যুগল সাক্ষাৎকারে সিলভিয়া প্লাথ ও টেড হিউজ

সিলভিয়া প্লাথ ও টেড হিউজ
দুই দিন আগে দৈনিক আগামীর সময়-এ প্রকাশিত হয় প্রভাবসঞ্চারী মার্কিন কবি সিলভিয়া প্লাথের একমাত্র সাক্ষাৎকার। এরপর কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈকত দে দাবি করেন সিলভিয়া প্লাথের আরেকটি সাক্ষাৎকার আছে, এটিই একমাত্র নয়। খুঁড়তে গিয়ে দেখা যায় আদতে তা সিলভিয়া প্লাথ ও টেড হিউজের একটি দ্বৈত সাক্ষাৎকার, একক নয়। তবে দ্বৈত সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্যও। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন আগামীর সময়-এর সাহিত্য সম্পাদক শিমুল সালাহ্উদ্দিন। তার দেওয়া ভূমিকাসহ এটি পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলো।
দুই কবির সাক্ষাৎকার: প্রেম, কবিতা ও দাম্পত্যের এক বিরল দলিল
১৯৬০ সালে সিলভিয়া প্লাথ বিবিসির ‘দ্য পোয়েটস ভয়েস’ ধারাবাহিকের জন্য একটি যৌথ সাক্ষাৎকার দেন। তার সহকথক ছিলেন স্বামী ও সঙ্গী কবি টেড হিউজ। ১৯৬০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৬৩ সালের জানুয়ারির মধ্যে— আত্মহত্যার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত এই সাক্ষাৎকারটির অন্তত সতেরোটি আলাদা সম্প্রচার কপি তৈরি হয়। ‘দ্য স্পোকেন ওয়ার্ড : সিলভিয়া প্লাথ’ নামে ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভের সংরক্ষিত রেকর্ডিংয়ের সংকলন থেকেই পাওয়া যায় বিবিসির ওয়েন লিমিংয়ের সঙ্গে কবিযুগলের বিশ মিনিটের অমূল্য সাক্ষাৎকারটি। ‘টু অফ আ কাইন্ড : পোয়েটস ইন পার্টনারশিপ’ শিরোনামের এই সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড করা হয় ১৯৬১ সালের ১৮ জানুয়ারি এবং প্রথম সম্প্রচারিত হয় ৩১ জানুয়ারি।
আলাপের বিষয়বস্তুর জন্যই এই সাক্ষাৎকার কেবল নিছক একটি সাক্ষাৎকার নয়— একটি দাম্পত্যের ভেতরের সাহিত্যিক সহযোগিতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং একইসঙ্গে আলাদা থাকার প্রয়োজনীয়তার এক বিরল দলিল। যে দুজন মানুষ একে অপরকে কবিতায় পেয়েছিলেন, সেই কবিতাই তাদের একসঙ্গে থাকার ভাষা তৈরি করেছিল— অন্তত সেই সময়ে, যখন এই কথাগুলো রেকর্ড হচ্ছিল।
১৯৬১ সালের বিবিসি সাক্ষাৎকার
ওয়েন লিমিং : টেড, আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
টেড হিউজ : পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের মিথলম্রয়েড থেকে এসেছি, হ্যালিফ্যাক্সের কাছে।
ওয়েন লিমিং : আর আপনি, সিলভিয়া?
সিলভিয়া প্লাথ: ও, আমি ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে জন্মগ্রহণ করেছি, কিন্তু আমি মনে করি এখন ইংল্যান্ডেই থাকব।
ওয়েন লিমিং : আচ্ছা, একভাবে দেখলে ইয়র্কশায়ার আর আমেরিকার মধ্যে একটা মিলন ঘটেছে। এটা কীভাবে ঘটল?
