পাখি দেখলে কমে ডিমেনশিয়া

বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সাহায্য করতে পারে পাখি দেখা
পাখি দেখা কেবল নিছক সময় কাটানোর কোনো সাধারণ শখ নয়; বরং এটি আমাদের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বর্তমান সময়ে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের রোগীদের চিকিৎসায় থেরাপি হিসেবেও পাখি দেখার ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ফোর্জ মিল লেকের পাড়ে কিংবা জার্মানি ও আমেরিকার বিভিন্ন নার্সিং হোমে প্রবীণদের নিয়ে নিয়মিত পাখি দেখার বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ডিমেনশিয়ার কারণে যাঁদের অনেকে একটু আগের কথা ভুলে যান বা কথা বলতে কষ্ট পান, তাঁরাও দূরবীন হাতে নানা রঙের পাখি দেখলে বা গাছের ডালে পাখির লাফালাফি লক্ষ্য করলে দারুণ আনন্দ পান। এ সময় তাঁদের ভেতরের দুশ্চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দূর হয় এবং তাঁরা পুরোপুরি বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দিতে পারেন।
ইংল্যান্ডের ফোর্জ মিল লেকের কাঠের ঘরে প্রতি সপ্তাহে প্রবীণ মানুষেরা জড়ো হন। এই দলেরই একজন ৭৮ বছরের হ্যারল্ড (ছদ্মনাম)। যুবক বয়সে তিনি প্রকৃতি ভালোবাসতেন। কিন্তু এখন ডিমেনশিয়ার কারণে তিনি চুপচাপ থাকেন, দুশ্চিন্তায় ভোগেন। মেয়ে লুসি যখন তাঁকে এখানে নিয়ে আসেন, প্রথমে তিনি অস্বস্তিতে ছিলেন। কিন্তু কেউ একজন রবিন পাখি দেখালে তাঁর মুখে হাসি ফোটে। হাঁসের পানিতে ঝাপটাঝাপটি এবং ছোট নীল টিট পাখির লাফালাফি দেখে তিনি অনেক দিন পর শব্দ করে হেসে ওঠেন।এই দলটি পরিচালনা করে ‘এজ ইউকে’ নামের একটি সংস্থা। সেখানকার ডিমেনশিয়া উপদেষ্টা জেনি বুডিঞ্জার বলেন, ওই মুহূর্তে হ্যারল্ড পুরোপুরি বর্তমানে ছিলেন। স্মৃতি নিয়ে দুশ্চিন্তা বা আত্মবিশ্বাসের অভাব তাঁকে তখন স্পর্শ করেনি। যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নার্সিং হোমে এখন এ ধরনের দল তৈরি হচ্ছে। জানালা দিয়ে পাখি দেখলেও বয়স্করা অন্যদের সঙ্গে বেশি মিশতে পারেন, মন ভালো থাকে এবং স্মৃতিশক্তিও কিছুটা ভালো হয়।
বিজ্ঞান ও গবেষণায় দেখা গেছে, পাখি দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য ও বয়সের ক্ষয়রোধের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কানাডার টরন্টোর বেইক্রেস্ট একাডেমির গবেষক এরিক উইং একটি পরীক্ষা চালান। প্রথমে তিনি পরীক্ষা নিয়ে দেখেন, কারা পাখি চিনতে খুব দক্ষ আর কারা নতুন। এরপর পাখি চেনার সময় সবার মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করে দুই দলের তুলনা করেন। তিনি দেখলেন, দক্ষ পাখি-পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের যে অংশগুলো মনোযোগ ও দেখে চেনার কাজ করে, সেগুলো আলাদাভাবে সংযুক্ত। অচেনা পাখি চেনার সময় ওই অংশগুলো আরও বেশি সক্রিয় ছিল। একই বয়সের নতুনদের তুলনায় তাঁদের মস্তিষ্ক বেশি গোছানো। সাধারণত বয়স বাড়লে মস্তিষ্কের এই গোছানো ভাব কমে যায়, আর তার সঙ্গে চিন্তাশক্তিও কমতে থাকে। উইংয়ের ভাষায়, দক্ষদের মস্তিষ্কে এই গোছানো ভাব যেন "ধরে রাখা" হয়েছে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। মস্তিষ্কের এই পার্থক্য পাখি দেখার কারণে হয়েছে, নাকি আগে থেকেই এমন মস্তিষ্কের মানুষ পাখি দেখতে ভালোবাসেন, গবেষণা তা নিশ্চিত করে বলেনি। উইং মনে করেন, মস্তিষ্ক সারা জীবন নিজেকে বদলাতে পারে। নতুন কিছু শিখলে তার আকার ও কাজ বদলে যায়। তাই অল্প বয়সে এই দক্ষতা শিখলে তার উপকার বুড়ো বয়সেও থাকতে পারে। যে তরুণরা এখন দূরবীন হাতে পাখির পেছনে ছুটছেন, তাঁদের জন্য এটি ভালো খবর।
