মিথ্যার ভিড়ে আজও প্রয়োজন এক সত্যান্বেষীর

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
একটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ঘরে বেশ কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। প্রত্যেকের বক্তব্য আলাদা। কারও চোখে ভয়, কারও মুখে স্বাভাবিকতার অভিনয়। পুলিশের হাতে কিছু তথ্যও আছে বটে কিন্তু সেই তথ্যের মধ্যে সত্য কোথায় তা স্পষ্ট নয়। ব্যোমকেশ ঘটনাস্থলে এসে প্রথমেই কাউকে আসামি করেন না। তিনি তাকিয়ে দেখেন। কথা শোনেন। প্রশ্ন করেন। তারপর একটি ছোট অসংগতি ধরে ফেলেন। সেখান থেকেই খুলতে থাকেন রহস্যের দরজা। এই জায়গাটিতেই ব্যোমকেশ একদম অন্য রকম। তিনি শুধু অপরাধী খোঁজেন না, খোঁজেন সত্য। তাই নিজের পরিচয়ও দিয়েছেন সত্যান্বেষী। শব্দটি মধ্যেই লুকিয়ে আছে চরিত্রটির পুরো দর্শন।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট ব্যোমকেশ বক্সী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র। স্কুলজীবনে ব্যোমকেশের সঙ্গে আমার পরিচয়। গুরুদেব তাহের-উজ-জামান এবং প্রিয় শিক্ষক বিশ্বতোষ রায় স্যারের কাছ থেকে ব্যোমকেশসহ আরও অনেক গোয়েন্দা চরিত্রের বই পেয়েছিলাম। সেই থেকে আজ অবধি তার নেশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মাসুদ ভাই যখন লেখার উৎসাহ দিলেন তখন সেই নেশা আরও বেড়ে যায়। কলকাতা শহর আগের চেয়ে বদলে গেছে, বদলে গেছে সেখানকার সমাজ, প্রযুক্তি, মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু ব্যোমকেশের জনপ্রিয়তা মোটেও কমেনি বরং অনেকাংশেই বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম তার গল্প পড়ছেন। তার কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র-সিরিজ তৈরি হচ্ছে। একটি পুরোনো চরিত্রের এই দীর্ঘ জীবন নিছক জনপ্রিয়তার ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে প্রাসঙ্গিকতার শক্তি। মানুষের মধ্যে লোভ এখনো আছে। ঈর্ষা আছে। প্রতারণা আছে। অর্থের জন্য সম্পর্ক বিসর্জনের প্রবণতাও আছে। প্রেম আছে, আবার সেই প্রেম থেকেই জন্ম নেওয়া অপরাধও আছে। সামাজিক সম্মান রক্ষার্থে সত্য গোপন করার প্রবণতা আছে। প্রযুক্তি যেমন বদলেছে তার সঙ্গে অপরাধের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু অপরাধের মূল উপাদান মানুষের দুর্বলতা আজও একই রকম আছে। এই কারণেই ব্যোমকেশের গল্প কখনো পুরোনো হয় না।
গোয়েন্দা সাহিত্যের একটি সহজ সূত্র আছে অপরাধের ঘটনা ঘটবে, কিছু সূত্র থাকবে, পাঠক অনুমান করবেন, শেষে গোয়েন্দা এসে রহস্যের সমাধান করবেন। ব্যোমকেশ এই কাঠামোর ভেতরেই কাজ করেন। কিন্তু তাকে অতিক্রমও করেন। ‘চিড়িয়াখানা'য় যেমন অপরাধের সঙ্গে মানুষের পরিচয় ও মুখোশের প্রশ্ন জড়িয়ে যায়, ‘আদিম রিপু’তে মানুষের গভীর প্রবৃত্তি সামনে আসে, ‘দুর্গরহস্য’ বা ‘রক্তমুখী নীলা’র মতো কাহিনিতে রহস্যের পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের নানা স্তরও উন্মোচিত হয়। ব্যোমকেশের কাহিনিতে অপরাধ কখনো একা দাঁড়িয়ে থাকে না। তার চারপাশে থাকে সম্পর্ক, অর্থ, সামাজিক অবস্থান, কামনা, বাসনা, লোভ, মোহ, ভয় ও গোপন ইতিহাস। এই মানবিক জটিলতাই ব্যোমকেশকে নিছক ‘ডিটেকটিভ’হতে দেয় না। তিনি অপরাধীকে খুঁজে বের করেন, কিন্তু তার আগে খুঁজে বের করেন অপরাধের কারণ। কখনো অপরাধীর প্রতি তার কঠোরতা আছে, কখনো আছে সহানুভূতি। কিন্তু সত্য গোপন করার পক্ষপাত নন তিনি। এখানেই তার নৈতিক শক্তি।
ব্যোমকেশের হাতে বন্দুক থাকলেও তার প্রকৃত অস্ত্র যুক্তি। তিনি অনুভূতি দিয়ে কোনো রহস্যের সমাধান করেন না। তিনি তথ্য জড়ো করেন, তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজেন, অসঙ্গতি শনাক্ত করেন এবং তারপর সিদ্ধান্তে পৌঁছান। একটি ছোট্ট কথা। একটি অস্বাভাবিক আচরণ। সময়ের হিসাব। একটি ভুল বলা তথ্য। অন্যরা যেখানে এসব পাশ কাটিয়ে যায়, ব্যোমকেশ সেখানেই চোখ মেলে থামেন। এই অভ্যাসটির গুরুত্ব আজকের সময়ে বুঝতে হলে আমাদের চারপাশের তথ্যজগতের দিকে তাকালেই হয়।
আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে তথ্যের অভাব নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর ছড়িয়ে পড়তে মিনিট কয়েক সময় লাগে। ছবি, ভিডিও, অডিও সবই এখন মুহূর্তে মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। কিন্তু একটি তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেই তা সত্য হয়ে যায় না। বরং উল্টোটা হয়। গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অর্ধসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা অনেক সময় সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়। এখানে ব্যোমকেশের কাছ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি হতে পারে সন্দেহ করো, কিন্তু অকারণে নয়। প্রমাণের জন্য প্রশ্ন করো। যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছাও। ব্যোমকেশের এই মানসিকতা আজ শুধু সাহিত্যিক আনন্দের বিষয় নয়। এটি নাগরিক বোধেরও অংশ হতে পারে।
ব্যোমকেশকে বোঝার জন্য অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনে রাখা জরুরি। অজিত শুধু বন্ধু নন আমি মনে করি তিনি পাঠকের চোখ। ব্যোমকেশ যে কথাটি এক মুহূর্তে বুঝে ফেলেন, অজিত অনেক সময় সেটি বুঝতে সময় নেন। ব্যোমকেশ যে প্রশ্নটি করেন, অজিত অনেক সময় সেটিই পাঠকের হয়ে করেন। ফলে পাঠক ব্যোমকেশকে দূরের কোনো অতিমানব হিসেবে দেখেন না। অজিতের চোখ দিয়ে ধীরে ধীরে তার মেধাকে আবিষ্কার করেন। এই সম্পর্ক ব্যোমকেশকে মানবিক করে। তারপর আসে সত্যবতী। আসে তাদের সন্তান খোকা। ব্যোমকেশের জীবনে সংসার আসে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আসে। তিনি শুধু রহস্যের ভেতর বসবাসকারী একজন যুক্তিবাদী মানুষ নন। তারও আছে ব্যক্তিগত জীবন। এখানে শরদিন্দুর আরেকটি বড় সাফল্য। তিনি তার গোয়েন্দাকে এমনভাবে