টেড হিউজ : আমি ১৯৫৪ সালে কেমব্রিজ ছাড়ি, কিন্তু সেখানে আমার কিছু বন্ধু ছিল, যাদের দেখতে মাঝেমধ্যে ফিরে যেতাম। সেই বন্ধুদের একজন একটা কবিতা পত্রিকা বের করতেন। পত্রিকাটির মাত্র একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। যাই হোক, সেই পত্রিকায় আমার কিছু কবিতা ছিল, আর সংখ্যাটি বেরোনোর দিন আমরা একটা পার্টির আয়োজন করি।
সিলভিয়া প্লাথ : যেখানে আমি গিয়েছিলাম। আমি তখন কেমব্রিজে পড়ছিলাম। বৃত্তি দিয়ে সরকার আমাকে সেখানে পাঠিয়েছিল, আর আমি সেই পত্রিকায় টেডের কিছু কবিতা পড়েছিলাম। আমি খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম এবং তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। আমি সেই ছোট্ট পার্টিতে গিয়েছি, আর সেখানেই আসলে আমাদের দেখা হয়।
ওয়েন লিমিং : এই প্রথম সাক্ষাৎ কীভাবে এগিয়ে গেল?
সিলভিয়া প্লাথ : লন্ডনে কোনো এক শুক্রবার, তেরো তারিখে, আমরা আবার দেখা করেছিলাম, তাই না? একভাবে বা অন্যভাবে এরপর, তারপর আমরা অনেক দেখা করেছি। টেড কেমব্রিজে ফিরে এলেন, আর হঠাৎ দেখলাম কয়েক মাস পর আমরা বিয়ে করছি।
টেড হিউজ : আমি কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। প্রায় তিন মাস কাজ করেছিলাম, আর যা জমিয়েছিলাম সব প্রেম-পর্বে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, যা প্রায় তিন মাস চলেছিল।
ওয়েন লিমিং : এই প্রস্তাবের আসল রূপটা কী ছিল?
সিলভিয়া প্লাথ : আমরা একে অপরকে কবিতা লিখতে থাকলাম, আর সেটা থেকেই এটা বেড়ে উঠল। আমার মনে হয় এই অনুভূতি যে আমরা দুজনেই এত বেশি লিখছি এবং তা করতে এত ভালো সময় কাটাচ্ছি, আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এটা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
টেড হিউজ : কবিতাগুলো আসলে টিকে থাকেনি। বিয়ে কবিতাগুলো ছাপিয়ে গেল।
ওয়েন লিমিং : আমি বলতে চাচ্ছিলাম, কোনো কবিতার বইয়ে টেডকে, সিলভিয়াকে উৎসর্গের বাইরে এমন কিছু নেই, যা আমি আসলে একে অপরকে উদ্দেশ্য করে লেখা বা এমনকি একে অপরকে নিয়ে লেখা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারি।
সিলভিয়া প্লাথ : আমি মনে করি আমরা একে অপরকে যে কবিতাগুলো লিখেছি এবং একে অপরকে নিয়ে লিখেছি, সেগুলো আসলে আমাদের বিয়ের আগের, আর তারপর কিছু একটা ঘটল। জানি না কী ছিল। আশা করি এটা ভালোর জন্যই ছিল, কিন্তু আমরা একভাবে অন্য বিষয়ের জন্য নিজেদের মুক্ত করতে পারতে শুরু করলাম, আর উৎসর্গগুলো, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, আমি মনে করি টেডের বোঝাপড়া ও সহযোগিতা ছাড়া আমি যেমন লিখছি এবং যতটা লিখছি তা কখনো লিখতে পারতাম না। সত্যিই।
ওয়েন লিমিং : টেড, আপনি কি আসলে আমেরিকায় গিয়েছেন?
টেড হিউজ : হ্যাঁ, আমি প্রায় তিন বছর সেখানে ছিলাম, আর সেখানে থাকার সময় পড়িয়েছি, আমরা আমেরিকা ঘুরে বেড়িয়েছি, আর বেঁচে থাকার মতো টাকা পেয়েছি। আমরা এখানে ফিরে আসার পর, সেই টাকা দিয়েই এতদিন চলছি।
ওয়েন লিমিং : আপনাদের শৈশবের কথা কী বলবেন? নিশ্চয়ই বেশ আলাদা ছিল। আমার মনে হয় আপনার ‘দ্য ডিসকোয়েটিং মিউজেস’ নামে একটি কবিতা আছে, যেখানে আমি মনে করি কিছুটা আত্মজীবনী আছে, আর আপনি সমুদ্র নিয়েও অনেক লেখেন।
সিলভিয়া প্লাথ : আমি ম্যাসাচুসেটসের উত্তর উপকূলে বড় হয়েছি, আর আমার পুরো শৈশব সমুদ্রের ধারেই কেটেছে। আমার মনে আছে সেই ভয়ঙ্কর হারিকেনগুলো, যখন আমার দাদির বেসমেন্ট পানিতে ভরে যেত, আর বাগানে হাঙর ভেসে আসত ইত্যাদি, আর সমুদ্রের সেই চিত্র তখন থেকেই আমার সঙ্গে আছে। যদিও আমি কয়েক বছর ভেতরের এলাকায় আছি, তবু আমার মনে হয় মানুষ সবসময় এমন উজ্জ্বল ও রঙিন অভিজ্ঞতার দিকেই ফিরে যায়। আর আমি জানি সমুদ্র আমার অনেক কবিতায় আসে। কখনো তা শুধু অবচেতন সমুদ্র, এক ধরনের চিন্তার প্রবাহ ইত্যাদি। আবার কখনো তা প্রকৃত সমুদ্রই।
ওয়েন লিমিং : আপনি কি সুখী শিশু ছিলেন? আপনার কি এক ধরনের খেলাধুলাময় জীবন ছিল, নাকি আপনি অনেকটা কল্পনায় বাস করতেন?