পাখি দেখে উপকার পেতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। পোল্যান্ডে ৩৮৮ জন পাখি-পর্যবেক্ষকের ওপর একটি গবেষণা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, পাখি দেখাকে যাঁরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন, তাঁরা মনে বেশি শান্তি ও সতেজতা পান। যাঁরা দক্ষ কিন্তু আগ্রহ কম, তাঁরা তুলনায় কম পান। অর্থাৎ দক্ষতার চেয়ে আগ্রহই বেশি কাজে আসে। জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এলিজাবেথ কালস ৬৫টি নার্সিং হোমের বাইরে পাখির খাবার রাখার জায়গা তৈরি করেন। ভেতরের বসার ঘর থেকেই বাসিন্দারা পাখি দেখতে পেতেন। এরপর কর্মী, পরিবার ও বাসিন্দাদের কথার ভিত্তিতে তাঁদের চিন্তাশক্তি, চলাফেরা ও মন ভালো থাকা যাচাই করা হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উন্নতি দেখা যায়। এক মাস পর দেখা গেল, বাসিন্দাদের ভালো থাকার পেছনে বয়স বা পরিচর্যার মাত্রার চেয়ে পাখি দেখাই বড় ভূমিকা রাখছে। কালস বলেন, ফলাফল ছিল স্পষ্টভাবে ইতিবাচক। যাঁদের মুখে দীর্ঘদিন হাসি দেখা যায়নি, হঠাৎ তাঁদের মুখে হাসি ফুটতে দেখেন কর্মীরা। কখনও কখনও মাত্র তিন-চার সপ্তাহেই স্মৃতি ও মনোযোগের উন্নতি চোখে পড়েছে। গবেষণার শুরুতে যে জার্মান স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানিগুলো টাকা দিয়েছিল, তারা এখন বাভারিয়া অঞ্চলের ৪০০-র বেশি নার্সিং হোমে পাখির খাবার ও পাখি দেখার জায়গা তৈরি করছে। কালস বলেন, এটি এত কার্যকর ছিল যে উল্টো খরচ বেঁচে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসায় ও থেরাপিতেও এর দারুণ সাফল্য দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৩ সালে কানেকটিকাটের চারটি কেয়ার কমিউনিটিতে ‘বার্ড টেলস’ নামে একটি থেরাপি শুরু হয়। পরে তা টেক্সাস ও কলোরাডোতেও ছড়ায়। এতে ডিমেনশিয়ার রোগীরা যেখানে থাকেন, সেখানে পাখির খাবার রাখা হয়। তাঁদের পাখির মতো ডাকা নরম খেলনা পাখিও দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা বিভিন্ন পাখির সম্পর্কে জানতে পারেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, এতে তাঁদের মস্তিষ্ক সচল থাকে এবং পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে। স্ট্রোকের পর অনেকের কথা বলতে বা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হয়, একে বলে অ্যাফেসিয়া। মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রোগীদের জন্যও পাখি নিয়ে একটি কর্মসূচি চলছে। ২০২১ সালে পেঁচা দেখা দিয়ে শুরু হয়েছিল। এখন সেখানে মন্টানার নানা পাখি দেখা এবং তাদের ডাক চেনাও আছে। এতেও ভালো ফল মিলেছে।
কালসের মতে, ব্যাপারটা শুধু পাখির নয়। প্রকৃতি, মনোযোগ, অনুভূতি, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এবং কিছু করার আনন্দ, সব এখানে খুব সহজভাবে একসঙ্গে মিলে যায়। এতে মনে ছোট ছোট কৌতূহল, আনন্দ আর অপেক্ষার মুহূর্ত তৈরি হয়। আর এটি করা খুবই সহজ। যুক্তরাজ্যে ডিমেনশিয়ার রোগী ও তাঁদের যত্নকারীদের নিয়ে একটি জরিপ হয়েছে। সেখানে প্রকৃতির মধ্যে হাঁটার পরেই সবচেয়ে জনপ্রিয় কাজ ছিল পাখি ও বন্যপ্রাণী দেখা। ওই জরিপেই দেখা গেছে, বাইরে যাওয়ার ঝামেলা ডিমেনশিয়ার রোগীদের জন্য বড় সমস্যা। কিন্তু রান্নাঘরের জানালা থেকেও যাঁরা পাখি দেখতে পারেন, তাঁদের এই সমস্যা হয় না। উইং বলেন, পাখি দেখা আসলে কৌতূহল মেটানোর একটা উপায়, আর সম্ভবত সেই কৌতূহলই সবচেয়ে উপকারী। মাঝবয়স ও তার পরেও জীবনে নতুন কিছু আনা ভালো। গবেষকদের ধারণা, কৌতূহল জাগলে মস্তিষ্কে নরএপিনেফ্রিন ও ডোপামিন নামের দুটি রাসায়নিক সক্রিয় হয়, যা মস্তিষ্কের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। তাই বয়স হলেও চিন্তাশক্তি ধরে রাখতে কৌতূহলের বড় ভূমিকা থাকতে পারে। কালস বলেন, "আমরা মানুষ প্রকৃতিরই অংশ, কিন্তু জীবনের খুব আগেই সেই সংযোগ হারিয়ে ফেলি। পাখি দেখা সেই সংযোগ ফিরিয়ে আনার একটি সহজ পথ।"
সূত্র: বিবিসি, এনবিসি নিউজ ও ডিসকভার ওয়াইল্ডলাইফ।