নির্মাণ করেননি যেন পৃথিবীর অন্য সবকিছু তার কাছে অপ্রয়োজনীয়। ব্যোমকেশের মানবিক পরিচয় তার গোয়েন্দা পরিচয়ের সঙ্গে পাশাপাশি চলে। বাঙালির গোয়েন্দা, কিন্তু শুধু বাঙালির নন ব্যোমকেশের আকর্ষণ তার বাঙালিত্ব। তিনি কোনো বিদেশি শহরের অচেনা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়েন্দা নন। তার রহস্যের পটভূমি আমাদের চেনা। কলকাতার বাড়ি, গলি, ট্রাম, মধ্যবিত্তের সংসার, মফস্বল, জমিদারবাড়ি, ব্যবসায়ী পরিবার সবই তার বাস্তব জগতের অংশ। ফলে তার গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক শুধু রহস্যের মধ্যে ঢোকেন না, ঢুকে পড়েন নিজের সমাজের মধ্যেও।
শরদিন্দু তার সময়ের বাঙালি সমাজকে খুব স্বাভাবিকভাবে কাহিনির ভেতর এনেছেন। কোথাও তা সরাসরি সামাজিক ভাষ্য, কোথাও নিছক পটভূমি হিসেবে। কিন্তু সমাজটি সর্বত্র উপস্থিত। ব্যোমকেশ সেই সমাজের ভেতরেই সত্য খোঁজেন। এই কারণেই তার বাঙালিত্ব কখনো তার সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়নি। স্থানীয় বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন সর্বজনীন। মানুষের ভয়, লোভ, প্রেম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাসঘাতকতা এসব কোনো একটি জাতি বা সময়ের সম্পত্তি নয়। এটি বহমান নদীর মতো আজও বয়ে চলেছে। প্রতিটি সমাজেই এই চিত্র দেখা যায়। প্রয়োজন শুধু চোখ মেলে দেখা।
ব্যোমকেশের গল্পে খলনায়ক আছে। চতুর অপরাধী আছে। কখনো আছে পরিকল্পিত হত্যা, কখনো প্রতারণা, কখনো ষড়যন্ত্র। কিন্তু সব কাহিনি মিলিয়ে দেখলে তার প্রকৃত প্রতিপক্ষ যেন একজন মানুষ নয়। সেটি হলো মিথ্যা। একজন মিথ্যাবাদী মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে। একজন অপরাধী নির্দোষের মতো আচরণ করতে পারে। একটি সাজানো ঘটনা সত্য বলে মনে হতে পারে। ব্যোমকেশের কাজ তাই শুধু ‘কে করেছে’ জানা নয় যা দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে কি আছে, সেটি খুঁজে বের করা। এই অনুসন্ধানই তাকে আজকের পৃথিবীর সঙ্গে আশ্চর্যভাবে যুক্ত করে। আজ আমরা ছবি দেখি, ভিডিও দেখি, পোস্ট পড়ি, শিরোনাম দেখি। অনেক সময় পুরো ঘটনা না জেনেই মতামত দিয়ে ফেলি। একটি পক্ষের কথা শুনেই অন্য পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করি। ব্যোমকেশ হলে হয়তো একটু থামতেন। আর প্রশ্ন করতেন ‘তারপর?’
অনেক জনপ্রিয় সাহিত্যিক চরিত্র সময়ের সঙ্গে জাদুঘরের বস্তুতে পরিণত হয়। ব্যোমকেশ তা হয়নি। তার মূল শক্তি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে বাঁধা নয়। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রশ্ন করেন। অপেক্ষা করেন। যুক্তি দিয়ে বিচার করেন। এগুলো কোনো যুগের পুরোনো পদ্ধতি নয়। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহ ও ডিজিটাল প্রতারণার যুগে এগুলোর প্রয়োজন আরও বেড়েছে। আমাদের চোখের সামনে থাকা জিনিস সত্য নাও হতে পারে। আজকাল শব্দ নকল করা যায়, ছবি বদলে দেওয়া যায়, ভিডিও তৈরি করা যায়। ফলে সত্য শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি দরকার বিচারবোধ। ব্যোমকেশ আমাদের সেই বিচারবোধের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এবার কয়েকটি উপন্যাসের কাহিনি দেখি, অগ্নিবানে একটি মেয়ে রান্নাঘরে খুন হয়। কিভাবে সে খুন হলো তারও কোনো চিহ্ন নেই। একই পরিবারে যখন আরও একটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ব্যোমকেশ তখন বুঝতে পারেন এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। ব্যোমকেশ অজিতকে বলেন রেখার মৃত্যু দিন দিন রহস্যজনক হয়ে উঠছে। এখানে ব্যোমকেশের যুক্তিবোধের পাশাপাশি তার সাহসও পরীক্ষার মুখে পড়ে। রহস্য যত গভীরে যায়, বিপদও তত ঘনিয়ে আসে। তদন্ত এবং উত্তেজনা পাশাপাশি এগোয়। শরদিন্দুর দক্ষতা এখানেই। তিনি রহস্যকে কখনও নিছক বুদ্ধির খেলা হতে দেননি। তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন বাস্তব বিপদের অনুভূতি।
মাকড়সার রসে অজিতের পুরানো বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে ব্যোমকেশকে একটি মামলায় জড়িত করেন। এই কাহিনিতে অপরাধী নন্দদুলাল বাবু একবারে ধরা দেয় না। ধীরে ধীরে চারদিকে জাল বিস্তার করেন। এতে করে পাঠকের মনে একটা অস্বস্তি ক্রমশ ঘন হয়ে আসে। সবাই কি সত্যিই নির্দোষ? নাকি প্রত্যেকেই নিজের মতো করে জালের একটি সুতো ধরে আছে?
অর্থমনর্থম্-এ সত্যবতীর চাচার রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়। ব্যোমকেশ মামলাটি নেয়। সত্যবতীর তিন ভাই সন্দেহভাজন। পুলিশ সুকুমারকে তার চিকিৎসার কারণে প্রাথমিকভাবে সন্দেহের তালিকায় রাখেন। ব্যোমকেশ কোণঠাসা হয়ে আসল অপরাধীকে ধরে ফেলেন। কিন্তু বিধু বাবু মামলা সমাধানের কৃতিত্ব নেন। উপন্যাসে দেখা যায়, টাকার গন্ধে বদলে যায় মানুষ। অর্থ যেখানে কেন্দ্রে, সেখানে সম্পর্ক কত দ্রুত বদলে যেতে পারে এই কাহিনির অন্যতম আকর্ষণ সেটাই। অর্থ এখানে শুধু সম্পদ নয়। সন্দেহ, আকাঙ্ক্ষা ও অপরাধের চালিকাশক্তি। ব্যোমকেশের অনুসন্ধান এগোতে থাকে মানুষের কথার ফাঁক দিয়ে। কে কি বলল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেন বলল। এই ‘কেন’-এর অনুসন্ধানই কাহিনিটিকে নিছক রহস্যকাহিনি থেকে মানুষের চরিত্রের পরীক্ষায় পরিণত করে।
আদিম রিপু ব্যোমকেশ-সাহিত্যের সবচেয়ে মনস্তাত্ত্বিক কাহিনিগুলির একটি। মানুষের ভিতরে যে প্রবৃত্তি সভ্যতার আবরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে পারে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখানে। রহস্যের সমাধান যত এগোয় ততই স্পষ্ট হয় অপরাধ কখনও কেবল পরিকল্পনার ফল নয়। কখনও তা মানুষের গভীরতম আকাঙ্ক্ষার অন্ধকার দিক থেকে উঠে আসে। এই জায়গাতেই ব্যোমকেশ অন্য অনেক গোয়েন্দা চরিত্রের থেকে আলাদা। তিনি অপরাধীকে ধরেন, কিন্তু একই সঙ্গে পাঠককে প্রশ্ন করেন মানুষ আসলে কতটা সভ্য?