সিলভিয়া প্লাথ : আমি মনে করি প্রায় নয় বছর বয়স পর্যন্ত আমি সুখী ছিলাম, খুব নিশ্চিন্ত, আর আমি জাদুতে বিশ্বাস করতাম, যা আমাকে কিছুটা প্রভাবিত করেছিল। তারপর আমি বড় একটা মোহভঙ্গের শিকার হলাম। এলভস আর সান্তা ক্লজ এবং এই ধরনের ছোট ছোট কল্যাণকর শক্তিতে বিশ্বাস করা বন্ধ করলাম, এবং আরও বাস্তববাদী ও বিষণ্ন হয়ে পড়লাম। আমি মনে করি, তারপর ধীরে ধীরে প্রায় ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে আরও খাপ খাইয়ে নিলাম। কিন্তু আমার কৈশোর নিশ্চিতভাবেই সুখের ছিল না, আর সম্ভবত সে কারণেই আমি বিশেষভাবে লেখার দিকে ঝুঁকেছিলাম। আমি ডায়েরি, গল্প ইত্যাদি লিখতাম এবং সেই বছরগুলোতে বেশ অন্তর্মুখী ছিলাম।
ওয়েন লিমিং : আর আপনি, টেড? আপনার কবিতায়, কবিতার প্রাকৃতিক দৃশ্য আসলে প্রাকৃতিক দৃশ্যই, তাই না? ইয়র্কশায়ার ডেলসের, পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের, হ্যাঁ, খুব বেশি, আর চরিত্রগুলো প্রায়ই গ্রামীণ ধরনের, বা আসলে পশু, পশুজগৎ, বিশেষ করে বেশি বন্য জন্তু যেমন ভোঁদড় আর নেউল ইত্যাদি।
টেড হিউজ : আমি পশুদের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম। আসলে, আমার প্রথম স্মৃতি আমার খেলনাগুলোর, যেগুলো সব ছোট সীসার পশু, যা তখন কেনা যেত। আমার এমন ডজনখানেক ছিল। যখন আমার বয়স চার, এক ফুপু আমাকে একটা পশুর বই কিনে দেন, মোটা পশুর বই, যা পরের পাঁচ বছর আমার জন্য এক ধরনের বাইবেল ছিল।
ওয়েন লিমিং : আপনি কি সেগুলো নিয়ে খেলতেন, নাকি সত্যিই অংশ নিতেন? আপনার কি মনে হতো আপনি প্রায় নিজেই একটা ছোট পশু?
টেড হিউজ : জানি না। মনে করতে পারি না। আমি প্লাস্টিসিন দিয়ে পশু বানাতাম আর পশুর ছবি আঁকতাম।
ওয়েন লিমিং : আপনি কি গ্রামের ছেলে ছিলেন?
টেড হিউজ : হ্যাঁ। মিথলম্রয়েড আসলে গ্রাম নয়, কিন্তু চারদিক থেকেই গ্রামীণ পরিবেশ একেবারে তার গায়ে এসে পড়ে। আর আমার ভাই রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে খুব ভালোবাসতো, আসলে সে প্রায় আর কিছুই করতো না, আর সে আমাকে এক ধরনের শিকারী কুকুর হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যেতো।
ওয়েন লিমিং : সেখান থেকে কেমব্রিজ পর্যন্ত আপনার অগ্রগতির পথটা কেমন ছিল?
