু’-র জন্য ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। ‘পাগলা দাশু’-র গল্পগুলো ‘আবোল তাবোল’-এর মতো আকাশ-উত্তটের কুয়াশায় আচ্ছন্ন নয়—বরং তা বাংলাদেশের শরৎকালের আকাশের মতো উজ্জ্বল আর প্রসন্ন।
সুকুমার ছিলেন প্রশিক্ষিত রসায়নবিদ, আর তাঁর প্রবন্ধে সেই বৈজ্ঞানিক মননের ছাপ স্পষ্ট। ‘ভাষার অত্যাচার’ (১৯১৫) প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন: ‘মানুষে প্রশ্ন করে, “তুমি জাতীয়তা জিনিসটা বিশ্বাস কর কিনা” “তুমি হিন্দুত্বকে মানো কিনা” আর সঙ্গে-সঙ্গে একটা হাঁ-না গোছের জবাব প্রত্যাশা করে।’ প্রশ্নের এই হ্যাঁ-না গোছের নিশ্চিত উত্তর প্রত্যাশাকে তিনি ‘অত্যাচার’ বলেছেন। তিনি আরও লিখেছিলেন: “ভাষা যে নিজের অর্থগৌরবেই সত্য, একথা ভুলিয়া সে যখন কেবলমাত্র শব্দগৌরবে বড় হইতে চায়, তাহার অত্যাচার অনিবার্য।”
‘বর্ণমালাতত্ত্ব’ প্রবন্ধে বাংলা বর্ণমালার উৎস ও ধ্বনিগত গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন সুকুমার। ‘আকাশবাণীর দল’-এ বেতার তরঙ্গের বিজ্ঞান সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর নাটক ‘ঝালাপালা’-য় পণ্ডিতমশায় ‘আই গো আপ ইউ গো ডাউন’ বাক্যটির ‘আই’ শব্দটিকে বাংলা ‘চক্ষু’ বলে অনুবাদ করেন, আর ‘গো’ মানে ‘গরু’, ‘আপ’ মানে ‘জল’—এই ধরনের ভুল অনুবাদে সুকুমারের দ্বিভাষিক রসবোধের পরিচয় মেলে।
‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নাটকে রামায়ণের মহাকাব্যিক জগৎকে তিনি টেনে এনেছেন আধুনিক কালের পুঁইশাক চচ্চড়ি, হোমিওপ্যাথি ও ব্যায়ামবীর স্যান্ডোর জগতে। ‘অবাক জলপান’ নাটিকায় ফিরিওয়ালাদের ফেনি-কাবাব, ডালমুট ইত্যাদির প্রসঙ্গে হাস্যরস তৈরি হয়েছে— যা তখনকার কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। ‘চলচ্চিত্তচঞ্চরী’ তাঁর আরেকটি নাটক, যেখানে হাস্যরসের সঙ্গে সমাজচেতনার মিশ্রণ ঘটেছে। ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ সুকুমারের আরেক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে এক অদ্ভুত চরিত্রের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ হয় হাস্যরসের ঢঙে। ‘খাই-খাই’ পদ্যে লেখা হলেও আসলে খাদ্য ও মানুষের লোভ নিয়ে এক তীক্ষ্ণ রসভাষ্য সেটি।
সুকুমার ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপন্থী গোষ্ঠির এক তরুণ নেতা। ‘অতীতের কথা’ কাব্যে ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস সরল ভাষায় উপস্থাপন করেন—ছোটদের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজের মতাদর্শ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এটি কাব্যটি পুস্তিকার আকারে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজের সভাপতিত্বের প্রস্তাবের পৃষ্ঠপোষকতাও সুকুমার করেছিলেন। আর এইসব কিছু সত্ত্বেও সুকুমারের ব্যক্তিগত জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। ১৯২১ সালের ২ মে পুত্র সত্যজিৎ রায়ের জন্ম। সেই বছরেই সুকুমার কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। ১৯২৩ সালের ২৯ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থ সুকুমারকে দেখতে যান, কেউ কেউ বলেন সেদিন সুকুমারকে নয়টি রবীন্দ্রসংগীত শোনান, কিন্তু কিছুদিন পরেই—১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩—মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ‘আবোল তাবোল’ ছাপা হয়ে বেরোনোর নয় দিন আগে তাঁর মৃত্যু ঘটে; শয্যাশায়ী অবস্থাতেই তিনি তিনরঙা মলাট, ছড়া আর টেলিপিসের ছবি—সব নিজে করে গিয়েছিলেন। সুকুমারের মৃত্যুকালে সত্যজিতের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর।
সুকুমারের প্রভাব তাঁর নিজের রচনার গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। তাঁর পুত্র সত্যজিৎ রায় ১৯৮৭ সালে, সুকুমারের জন্মশতবর্ষে, বাবার উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন—যা ছিল তাঁর শেষ প্রামাণ্যচিত্র। ৩০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে সুকুমারের জীবন ও কর্মকে চিত্র, আলোকচিত্র এবং তাঁর লেখার পাঠের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় (ইউটিউবে পাওয়া যায়)। সত্যজিৎ তাঁর বাবার সম্পর্কে সরাসরি স্মৃতি বলতে কিছু পাননি, কারণ বাবার মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র দুই বছর—তিনি বাবাকে চিনেছিলেন তাঁর লেখা আর আঁকা থেকেই। সত্যজিৎও পিতার মতো অলঙ্করণে সিদ্ধহস্ত ছিলেন এবং ‘ফেলুদা’ ও ‘প্রফেসর শঙ্কু’ সিরিজের প্রায় সব বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই করেছিলেন। এই উত্তরাধিকার সুকুমারের কাছ থেকেই প্রাপ্ত। সুকুমারের প্রভাব বাংলা শিশুসাহিত্যের পরবর্তী ধারাতেও ব্যাপক। ‘আবোল তাবোল’ প্রকাশের পর থেকে যাঁরা শিশুসাহিত্যে এসেছেন, তাঁদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যে সুকুমারই তাঁদের পথ দেখিয়েছেন।
বুদ্ধদেব বসু তাঁর আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলনে সুকুমারের কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে সুকুমারের ছড়াকে কেবল ‘ছড়া’ বলে অবহেলা করার সুযোগ নেই—সেগুলো কবিতা-পদবাচ্যও। জীবনানন্দ দাশ সুকুমারের মৃত্যুর প্রায় ২০ বছর পর ‘আবোল তাবোল’-এর প্রকাশক দিলীপকুমার গুপ্তকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আবোল তাবোল বিশেষ কোনো সময়ের সৃষ্টি হয়েও সময়োত্তীর্ণ।’আরও লিখেছিলেন, ‘সুকুমার রায়ের পৃথিবী “আবোল তাবোল”-এ যা সত্য হয়ে ফুটে উঠেছে তা মোটেই আমাদের চেনাজানা পৃথিবী কিংবা তার প্রতিচ্ছবির মতো বাস্তব না হয়েও তেমনই পরিচিত ও তেমনই সত্য।’
কবীর সুমন গেয়েছেন, ‘আমার সমাধি হবে অমোঘ চিতায়/ তখন আগুন হয়্যো সুকুমার রায়’— এই পঙক্তি শুধু এক শিল্পীর প্রতি আর এক শিল্পীর নিবেদন নয়, সমকালই বারবার ফিরে যায় সুকুমারের কাছে। আর রবীন্দ্রনাথের সেই কথাটি তো আছেই সুকুমারকে নিয়ে— ‘তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল।’