চিড়িয়াখানায় মি. নিশানাথ সেনের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হয়। ঘটনার শুরুতেই অজিত ও ব্যোমকেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন মি. সেন। নিজের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার কথা জানিয়ে তিনি তাদের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন। কিন্তু এরপরই বদলে যায় পরিস্থিতি। একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনায় রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়তে থাকে গোলাপ কলোনির বাসিন্দারা। নিশানাথ বাবুর অনুরোধে ব্যোমকেশ তদন্ত শুরু করেন। সেখানে নেপাল গুপ্ত, চিকিৎসক ভুজঙ্গ এবং বনলক্ষ্মীসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। প্রত্যেকের বক্তব্যের মধ্যে কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এমনটাই মনে হতে থাকে ব্যোমকেশের। বিশেষ করে ভুজঙ্গের কাছ থেকে পাওয়া একটি তথ্য তাঁর কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়। এরই মধ্যে অজিত জানতে পারেন, নিশানাথ বাবু তাদের আর তদন্ত না করার জন্য বলেছেন। অন্যদিকে সুনয়নার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠায় রহস্য আরও জটিল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ছবি খতিয়ে দেখেও প্রথমদিকে কোনো স্পষ্ট সূত্র খুঁজে পাননি ব্যোমকেশ। তবে তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতিটি ঘটনা নতুন করে বিশ্লেষণ করতে থাকেন।
নিশানাথের মৃত্যুর পর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন বিজয় বাবু। ব্যোমকেশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। নিশানাথ সম্পর্কে সে যা জানে এবং তার মৃত্যুর বিষয়ে তার কোনো সন্দেহ আছে কি-না সবকিছু জানতে চান তিনি। বিজয়ের বক্তব্য থেকেও উঠে আসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এদিকে সন্দেহভাজনদের একে একে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন ব্যোমকেশ। সেই সময় বোবা পানু গোপাল কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু ভুজঙ্গকে দেখামাত্রই সে থেমে যায়। পানু গোপাল যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য জানে, সে বিষয়ে ব্যোমকেশের সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়। তার কাছ থেকে সত্য বের করে আনতে বিজয়ের সহায়তাও নেন তিনি।
তদন্তে এবার বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ময়নাতদন্তের ভিত্তিতে জানা যায়, নিশানাথের মৃত্যু নিকোটিন বিষক্রিয়ায় হয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয়, একই ধরনের বিষ ব্যবহার করে এর আগে সুনয়না তার প্রথম শিকারকে হত্যা করেছিল। এর মধ্যেই মধ্যরাতে মুকুলের মৃত্যুর খবরও পৌঁছে যায় ব্যোমকেশের কাছে। ফলে দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা নতুন করে সামনে আসে। রহস্যের গভীরে পৌঁছাতে ব্যোমকেশ অজিত ও তার পুলিশ কর্মকর্তা বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গোলাপ কলোনিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হত্যাকারীর বিরুদ্ধে চালানো একটি অভিযান ব্যর্থ হয়। তবে ব্যোমকেশ বুঝতে পারেন, অপরাধীকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র এখন তার হাতের নাগালে। এরপরই তদন্তে আসে সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত। গোলাপ কলোনির বাসিন্দাদের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠান ব্যোমকেশ। চিঠিতে তিনি জানান, হত্যাকারীর পরিচয় তার জানা। চিঠি পৌঁছানোর পর স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে কলোনিতে। এতদিন যে মানুষটি সবার চোখের সামনে থেকেও নিজের পরিচয় গোপন করে রেখেছিল, এবার কি তার মুখোশ খুলতে চলেছে? নিশানাথের মৃত্যু, নিকোটিন বিষ, পানু গোপালের অসমাপ্ত বক্তব্য এবং গোলাপ কলোনির বাসিন্দাদের রহস্যময় সম্পর্ক সব সূত্র কি শেষ পর্যন্ত একই অপরাধীর দিকে ইঙ্গিত করছে? ব্যোমকেশের চিঠিতে সত্যিই কি লেখা রয়েছে হত্যাকারীর নাম? রহস্যের শেষ পর্দা উঠবে সেখানেই। এই উপন্যাসে ব্যোমকেশের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার ধৈর্য। তিনি তাড়াহুড়ো করেন না। অপেক্ষা করেন কেননা মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের মুখোশ খুলে ফেলে।