টেড হিউজ : আমার বয়স যখন প্রায় আট, তখন আমরা মিথলম্রয়েড ছাড়ি, আর তারপর সেসব বন্ধ হয়ে গেল। আমরা মেক্সবরোতে চলে যাই, যা ছিল শিল্পোন্নত, বিষণ্ন আর নোংরা, আর তখন আমাদের সবাইকে খুব অসুখী করেছিল জায়গাটা। কিন্তু এটা আসলে খুব ভালো একটা ব্যাপার ছিল। এটা আমার জন্য আগের সাত বছরের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠল। কিন্তু এত আলাদা হওয়ায়, এটা আমার প্রথম সাত বছরকে মগজবন্দী করে দিলো, যাতে এখন আমার প্রথম সাত বছরের স্মৃতি আছে। আমার প্রথম সাত বছর প্রায় আমার জীবনের অর্ধেক মনে হয়। আমি প্রায় সবকিছু মনে রেখেছি, কারণ এটা এতই বিশেষভাবে গ্রন্থিত হয়ে গিয়েছিল এবং এক ধরনের মস্তিষ্ক, আরেকটি সহায়ক মস্তিষ্ক হয়ে উঠেছিল, আর যাই হোক, আমি মেক্সবরো গ্রামার স্কুলে গিয়েছিলাম এবং পাঠে খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না, কিন্তু আমি লিখতাম, আর শিক্ষকরা আমার লেখায় আগ্রহী মনে হয়েছিল। তাই ধীরে ধীরে আমি সবকিছু একেবারে লেখার দিকে কেন্দ্রীভূত করলাম। এটা সম্ভব মনে হতে শুরু করল যে আমার লেখার মাধ্যমে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারব এবং বৃত্তি পেতে পারব ইত্যাদি।
ওয়েন লিমিং : আপনি কি বলবেন যে আপনাদের স্বভাব-প্রকৃতি সমান্তরাল, নাকি আপনি মনে করেন তারা সংঘাতপূর্ণ এক অর্থে এটি বিপরীতের মিলন?
টেড হিউজ : আমি মনে করি বাহ্যিকভাবে আমরা একরকম। আমরা একই জিনিস পছন্দ করি। আমরা একই গতিতে বাঁচি, প্রায় সব দিক থেকেই একই ধরনের ছন্দ আছে। স্পষ্টতই, এটি অত্যন্ত ভিন্ন স্বভাব-প্রকৃতির জন্য সৌভাগ্যজনক আচ্ছাদন, কিন্তু তারা গোপন জীবন যাপন করে। দেখুন, তারা একটি কল্পনার জগতে সন্তুষ্ট থাকে, তাই তারা কখনো সত্যিই প্রকাশ্য সংঘাতে আসে না।
ওয়েন লিমিং : তবে আপনি এমন ধারণা দিতে চাইবেন না যে আপনারা পুরো দাম্পত্য জীবন কবিতা ভেবে আর একে অপরকে পড়ে শুনিয়ে কাটান।
সিলভিয়া প্লাথ : আমি মনে করি আমাদের পারিবারিক জীবন আমাদের চারপাশে যারা বাস করে তাদের সবার সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। একমাত্র পার্থক্য হলো টেড সকাল নয়টায় কাজে বেরিয়ে বিকেল পাঁচটায় ফেরেন না। তিনি প্রায় নয়টায় তার ঘরে ঢুকে যান এবং কাজ করেন। কিন্তু আমার নিশ্চিতভাবেই অন্য সব গৃহিণী ও মায়ের মতোই একটি জীবন আছে, কেনাকাটা, বাসনপত্র ধোয়া আর শিশুর যত্ন নেওয়া ইত্যাদি। আর আমি মনে করি খুব কম মানুষই ধারণা করে যে আমি গৃহস্থালির কাজ ইত্যাদি ছাড়া আর কিছু করি।
টেড হিউজ : চার বছরে, যদি আপনি আশিটি কবিতা লেখেন, এটা আসলে খুব বেশি নয়। আপনি সারাক্ষণ কবিতা লিখছেন না। মনে হয় আপনি মাসের পর মাস যায় এবং কিছুই লেখেন না। তাই সআপনার জীবন বেশিরভাগ সময় অন্য সবার মতোই।
ওয়েন লিমিং : আপনারা কোথায় থাকেন?
