বিছানা ছাড়ার পরও ক্লান্তি, আপনার ঘুমের অভ্যাস যে বার্তা দিচ্ছে

সংগৃহীত ছবি
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেও কি মনে হয় শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে? সারাদিন যেন মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে আর রাতে বিছানায় গেলেই চোখের পাতা এক হয় না? আমরা অনেকেই ভাবি এটা হয়তো বয়সের দোষ বা কাজের চাপ। কিন্তু বিখ্যাত ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিস্টোফার অ্যালেন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলছেন, আপনার ঘুমানোর এই অদ্ভুত অভ্যাসগুলো আসলে আপনার শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বড় কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে!
ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই দেখা যায় হাজারো সমাধান কেউ বলে এই পানীয় খান, কেউ বলে ৩০ সেকেন্ডের এই ব্যায়াম করুন; কিন্তু ডাক্তাররা বলছেন, আসল সমস্যা হয়তো আপনার ঘুমের নয়, বরং আপনার স্নায়ুতন্ত্রের। আপনার নার্ভাস সিস্টেম যখন সবসময় নিজেকে বিপদে আছে বলে মনে করে, তখনই শুরু হয় এই বিপত্তি।
অনেকেই বলে থাকেন, ‘ভাই ৮-৯ ঘণ্টা ঘুমালাম, তাও সকালে উঠে মনে হচ্ছে কেউ যেন পিটিয়ে রেখে দিয়েছে!’ ডা. অ্যালেন বলছেন, এটি মোটেও স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। এর মানে হলো আপনার শরীর ঘুমের মধ্যেও নিজেকে নিরাপদ ভাবছে না। মানসিক চাপের কারণে আপনার মস্তিষ্ক সারারাত সতর্ক থাকে, ফলে আপনি গভীর ঘুমে যেতে পারেন না।
আবার অনেকেই গর্ব করে বলে থাকেন, ‘আমার বালিশে মাথা দিলেই ঘুম চলে আসে।’ কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এটা আপনার কোনো গুণ নয়, বরং শরীরের এক চরম ক্লান্তির লক্ষণ। আপনার শরীর বিশ্রামের জন্য এতটাই হাহাকার করছে যে সে স্বাভাবিকভাবে ঘুমের ধাপে ধাপে যাওয়ার সময়ও পাচ্ছে না। এটি আসলে এক ধরনের অসুস্থতা।
আপনি হয়তো ভাবেন আপনি খুব ক্লান্ত, কিন্তু তবুও এক ঘণ্টা ধরে ফোন স্ক্রল করে যাচ্ছেন। এটা আসলে মোবাইলের নেশা নয়, বরং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে আপনার মস্তিষ্ক সত্যিকারের বিশ্রাম নিতে ভয় পাচ্ছে। তাই সে ডোপামিন হরমোনের লোভে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে আসল শান্তি এড়িয়ে চলছে।
ফ্যান বা এসি চলছে, তবুও রাত ২টা বা ৩টার দিকে ঘেমে-নেয়ে আপনার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে? এর জন্য নিজের লেপ বা কাঁথাকে দোষ দেবেন না। ডাক্তাররা বলছেন, এর আসল কারণ হলো শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক হরমোনের হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। আপনার শরীর ভাবছে সামনে কোনো বিপদ আছে, তাই সে ঘুমের মধ্যেই আপনাকে সতর্ক করে তুলছে।
সারাটা দিন আপনি দিব্যি কাজে ব্যস্ত থাকেন; কিন্তু আলো নেভানোর সঙ্গে সঙ্গেই কেন রাজ্যের দুশ্চিন্তা মাথায় এসে ভিড় করে? এর কারণ হলো সারাদিন আপনি যে দুশ্চিন্তাগুলো এড়িয়ে গেছেন, নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মস্তিষ্ক সেগুলো নিয়ে কথা বলা শুরু করেছে। দিনের চাপগুলো আপনি সময়মতো সমাধান না করায় সেগুলো এখন আপনার ঘুমের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকেরই অভ্যাস আছে ঘরে ফ্যান না চললে বা হালকা মিউজিক না থাকলে ঘুমাতে পারেন না। এর মানে হলো আপনার স্নায়ুতন্ত্র নীরবতাকে ভয় পায়। নিস্তব্ধ পরিবেশে গেলেই আপনার ভেতরে থাকা ভয় বা পুরনো কোনো মানসিক আঘাত সামনে চলে আসে, তাই মস্তিষ্ক সারাক্ষণ কোনো না কোনো শব্দ দিয়ে নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে চায়।
সারাদিন অফিস বা কাজে গিয়ে ঝিমুনি আসে, অথচ রাত ১০টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় শরীরে নতুন শক্তি এসেছে? ডাক্তাররা বলছেন, আপনি মোটেও ‘রাতজাগা পাখি’ নন। আপনার শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বা ঘড়িটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। সারাদিনের ভুল অভ্যাস আর উত্তেজনার কারণে আপনার শরীর রাতেও শান্তি পাচ্ছে না।
সারাদিন ক্লান্ত থাকার পর হঠাৎ রাতে শক্তির জোয়ার আসা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এটি আসলে শরীরের এক শেষ চেষ্টা। আপনার মস্তিষ্ক ভাবছে সে এখনো বিপদে আছে, তাই সে শেষবারের মতো শরীরে এনার্জি দিচ্ছে। এছাড়া অনেকক্ষণ ঘুমানোর পর আরও বেশি ক্লান্ত লাগা মানে হলো আপনার ঘুমের গভীরতা কম কিংবা আপনার ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে।
আপনার ঘুমের এই ছোট ছোট ভুলগুলো আসলে আপনার জীবনযাত্রার বড় কোনো সমস্যার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাই ঘুমের এই অস্থিরতা বা সারাক্ষণ ক্লান্ত থাকা মোটেও অবহেলা করবেন না। শরীর যদি সুস্থ রাখতে চান, তবে নিজের এই অভ্যাসগুলো বদলে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