শজারুর কাঁটায় দেখা যায়, শহরে একের পর এক ভিক্ষুককে শজারুর কাঁটা দিয়ে হত্যার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অদৃশ্য সেই খুনির পরিচয় উদ্ঘাটনে ব্যোমকেশ বক্সীর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন রহস্য। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রেম, বিয়ে এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের জটিলতায় ‘শজারুর কাঁটা’ রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। দীপা তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। পরে পরিবারের সিদ্ধান্তে দেবাশীষের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। ধুমধাম করে বিয়ের পরও দীপার মনে থেকে যায় পুরোনো প্রেমের টান। একপর্যায়ে সে স্বীকার করে, অন্য একজনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। বিয়েটি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয়েছে বুঝতে পেরে দীপা দেবাশীষকে ছেড়ে চলে যায়। তবে দেবাশীষ বিবাহবিচ্ছেদের পথে না গিয়ে দীপার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন।
এরই মধ্যে শহরে আবারও শজারুর কাঁটা দিয়ে হত্যার ঘটনা সামনে আসে। রাখাল হত্যার রহস্যের সমাধানে ব্যোমকেশের সাহায্য চাওয়া হলে তদন্তে নতুন গতি আসে। শিকার হওয়া ব্যক্তির বাড়ি ঘুরে দেখা থেকে শুরু করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ সবকিছুতেই খুঁটিনাটি তথ্য খুঁজতে থাকেন ব্যোমকেশ। অন্যদিকে বিজয় শুভ্রার সঙ্গে দেখা করে দীপা সম্পর্কে জানতে চায়। দীপার মা মেয়ের দাম্পত্য জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পারিবারিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের রহস্যও ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। তদন্তের একপর্যায়ে ব্যোমকেশ জানতে পারেন, বিশ্বনাথের সঙ্গে তার ছেলে বনিব্রতোর সম্পর্কেও দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। বনিব্রতোকে বাড়ি ফিরে আসার নির্দেশ দিলেও সে বাবার কথায় রাজি হয় না। বরং বাবার প্রতি নিজের ক্ষোভ স্পষ্ট করে দেয়। এই পারিবারিক দ্বন্দ্বও কি হত্যার রহস্যের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ব্যোমকেশ।
এদিকে ভয়াবহ ঝড়ের রাতে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বাড়ি ফেরেন দেবাশীষ। দীপা তার যত্ন নেওয়া শুরু করলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। একপর্যায়ে দীপার কাছে নিজের ভালোবাসার কথা জানান দেবাশীষ। কিন্তু তার এই স্বীকারোক্তির জবাবে দীপার অবস্থান কি হবে, তা নিয়ে তৈরি হয় নতুন অনিশ্চয়তা। রহস্যের জাল আরও ঘন হয় যখন গভীর রাতে দেবাশীষের কোনো সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন দীপা। তার অতীতের গোপন তথ্য কি দেবাশীষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে সেই প্রশ্নও সামনে আসে। অন্যদিকে দেবাশীষকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। তার হৃৎপিণ্ড ডান দিকে থাকায় হামলাকারীর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। এতে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সামনে আসে ঘাতক হয়তো দেবাশীষের শরীরের এই বিশেষ তথ্য জানত না। ফলে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা নিকটজন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন ব্যোমকেশ।