টেড হিউজ : ক্যামডেন টাউনের কাছে, আসলে প্রাইমরোজ হিল আর চিড়িয়াখানার ওপরের দিকে।
সিলভিয়া প্লাথ : এটাই আমাদের এত ভালো লাগার একটা কারণ। আমরা সবসময় শিশুকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যাই ইত্যাদি। গ্রীষ্মকালে আমরা সিলদের প্রচণ্ড ডাক শুনতে পাই।
ওয়েন লিমিং: আপনাদের থাকার কতটা জায়গা আছে?
সিলভিয়া প্লাথ : যথেষ্ট নয়। আমাদের খুব ছোট একটা ফ্ল্যাট, একটা শোবার ঘর, একটা বসার ঘর, একটা রান্নাঘর, আর একটা বার, যা নয় মাসের শিশু সামলানোর ক্ষেত্রে বেশ একটা কসরতের ব্যাপার। আর আমরা একটা বাড়ির স্বপ্ন দেখছি যেখানে আমি এক প্রান্ত থেকে টেডকে চিৎকার করে ডাকতে পারব, আর তিনি শুনতে পাবেন না। কিন্তু সেই বাড়ি কত দূরে, জানি না।
ওয়েন লিমিং : আপনাদের কি একে অপরের থেকে আলাদা থাকা জরুরি মনে হয়েছে?
টেড হিউজ : আমি ঘরে লোক থাকলেও সহজে লিখতে পারি।
সিলভিয়া প্লাথ : হ্যাঁ, টেড এতে আমার চেয়ে ভালো। আমার সত্যিই একা থাকা দরকার। নইলে কথা বলার প্রলোভন খুব বেশি হয়ে যায়। আমি মনে করি এই দিক থেকে আমি অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন মানুষ।
ওয়েন লিমিং : আচ্ছা, তারা বলে দুজন একজনের মতোই সস্তায় থাকতে পারে, তবুও এটা নিশ্চয়ই বেশ ব্যয়বহুল। লেখার বাইরে আপনাদের কি চাকরি আছে?
টেড হিউজ: না, এখন নেই। আমেরিকায় আমাদের দুজনেরই পড়ানোর কাজ ছিল।
সিলভিয়া প্লাথ : আমি কিছুদিন সেক্রেটারি ছিলাম, আর আমরা যদি প্রায় অনাহারে পড়ি বা দেখি যে খাবার রাখার শেলফ খালি, তাহলে আমি সবসময় সেক্রেটারির চাকরি বা খণ্ডকালীন চাকরি নিতে পারি। আমরা বেশ নমনীয়, কারণ দুজনেরই কাজ করার ক্ষমতা আছে এবং আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি, তারপর পরিস্থিতি যতটা চেয়েছে ততটা করেছি।
টেড হিউজ : আগে আমি শুধু অস্থায়ী কাজ করেছি, খুব অল্প সময়ের জন্য। আমি এক ধরনের স্ক্রিপ্ট পাঠক এবং নৈশপ্রহরী হিসেবে কাজ করেছি। কিছুদিন গোলাপ বাগানের মালি হিসেবে কাজ করেছি। বর্তমানে আমরা বেশি বা কম আমাদের লেখার আয় দিয়ে চালাচ্ছি, যা সাহায্য করে টেনে নিতে, কিন্তু আমাদের সঞ্চয়ের শেষ স্তূপ, যা মূলত পড়ানো থেকে এসেছে, প্রায় ফুরিয়ে আসছে। এখন আমাদের অন্য কোথাও থেকে আরেকটি স্তূপ জোগাড় করতে হবে।
সিলভিয়া প্লাথ : টেড একটা অনুদান পেয়েছিলেন, একটা লেখার অনুদান, যা ছিল দুর্দান্ত, কিন্তু আমরা আসলে বছর থেকে বছর দেখি আর এর বেশি দূরে তাকানোর চেষ্টা করি না, কারণ লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার বিশ বছরের পেনশন পরিকল্পনা থাকে না এবং একটু বেশি বিশ্বাস ও দুঃসাহস দরকার। সম্ভবত স্থায়ী চাকরি থাকলে যতটা লাগে তার চেয়ে বেশি।
ওয়েন লিমিং : কিন্তু আপনি কি অন্য কোনোভাবে এটি চাইতেন?
