দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে বয়স্কদের

সংগৃহীত ছবি
প্রচণ্ড গরম, তীব্র শীত এবং ভারী বৃষ্টিপাতের মতো চরম আবহাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে মধ্যবয়সী ও বয়স্ক মানুষের। চরম আবহাওয়া শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং সরাসরি চাপ তৈরি করে বার্ধক্যজনিত হৃদযন্ত্রের ওপর। এ তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
হৃদরোগ ও চরম আবহাওয়া
চীনের ১৫৭টি শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন চীনের শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. ইয়া ফাং। গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তনের পর হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শহর ও ব্যক্তি উভয় স্তরেই একই প্রবণতা দেখা গেছে, যা আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলে ঝুঁকিকে।
তাপপ্রবাহে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (তাপমাত্রা পরিমাপের স্কেল) বেশি তাপমাত্রার দিনগুলো সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাপমাত্রার প্রতিটি অতিরিক্ত দিনে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে হৃদরোগের ঘটনা বেড়েছে ১ হাজার ১২৮টি। এ সময় শরীর স্বাভাবিকভাবে তাপ বের করতে পারে না। ফলে রক্ত সঞ্চালন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে হৃদযন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। প্রতিটি অতিরিক্ত গরম দিনে ব্যক্তিগত ঝুঁকি ৩ দশমিক ০.৪৪ শতাংশ করে বেড়েছে, যা ঠান্ডার তুলনায় অনেক বেশি।
পশ্চিম চীনের তুলনায় পূর্বের শহরগুলো কম আক্রান্ত হয়েছে, যার পেছনে আর্দ্রতা বা নগর পরিকল্পনা দায়ী হতে পারে।
তীব্র শীতে ভিন্ন প্রভাব
মাইনাস ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে তাপমাত্রা গেলে হৃদরোগের হার বাড়ে গড়ে ৩৯১টি (প্রতি ১ লাখে)। ঠান্ডায় রক্তনালি সংকুচিত হয়, রক্তচাপ ও সান্দ্রতা বেড়ে যায়, ফলে হৃদযন্ত্রকে বেশি চাপ দিয়ে পাম্প করতে হয়। ব্যক্তিগত ঝুঁকি বাড়ে মাত্র শূন্য দশমিক ১১০ শতাংশ। তবে বারবার ঠান্ডার সংস্পর্শে আসলে সেটি সঞ্চিত প্রভাব ফেলে।
ভারী বৃষ্টিতেও বাড়ে ঝুঁকি
প্রতিদিন প্রায় দুই ইঞ্চির বেশি বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রেও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়েছে। প্রতিটি অতিরিক্ত ভারী বৃষ্টির দিনে ব্যক্তিগত ঝুঁকি ১ দশমিক ৬২০ শতাংশ বাড়ে। হঠাৎ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন শরীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে যাদের স্বাস্থ্য আগে থেকেই দুর্বল।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
গবেষণায় দেখা গেছে, ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়। তাপপ্রবাহে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন অবসর বা অবসরোন্মুখ মানুষ, ধূমপায়ী ও উচ্চ ওজনযুক্ত এলাকার বাসিন্দারা।
শীতে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন উচ্চ ওজন, উচ্চতার অনুপাত থাকা ব্যক্তিরা।
ভারী বৃষ্টিতে বয়স্ক, গ্রামীণ, অবিবাহিত ও অবসর-নিকট মানুষ বেশি আক্রান্ত হন।
বায়ুদূষণ ও বার্ধক্যের প্রভাব
উচ্চ ওজন মাত্রা তাপ ও শীতের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে ধূমপান তাপপ্রবাহের সময় ঝুঁকি বাড়ায়। চীনে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ৪০ কোটির বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা এই ঝুঁকিকে আরও বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করবে।
স্থানীয় অবকাঠামো— যেমন সড়ক, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সবুজায়ন হৃদরোগের ঝুঁকিতে বড় ভূমিকা রাখে। উত্তর-পূর্ব চীনে ঝুঁকি বেশি দেখা গেলেও বৃষ্টির প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন।
গবেষকরা বলছেন, আবহাওয়া সতর্কবার্তার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোগ যুক্ত করা জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুদ, সবুজায়ন বাড়ানো, উন্নত আবাসন ও সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ করলে ক্ষতি কমানো সম্ভব।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান জার্নাল অব প্রিভেন্টিভ মেডিসিনে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম আবহাওয়া এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং রূপ নিচ্ছে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে।
সূত্র: আর্থডটকম