তদন্তের সূত্র ধরে এবার নৃপোতি লাহার বাড়িতে পৌঁছান ব্যোমকেশ। দেবাশীষের ওই বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বিভিন্ন সূত্র মিলিয়ে ব্যোমকেশের সন্দেহের তালিকায় লাহার বাড়ির একজন বাসিন্দাও উঠে আসে। তবে সন্দেহ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। অপরাধীকে হাতেনাতে ধরতে হলে প্রয়োজন নিখুঁত পরিকল্পনা। এদিকে অজিত সত্যবতীকে ‘শজারুর কাঁটা’ রহস্যের অগ্রগতির কথা জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, ব্যোমকেশ শেষ পর্যন্ত এই জটিল রহস্যের সমাধান করতে পারবেন। কিন্তু খুনি যখন এখনও অধরা এবং একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে, তখন তদন্তের শেষ ধাপে ব্যোমকেশ কি কৌশল নেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। নৃপোতি লাহার বাড়িকে ঘিরে ব্যোমকেশের সন্দেহ কি সত্যিই খুনির কাছে পৌঁছে দেবে? দীপার গোপন অতীতের সঙ্গে দেবাশীষের ওপর হামলার কোনো যোগসূত্র আছে কি-না, সেটিও রহস্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সব সূত্র এক জায়গায় এনে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে এবার ব্যোমকেশের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর দর্শকদের।
বিশুপাল বধ উপন্যাসে দেখা যায়, বিশুপাল একটি থিয়েটারের মালিক। একটি নাটক চলাকালে একটি খুনের ঘটনা ঘটে। ব্যোমকেশ হত্যার সময় উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি বুঝতে পারেননি। ব্যোমকেশ বিশু পাল হত্যার মামলাটি তদন্ত করেন।
চিত্রচোরে মাহেন্দ্র বাবুর কাছ থেকে একটি ছবি চুরি হয়। বিষয়টি তিনি ব্যোমকেশকে অবগত করেন। ব্যাংক ম্যানেজার অমরেশ বাবুর সঙ্গে দেখা হলো ব্যোমকেশ ও অজিতের। ব্যোমকেশ ফাল্গুনির তৈরি পেইন্টিং চেয়েছেন। কিন্তু ফাল্গুনি পল মারা গিয়েছিল। এই উপন্যাসে দেখা যায়, চুরি কখনও শুধু চুরি নয়। বিশেষত যখন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্প, অর্থ এবং সামাজিক মর্যাদা। ব্যোমকেশের তদন্ত এগোয় সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে। ছোট ছোট অসঙ্গতিই শেষ পর্যন্ত বড় সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
বুদ্ধিমান হওয়া মানে সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়। বরং সঠিক প্রশ্নটি করতে পারা। আর সত্যের অনুসন্ধান মানে সব সময় চমকপ্রদ কিছু আবিষ্কার করা নয়। কখনো কখনো নিজের ধারণাটিকেও ভুল প্রমাণিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। এটাই ব্যোমকেশের আধুনিক শিক্ষা। একজন ভালো গোয়েন্দা গল্পের রহস্য সমাধান করেন। একটি সাহিত্যিক চরিত্র পাঠকের মনে প্রশ্ন রেখে যায়। ব্যোমকেশ দুই কাজই করেন। গল্পের শেষে খুনি ধরা পড়ে, রহস্যের সমাধান হয়। পাঠক বই বন্ধ করেন। কিন্তু ব্যোমকেশের রেখে যাওয়া প্রশ্নটি থেকে যায়, মানুষ কেন এমন করে? সত্যকে কেন লুকায়? লোভ কোথায় গিয়ে অপরাধে পরিণত হয়? ভালোবাসা কখন অধিকারবোধে বদলে যায়? সামাজিক সম্মান রক্ষার জন্য মানুষ কত দূর যেতে পারে? এই প্রশ্নগুলোই ব্যোমকেশকে দীর্ঘজীবী করেছে। তার কাহিনির সময় শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তার অনুসন্ধানের বিষয় শেষ হয়নি। আজও মানুষ মিথ্যা বলে। আজও মানুষ সত্য লুকায়। আজও অপরাধের পেছনে থাকে মানুষের অন্ধকার প্রবৃত্তি। আর আজও সত্য খুঁজে বের করতে হলে চোখ-কান খোলা রাখতে হয়, প্রশ্ন করতে হয়, প্রমাণ যাচাই করতে হয়। ব্যোমকেশকে শুধু পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি আমাদের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি তিনি প্রশ্ন করার এক অভ্যাসের নাম। রহস্যের শেষ আছে। গল্পের শেষ আছে। অপরাধীর একদিন বিচার হয়। কিন্তু সত্যের অনুসন্ধানের শেষ নেই। সেই জন্যই ব্যোমকেশ এখনো বেঁচে আছেন। এই কারণেই আজও আমাদের ব্যোমকেশের প্রয়োজন।
লেখক: সাহিত্যিক, লেখক ও সাংবাদিক