সিলভিয়া প্লাথ : জানি না, একেবারেই না। আমি যেমন খুব ব্যবহারিক ও গৃহিণী, তবুও মনে করি সুবিধাগুলো এত বড় যে পরিবর্তন চাইব না।
টেড হিউজ : চাকরি পেলে টাকার চিন্তা শুরু হয়।
ওয়েন লিমিং : শিশু কি ঘর চালানোর ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য এনেছে?
সিলভিয়া প্লাথ: আসলে, আমি অবাক হয়েছিলাম যখন দেখলাম সে কত সহজ। আমি ভেবেছিলাম মাতৃত্বে আমি হারিয়ে যাব এবং নিজের জন্য কোনো সময় পাব না। কিন্তু একভাবে সে চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে গেছে। মানে, সে চিৎকার করে কাঁদে না, নিজে নিজে খেলে। আর আমি মনে করি আমরা দুজনেই তার উদ্দেশে অনেক কবিতা লিখেছি এবং তাকে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি বিনোদনদায়ক মনে করি।
টেড হিউজ : সে এক ধরনের আকাশী, জানেন। সে এক সম্পূর্ণ পরিসরের অনুভূতি নিয়ে আসে, একটা পুরো জগৎ যা আগে ঘরে ছিল না, বিড়ালের মতো, শুধু অনেক ভালো। আমি মনে করি আমরা দুজনেই খুব—
সিলভিয়া প্লাথ : পরিবারকেন্দ্রিক। মানে, আমি একটা বড় বাড়ির কথা ভাবি, যেখানে ছোট ছোট শিশু আর ছোট ছোট পশু থাকবে।
ওয়েন লিমিং : শিশুকে কবিতা শোনানোর সাথে পরিচয় করানোটা কোন পর্যায়ে শুরু করবেন?
সিলভিয়া প্লাথ : সে ইতিমধ্যেই ছড়া-কবিতা শুনেছে, যা আমি কবিতা বলেই মনে করি। আমি এ নিয়ে কুণ্ঠিত নই। মনে করি ছোট ছড়া ও গান থেকে শুরু করে এলিয়টের ব্যবহারিক, কী যেন, ব্যবহারিক বিড়াল— সবই নিখুঁত উপাদান।
ওয়েন লিমিং : ধরে নিচ্ছি আপনারা দুজনেই শৈশবের স্মৃতি থেকে কবিতা টেনে নিয়ে যেতে পারবেন না। এখন লেখার আরও চলমান উৎস, অনুপ্রেরণা কী?
টেড হিউজ : আমার জীবনের অভিজ্ঞতা ছাড়াও আমার কাছে সিলভিয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। সে অতীতে যে সব অভিজ্ঞতা পেয়েছে, তা এমন এক মাধ্যমের মতো যে স্বয়ংক্রিয় লেখক জানেন, শুধু একটা প্যাডে। আর সে যা লেখে তা তার নিজের মনের বিষয়বস্তু হওয়ার দরকার নেই। তা তার জানা কিছু হওয়ার দরকার নেই, বরং তা এমন কিছু যা ঘরের কেউ জানে, বা এমন কেউ যার সঙ্গে সে ঘনিষ্ঠ। আর এভাবে, দুজন মানুষ যারা একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং আধ্যাত্মিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তারা আসলে একজন মানুষ হয়ে ওঠে। তারা এক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে, যা দুজনে ব্যবহার করেন এবং আপনি টেনে নিতে পারেন। আপনি এই একক ভাগ করা মন থেকে অবিশ্বাস্যভাবে উপাদান টেনে নিতে পারেন।
আর আমি নিশ্চিত এটি আমার কবিতার অনেক কিছুর উৎস। আমি জানি না এটা উল্টোদিকেও কাজ করে কি না। আমার সন্দেহ হয়। এটা নয় যে আপনি একই জিনিস লিখতে বেছে নেন এবং আপনি নিশ্চিতভাবেই সেগুলো একইভাবে লেখেন না। এটা আপনি অভিজ্ঞতা থেকে টেনে নেন। যেন কোনো কিছু সম্পর্কে নিজের জীবন থেকে যা শিখেছেন তার চেয়ে বেশি জানেন। আমিও আমার স্ত্রীর এ সম্পর্কে জ্ঞান থেকে টেনে নিচ্ছি।
ওয়েন লিমিং : এটা কথায় প্রকাশ করা খুব কঠিন ব্যাপার, তাই না?
