সাহিত্যে নোবেল
সাহসী কল্পনাপ্রসারী সৃজনে এলো স্বীকৃতি

কানাডার কবি অ্যান কারসন
আলোচনা আর সংক্ষিপ্ত তালিকায় কতজনের নামই না ছিল! সেখানে ছিলেন সালমান রুশদি, হারুকি মুরাকামি, অমিতাভ ঘোষদের নামও। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এ বছরের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, লেখক, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচক অ্যান কারসন।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্টকহোমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে সুইডিশ একাডেমি। পুরস্কারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুইডিশ একাডেমি বলেছে, ধ্রুপদি সাহিত্য ও গ্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমসাময়িক সাহিত্যের নতুন রূপ দেওয়ার সাহসী ও কল্পনাপ্রসারী সাহিত্যকর্মের জন্য তাকে এ বছরের নোবেল দেওয়া হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডীয় এই লেখক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত গ্রিক পুরাণের প্রভাবসহ কবিতা, গদ্য ও প্রবন্ধের মিশ্রণে সাহিত্যচর্চা করেন। নোবেলজয়ের খবরটি যখন তার কাছে পৌঁছায়, তখন অ্যান কারসন ছিলেন আইসল্যান্ডে, শুনছিলেন বাতাসের শব্দ। সুইডিশ একাডেমির সচিব ইনগ্রিড কার্লবেরি বলেছেন, ফোনে সংবাদ শুনে কারসন বিস্মিত ও আনন্দিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোয়। তাকে সমকালীন ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিকস বা প্রাচীন গ্রিক-রোমান সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা কারসন ১৯৭৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদি সাহিত্যে ডিপ্লোমা নেন এবং ১৯৮১ সালে স্যাফোকে নিয়ে ডক্টরেট গবেষণা সম্পন্ন করেন। দীর্ঘদিন তিনি ম্যাকগিল ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা, গবেষণা ও অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রাচীন গ্রিক ভাষা, পুরাণ ও দর্শন তার সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও তিনি সেগুলোকে শুধু অতীতের বিষয় হিসেবে দেখেননি। বরং আধুনিক মানুষের প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি, একাকিত্ব ও মানসিক টানাপড়েনের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন সাহিত্যভাষা নির্মাণ করেছেন। কারসনের সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো তিনি কোনো একক ঘরানার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তার লেখায় কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গবেষণা ও আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা একত্রে মিশে নতুন সাহিত্যিক রূপ তৈরি করে। তার রচনায় কবিতা, গদ্য ও প্রবন্ধ একসঙ্গে মিশে যায় এবং প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পুরাণ বারবার ফিরে আসে। নোবেল কমিটির ভাষায়, তার সাহিত্যকর্ম ‘ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপে সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন রূপ তৈরি করেছে।’ কারসনের রচনা কখনো প্রচলিত কবিতা, উপন্যাস বা প্রবন্ধের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার বহুল আলোচিত গ্রন্থ অটোবায়োগ্রাফি অব রেড (Autobiography of Red) একটি ‘নভেল ইন ভার্স’। কবিতার ছন্দে লেখা এই উপন্যাসে প্রাচীন গ্রিক পুরাণের গেরিয়ন চরিত্রটিকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। গেরিয়ন নামের এক কিশোর, যে আসলে ডানাওয়ালা লাল রঙের এক দৈত্য— তার আত্মজীবনীটি লেখে কারসনের কাব্যোপন্যাস জুড়ে। পাশাপাশি হেরাক্লিসের সঙ্গে তার সমকামী প্রেমের কাহিনিও সেখানে উঠে এসেছে। কারসনের প্রথম সমালোচনামূলক গ্রন্থ ইরোস দ্য বিটারসুইট (১৯৮৬)। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ও সাহিত্যে ‘ইরোস’ বা প্রেমের ধারণা নিয়ে লেখা এই বইটিকে নোবেল কমিটি তার পরবর্তী সাহিত্যজীবনের ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০০১ সালে লেখা তার দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড ইংরেজ কবি জন কিটসের বিউটি ইজ ট্রুথ, ট্রুথ ইজ বিউটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ২৯টি ‘ট্যাঙ্গো’ ছন্দে লেখা এই রচনাটি একটি দাম্পত্যের ভাঙনের কাহিনি। এই বইয়ের জন্য তিনি টি এস এলিয়ট প্রাইজ পেয়েছিলেন— সেই পুরস্কারের ৯ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে। কারসনের ‘নক্স’ (২০১০) মৃত ভাই মাইকেলের স্মৃতিতে লেখা এক ব্যতিক্রমধর্মী সাহিত্যকর্ম। এটি একটি অ্যাকর্ডিয়ন-ভাঁজের আকারে ছাপা বই, যাতে রয়েছে ছবি, চিঠি, অন্যান্য লেখা এবং রোমান কবি ক্যাটুলাসের শোকগাথার অনুবাদ।
নোবেল পুরস্কারের আগে তিনি টি এস এলিয়ট পুরস্কার, গ্রিফিন পোয়েট্রি পুরস্কার এবং ম্যাকআর্থার ফেলোশিপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
২০০০ সালে তিনি ম্যাকআর্থার ‘জিনিয়াস’ গ্রান্ট লাভ করেন এবং ২০০১ সালে Men in the Off Hours-এর জন্য কানাডার প্রথম গ্রিফিন পোয়েট্রি পুরস্কার জেতেন। এ ছাড়া তিনি গুগেনহাইম ফেলোশিপ এবং পুশকার্ট পুরস্কারও পেয়েছেন। কারসন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না এবং তার কাজের আত্মজীবনীমূলক ব্যাখ্যাকেও নিরুৎসাহিত করেন। তবে ২০২৪ সালে তিনি প্রকাশ করেন যে তিনি পারকিনসন রোগে আক্রান্ত। এই রোগ তার হাতের লেখার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে, যা তার লেখার প্রধান মাধ্যম ছিল। সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার মাধ্যমে অ্যান কারসন এমন এক লেখকগোষ্ঠীতে যুক্ত হলেন, যাদের কাজ বিশ্বসাহিত্যের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গ্রিক পুরাণ, প্রাচীন সাহিত্য, অনুবাদ এবং আধুনিক সাহিত্যভাষাকে একসূত্রে গাঁথার যে সাহিত্যিক যাত্রা তিনি কয়েক দশক ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন, সুইডিশ একাডেমি এবার সেই অবদানকেই বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দিল।



