গরমে শরীর ঠান্ডা রাখবেন যেভাবে

গরমের দাবদাহ ভুক্তভোগী এক নারী। ছবি: এআই
এই গরমে হুমায়ূন আহমেদ রচিত হিমু চরিত্রের মতো আপনারও কি মন চায়, এক বাথটব বরফপানিতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে? পিচগলা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কিংবা জানলার বাইরে গনগনে রোদের দিকে তাকিয়ে এই পাগলাটে ইচ্ছেটা মাঝে মাঝেই উদয় হয় আমার মনে।
কিন্তু কল্পনা আর বাস্তবের মাঝে যে বিস্তর ফারাক! প্রতিদিন বাথটবভর্তি বরফ জোগাড় করা যেমন প্রায় অসম্ভব, তেমনি চিকিৎসাবিজ্ঞানও হয়তো এমন আকস্মিক শীতলতায় সায় দেবে না। তাহলে উপায়? এই গরম থেকে মুক্তির কি কোনো সহজ পথ নেই? আছে, এবং সেই শীতল আশ্রয় লুকিয়ে আছে আমাদের খুব কাছেই—রান্নাঘরের তাকে আর প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাসের ভাঁজে। চলুন, হিমুর সেই কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে জেনে নিই শরীর ও মনকে ঠান্ডা রাখার কিছু বাস্তব এবং অব্যর্থ কৌশল।
যে খাবারগুলো শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখে
গরমকালে আমাদের হজমশক্তি কিছুটা কমে যায় এবং শরীর থেকে প্রচুর পানি ও খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। তাই এমন খাবার বেছে নেওয়া উচিত যা হালকা, সহজপাচ্য এবং শরীরকে শীতল রাখে।
গরমের সেরা বন্ধু হলো পানি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি। এগুলো শরীরকে ডিহাইড্রেশনের হাত থেকে বাঁচায় এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে। এমন কিছু ফল, সবজি ও খাবার হচ্ছে
শসা: প্রায় ৯৫ শতাংশ জলীয় হওয়ায় শসা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে অসাধারণ কাজ করে। এটি শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতেও সাহায্য করে।
তরমুজ: রসালো ও মিষ্টি এই ফলটি কেবল তৃষ্ণা মেটায় না, লাইকোপিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে যা ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচায়।
লাউ, ঝিঙে, চিচিঙ্গা: এই সবজিগুলো হজম করা খুব সহজ এবং এদের মধ্যে পানির পরিমাণও অনেক বেশি। গরমে এদের ঝোল বা তরকারি পেটকে আরাম দেয়।
টক দই: প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ টক দই গরমের জন্য একটি আদর্শ খাবার। এটি হজমশক্তি উন্নত করে এবং শরীরকে ভেতর থেকে শীতল করে। সরাসরি টক দই, কিংবা ঘোল, লস্যি বা রায়তা বানিয়ে খেতে পারেন। এটি আপনাকে তাৎক্ষণিক শক্তিও জোগাবে।
ডাবের পানি: এই পানিকে বলা হয় প্রকৃতির নিজস্ব স্যালাইন। গরমে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইটস (সোডিয়াম, পটাশিয়াম) ফিরিয়ে আনতে ডাবের জলের কোনো তুলনা নেই। এটি ক্লান্ত শরীরকে মুহূর্তেই চাঙ্গা করে তোলে।
পুদিনা পাতা: এই পাতা এর মধ্যে থাকা মেন্থল শরীর ও মনে এক শীতল অনুভূতি এনে দেয়। জলের সঙ্গে কয়েকটি পুদিনা পাতা, লেবুর রস বা চাটনি বানিয়ে খেলে গরমে দারুণ আরাম পাওয়া যায়।
কাঁচা পেঁয়াজ: বিশ্বাস না হলেও সত্যি, কাঁচা পেঁয়াজ শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা কোয়ারসেটিন নামক উপাদান হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে কার্যকর। তাই দুপুরের খাবারের সাথে স্যালাডে কাঁচা পেঁয়াজ রাখতে পারেন।
গরমে কী এড়িয়ে চলবেন?
অতিরিক্ত তেল, মসলাযুক্ত ও ভাজা খাবার।
রেড মিট বা চর্বিযুক্ত মাংস, কারণ এগুলো হজম করতে শরীরে বেশি তাপ উৎপন্ন হয়।
অতিরিক্ত চা, কফি এবং কোমল পানীয়, কারণ এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে তোলে।
যে অভ্যাসগুলো গরমে আরাম দেবে
শুধু খাবার নয়, দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু ছোট পরিবর্তন আনলেই গরমে সুস্থ থাকা যায়।
পোশাক নির্বাচন: হালকা রঙের, বিশেষ করে সাদা, হালকা নীল বা হলুদ রঙের পোশাক পরুন। এই রংগুলো সূর্যের তাপ শোষণ না করে প্রতিফলিত করে। সুতির এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরলে শরীরে হাওয়া চলাচল করতে পারে, ফলে আরাম পাওয়া যায়।
সঠিক সময়ে বাইরে যাওয়া: দিনের সবচেয়ে গরম সময়, অর্থাৎ সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে বা ছায়ায় থাকার চেষ্টা করুন। একান্তই বাইরে যেতে হলে ছাতা, টুপি, স্কার্ফ ও সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান: তৃষ্ণা না পেলেও নিয়ম করে জল পান করুন। দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস জল খাওয়া আবশ্যক। বাইরে বেরোলে সঙ্গে অবশ্যই জলের বোতল রাখুন।
গরমকাল মানেই শুধু কষ্ট আর অস্বস্তি নয়। সঠিক খাবার আর কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই এই ঋতুকেও পুরোপুরি উপভোগ করা যায়। শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখুন আর বাইরে থেকে সতেজ থাকুন। এই গরমে সুস্থ থাকুন, প্রাণবন্ত থাকুন।