টেড হিউজ : বোঝানো জটিল ধারণা। প্রথমত, দুজন সহানুভূতিশীল মানুষের মধ্যে এই ধরনের টেলিপ্যাথিক মিলন আছে বলে বিশ্বাস করা যায়, যা অবশ্যই অনেক মানুষ বিশ্বাস করে না।
ওয়েন লিমিং : আপনি কি এভাবে বলতেন?
সিলভিয়া প্লাথ : আমি? আমি মনে করি সম্ভবত আমি এ নিয়ে একটু বেশি ব্যবহারিক, ততটা বিমূর্ত নই। আমি একটা উদাহরণ দিতে পারি। যেমন, টেডের পশুদের প্রতি আগ্রহ আমাকে আমার নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করেছে। আর আমার বাবা একজন জীববিজ্ঞানী ছিলেন এবং মৌমাছি পালন করতেন। আর আমি তখন এ নিয়ে বেশি ভাবিনি। কিন্তু মৌমাছি পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছি, আর মৌমাছি পালনের চিত্র আমার কবিতার অংশ হয়ে উঠেছে। আর আমি মনে করি এটি টেডকে জানার সরাসরি ফল। আমি একভাবে তার মাধ্যমে আমার নিজের অতীত সম্পর্কে আরও জানি, যা অন্যভাবে জানতাম না। কিন্তু আমি শিল্প, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য দ্বারাও প্রভাবিত। আমার অনেক কবিতা চিত্রকর্ম বর্ণনা করে এবং একটি দৃশ্যমান চিত্র থেকে শুরু করে সেখান থেকে এগিয়ে যায়।
ওয়েন লিমিং : আমি আপনার কবিতায় কিছু মিল দেখতে পাই। আপনারা একই ধরনের জগতে আগ্রহী এবং একইভাবে লেখেন। আপনারা দুজনে কি মনে করেন বিবাহিত হয়ে, এভাবে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থেকে এবং মৌলিকভাবে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকায়, একটা বড় বিপদ আছে যে আপনাদের কবিতা প্রায় একে অপরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে?
সিলভিয়া প্লাথ : আমি জানতে চাই আপনি কীভাবে মনে করেন কবিতাগুলো একরকম, কারণ এটি এমন কিছু যা আগে কেউ কখনো উল্লেখ করেনি এবং আমি সবসময় ভেবেছি যে আমাদের বিষয়বস্তু, বিশেষ করে আমরা যে রূপে লিখি সেই রূপগুলো আসলে বেশ আলাদা। আমি জানতে আগ্রহী আপনি কোথায় মনে করেন তারা মিলে যায়।
ওয়েন লিমিং : আমি মনে করি না তারা ততটা আলাদা। আমি মনে করি আপনি এক ধরনের মোচড়, যেভাবে পঙক্তি পরের পঙক্তিতে গড়িয়ে যায়, উদাহরণস্বরূপ, এক ধরনের প্রযুক্তিগত শক্তির কৌশল, আপনি যেভাবে বাক্য গঠন, শব্দ ব্যবহার করেন, আর আপনারা দুজনেই পশুজগৎ নিয়ে উদ্বেগ দেখান। এমন নয় যে অন্য কবিরা করেন না এবং এক ধরনের গ্রামীণ প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং আপনি যেভাবে এটি ব্যবহার করেন তাও আমার মনে হয় খুব একরকম।
সিলভিয়া প্লাথ : আমাদের কবিতায় এটি আসলে আগেই ছিল। আমরা একে অপরকে জানার বা দেখার আগেই। সেই অর্থে আমরা যদি আদৌ একরকম হই, তাহলে আমরা একে অপরের সঙ্গে কখনো দেখা করেছি কি না তা না হয়ে নির্বিশেষে একইরকম হতাম। তাই আমি মনে করি না এটি আমাদের দেখা হওয়ার ফল। এটি এমন কিছু যা আগেই চলছিল। মানে, আমরা একে অপরের কথা শোনার দশ বছর আগে থেকেই লিখছিলাম।
টেড হিউজ : আমি মনে করি এটি এমন কিছু যা আমরা আরও কয়েকজন লেখকের সঙ্গেও ভাগ করি, এখন লেখা আরও কয়েকজনের সঙ্গে।