শতবর্ষ পরেও কেন সুকুমার প্রাসঙ্গিক? ১৯২২-এর সেপ্টেম্বরে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা লেখার জন্য গ্রেপ্তার হন কাজী নজরুল ইসলাম। এই ঘটনাটুকু মনে রাখলেই বড্ড চেনা চেনা ঠেকে সুকুমারের ‘একুশে আইন’— ‘ এবং যারা পদ্য লেখে, তাদের ধরে খাঁচায় রাখে’। লাল কাপড় বেঁধে মাথায় ষাঁড়ের সামনে দাঁড়িয়ে যে কেতাবে খোঁজে পাগলা ষাঁড়ের হাত থেকে বাঁচার উপায়, তার যে বাঁচার উপায় নেই সে তো সুকুমারই দেখিয়ে দিয়েছেন। এখনকার পাগলা ষাঁড় গুগলে যেমন পাবে না অনুভব, অনুভূতির সব প্রশ্নের উত্তর। সুকুমার একে বলেছিলেন ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’ অবস্থা। বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। এসব শব্দ—হাঁসজারু, বকচ্ছপ—আজ বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক অভিধানে ঢুকে গেছে। নৈতিকতা, স্বতঃস্ফূর্ত প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে গিয়ে জোর করে কিছু চাপিয়ে, জুড়ে দেওয়াটাকে লোকে এখনো হাঁসজারুই বলে।
কিন্তু সুকুমারের সবচেয়ে বড় অবদান বাঙালির মানস গঠনে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি শিশুরা সুকুমারের ছড়া দিয়েই বাংলা পড়া শুরু করে। ‘আবোল তাবোল’ আজও বেস্টসেলার। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার চেয়েও গভীর কিছু আছে—সুকুমার বাঙালি শিশুকে শিখিয়েছেন প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে, এবং জীবনের বেদনার মুখোমুখি হয়েও হাসতে। ‘সৎ পাত্র’-এর সেই গঙ্গারামের ‘উচ্চ ঘর’-এর ভণ্ডামি যখন তিনি উন্মোচন করেন, তখন তিনি শিশুকে শেখান যে সমাজের সব ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’ই হাস্যকর হতে পারে। ‘হ য ব র ল’-এর শেষে ‘মানুষের বয়স হলে সে এমন হোঁৎকা হয়ে যায়’ বলে তিনি শিশুকে সতর্ক করেন বড়দের সেই ‘হোঁৎকা’ হওয়ার বিরুদ্ধে। এই শিক্ষা—প্রশ্ন করার শিক্ষা, হাসতে শেখার শিক্ষা, এবং হাসির ভেতর দিয়ে সত্য দেখার শিক্ষা—সুকুমারের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
সুকুমার রায়ের সাহিত্যে যে আনন্দ পাওয়া যায়, তা বহুত্বপূর্ণ এবং স্তরবিন্যস্ত। প্রথম স্তরে আছে ভাষার আনন্দ—শব্দের ধ্বনি, ছন্দের দোলা, আর ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’-এর মতো নতুন শব্দ তৈরি করার অবাধ স্বাধীনতা। দ্বিতীয় স্তরে আছে হাসির আনন্দ—‘সৎ পাত্র’-এর গঙ্গারামের পেঁচার মতো মুখ, ‘কাঠবুড়ো’-র দাড়িমুখো বৃদ্ধ, ‘গোঁফচুরি’-র বড়বাবুর অদ্ভুত অভিযোগ। তৃতীয় স্তরে আছে বুদ্ধির আনন্দ—যখন পাঠক বুঝতে পারেন ‘সৎ পাত্র’-এর প্রতিটি ‘গুণ’ আসলে একটি দোষ, বা টের পান ‘পাগলা দাশু’ আসলে অঙ্কে সবার সেরা। চতুর্থ স্তরে আছে মুক্তির আনন্দ—সুকুমারের ননসেন্স জগতে নিয়ম ভাঙার যে স্বাধীনতা আছে, তা পাঠককে তাঁর নিজের নিয়ম-বাঁধা জীবনের জগৎ থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেয়। এবং সর্বোপরি, আছে সেই গভীর আনন্দ যা রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করেছেন—‘তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল।’ সুকুমার-পাঠের আনন্দ তাই কেবল হাসির আনন্দ নয়—এটি যুক্তি, কল্পনা, ভাষা এবং মুক্তির সম্মিলিত আনন্দ, যা মসূয়া গ্রামের সেই শিকড় থেকে উঠে আসা এক নির্মল হাসির সঙ্গে শহুরে যুক্তিবাদের মিশ্রণে তৈরি।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি শিশুরা সুকুমারের ছড়া দিয়েই বাংলা পড়া শুরু করে, আর সেই শিশু বড় হয়ে যখন ‘সৎ পাত্র’-এর গঙ্গারামের মুখোমুখি হয়, বা ‘পাগলা দাশু’-র অঙ্কের খাতার দিকে তাকায়, তখন সে বুঝতে পারে যে সুকুমার তাকে শুধু পড়তে শেখাননি—তাকে শিখিয়েছেন প্রশ্ন করতে, হাসতে, এবং সত্যকে চিনতে। শতবর্ষ পরেও ‘আবোল তাবোল’ তাই আজ সময়োত্তীর্ণ—কারণ যে হাসি সমাজের ভণ্ডামিকে চেনায়, যে হাসি সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়, সে হাসি কখনো পুরোনো হয় না।
মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরের একটি জীবন—তার মধ্যে একটি সন্তানই শুধু নয়, একটি সম্পূর্ণ সাহিত্যধারা, একটি জাতির শৈশবের ভাষা, এবং এমন এক উত্তরাধিকার যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে আজও বাঙালির মনন গড়ে তুলছে। সুকুমার রায় কেবল সত্যজিৎ রায়ের পিতা কিংবা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর পুত্র নন—তিনি বাংলা ভাষার সেই বিরল প্রতিভা, যিনি হাসির ভেতর দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে যুক্তি দিয়ে, প্রশ্ন করে, এবং কখনো কখনো নিছক উদ্ভট কল্পনার সাহায্যে মানুষের অবস্থানকে প্রশ্ন করা যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়। তাঁর ‘আবোল তাবোল’ আজও পাঠককে হাসায়, তাঁর ‘হ য ব র ল’ আজও পাঠককে অবাক করে, তাঁর ‘সৎ পাত্র’ আজও সমাজের আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি চলে গেছেন এক শতাব্দী আগে, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো—হাঁসজারু, বকচ্ছপ, কিম্ভূত, কাতুকুতু বুড়ো, পাগলা দাশু—আজও বাংলা ভাষার জীবন্ত সম্পদ। এই সম্পদ কেবল সাহিত্যের নয়, এটি বাঙালির শৈশবের, বাঙালির হাসির, এবং বাঙালির যুক্তিবাদী মননের সম্পদ। আর এজন্যই সুকুমার রায় আজও প্রাসঙ্গিক—এবং আগামী বহু শতাব্দী ধরেও প্রাসঙ্গিক থাকবেন, তা বাজী ধরেই বলা যায়।
তথ্যসূত্র
১. “Rare Hybrid of Comet And Asteroid: হাঁসজারু নাকি বকচ্ছপ? বিরলদর্শন মহাজাগতিক বস্তুর হদিশ মিলল পৃথিবীর কাছেই।” *আনন্দবাজার পত্রিকা*, ২০২১, https://www.anandabazar.com/amp/science/super-rare-hybrid-of-comet-and-asteroid-discovered-dgtl/cid/1307428।
২. “প্রাণীকুল, তারাও আছেন।” *The Business Standard (বাংলা)*, ২০২০, https://www.tbsnews.net/bangla/ইজেল/প্রাণীকুল-তারাও-আছেন।
৩. “খেয়াল রসের বুদ্ধিদীপ্ত কলমকার।” *উত্তরবঙ্গ সংবাদ*, ২০২৫, https://uttarbangasambad.com/a-brilliant-writer-of-imaginative-ideas/।
৪. *Full text of ‘Sukumar Ray Shilpa O Sahitya’*, Internet Archive, https://archive.org/stream/in.ernet.dli.2015.303165/2015.303165.Sukumar-Ray_djvu.txt।
৫. Mukherjee, Ashmita. “To Laugh or Not to Laugh: An Analysis of Humor in Sukumar Ray’s Abol Tabol.” *South Asian Review*, vol. 43, no. 3-4, 2022, pp. 281-294.
৬. “ছেলে সত্যজিতের চোখে বাবা সুকুমার।” *এনটিভি বাংলা*, ৩১ অক্টোবর ২০১৫, https://www.ntvbd.com/arts-and-literature/26050।
৭. সালাহ্উদ্দিন, শিমুল। “নটআউট ১০০।” *দেশ রূপান্তর*, ২১ অক্টোবর ২০২৩, https://www.deshrupantor.com/461520।