সিলভিয়া প্লাথ : আর যে ধরনের কঠোরতা ও দুষ্টুমি আমরা পছন্দ করি, তাও আমি মনে করি এমন কিছু যা আমরা সবসময় পছন্দ করেছি এবং সম্ভবত সেজন্যই আমরা প্রথমে দেখা করেছিলাম, কারণ আমরা দুজনেই অনুভব করেছিলাম যে আমাদের আগ্রহ একই রকম।
টেড হিউজ : আমরা যখনই একই ধরনের বিষয় নিয়ে লিখি, তখন এর প্রধান বিষয় হলো আমরা এটি কত ভিন্নভাবে হ্যান্ডল করি এবং কত ভিন্নভাবে এর কাছে যাই।
সিলভিয়া প্লাথ : একটি উদাহরণ হলো আমাদের প্রত্যেকের একটি শূকর নিয়ে কবিতা আছে। সম্ভবত এজন্যই মানুষ মনে করে আমরা একরকম। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে কেউ এই দুটি কবিতার তুলনা করলে দেখবে টেডের শূকর পালনের প্রতি মনোভাব এবং আমার মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। আমি জানি এক ধরনের শিথিল গীতিধর্মী গুণ বা ফুলেলতার প্রতি আমার নিজের বিতৃষ্ণা আসলে আমার নিজের কবিতা বা টেডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের জানা যে কারও লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর আমরা একে অপরের মধ্যে যা পছন্দ করি, সম্ভবত তা অন্য মানুষের মধ্যেও পছন্দ করি।
টেড হিউজ : সিলভিয়ার শূকর একটি কিংবদন্তি দানবাকৃতির শূকর। এটি সব শূকরত্ব এবং অতিরিক্ত শূকরতার সমাবেশ। আমারটি হলো একটি শূকর হারিয়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে। অন্য কথায়, শূকর যখন আর শূকর নয়, যখন সে মৃত, তখন তার কী অবশিষ্ট থাকে। একভাবে এটি সিলভিয়ার থিমের সম্পূর্ণ বিপরীত।
ওয়েন লিমিং : সংগীত কি আপনাদের জীবনে ভূমিকা রাখে?
সিলভিয়া প্লাথ : আমি মনে করি টেড আমার চেয়ে অনেক বেশি সংগীতমনষ্ক। আমি পিয়ানো আর ভায়োলা শিখেছিলাম এবং স্কুল অর্কেস্ট্রায় বাজাতাম। কিন্তু এটি আমার ওপর প্রায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি সুর ধরতে পারতাম না এবং এ কারণে অসুখি বোধ করতাম। টেডকে জানার পর থেকেই আমি সংগীত শুনি, বিশেষ করে বিথোভেন। আসলে আমরা একসময় একটা মৃত্যুমুখের নিচে থাকা শুরু করেছিলাম, না কি? আমি মনে করি এটি বিথোভেনের মৃত্যুমুখ ছিল। জীবনমুখ। দুঃখিত।
টেড হিউজ : আমি মনে করি বিথোভেন, উদাহরণস্বরূপ, যে কোনো মাধ্যমের যে কোনো একক শিল্পীর চেয়ে আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছে।
ওয়েন লিমিং : কীভাবে?
টেড হিউজ : আমার স্বভাব-প্রকৃতি গঠনে। আমি মনে করি তাকে একটা নির্দিষ্ট দিক দেওয়ায়, যা সে নিতে খুবই ঝুঁকেছিল।
ওয়েন লিমিং : অন্য কথায়, আপনি পছন্দ করেন তিনি যেভাবে অনুভব করেন, যেভাবে তিনি নিজের বাস্তবতা, তিনি যা দেখেছেন তা প্রকাশ করেন।
টেড হিউজ: এটি সতেরো বছর বয়স থেকে আমাকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করেছিল ছাব্বিশ বছর বয়স পর্যন্ত, যখন আমি সত্যিই আমার সব রেকর্ড আর গ্রামোফোন ইংল্যান্ডে রেখে এসেছিলাম। আর আমি জানি না এটি সরাসরি আপনার লেখাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, কিন্তু এটি নিশ্চিতভাবে আপনার কল্পনা এবং আপনার কল্পনার সুসংগততাকে প্রভাবিত করে।









