গরমে লোডশেডিং, অসহ্য পরিস্থিতি সামলাবেন যেভাবে

লোডশেডিংইয়ের মধ্যে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে মাধ্যমিক পরীক্ষার শিক্ষার্থী। ছবি: এআই
গ্রীষ্মের দাবদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, ঠিক তখনই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আসে লোডশেডিং। দিনের কাজের সময় হোক বা রাতের প্রশান্তির ঘুম, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে যে কী অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা আমরা সবাই জানি। এদিকে আবার সারা দেশে চলছে মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়ে ঘামে ভেজা শরীর, দমবন্ধ করা পরিবেশ আর অন্ধকারে শুধু শারীরিক অস্বস্তিই বাড়ে না, মানসিক চাপও বাড়ে। এতে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, দেখা দেয় স্বাস্থ্যঝুঁকি।
প্রস্তুতি পর্ব
তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, কিছু প্রস্তুতি এবং কৌশল আমাদের স্বস্তি দিতে পারে। আসুন জেনে নিই গরমে লোডশেডিংয়ের সময় কী কী করণীয়।
লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা কমাতে সবচেয়ে জরুরি হলো পূর্বপ্রস্তুতি। কিছু বিষয় আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলেও দিশেহারা হতে হবে না
চার্জ দিয়ে রাখুন : আপনার মোবাইল ফোন, পাওয়ার ব্যাংক, চার্জার ফ্যান এবং চার্জার লাইট বা িই ইমার্জেন্সি ল্যাম্প সব সময় সম্পূর্ণ চার্জ দিয়ে রাখুন। কখন বিদ্যুৎ যাবে, তার জন্য অপেক্ষা করবেন না।
পানি সংরক্ষণ : বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক বাড়িতেই পানির পাম্প চলে না। তাই একটি বড় বালতি বা ড্রামে আগে থেকেই পানি জমিয়ে রাখুন। পর্যাপ্ত পানীয় জলও সংরক্ষণ করুন।
জরুরি কিট তৈরি করুন : একটি নির্দিষ্ট জায়গায় মোমবাতি, দিয়াশলাই বা লাইটার, টর্চলাইট এবং অতিরিক্ত ব্যাটারি গুছিয়ে রাখুন। প্রয়োজনে ফার্স্ট এইড বক্সও হাতের কাছে রাখতে পারেন।
হালকা খাবার : গরমে এমনিতেই হালকা খাবার খাওয়া উচিত। লোডশেডিংয়ের সময় সহজে হজম হয় এমন খাবার এবং ওরাল স্যালাইন, লেবুর শরবত বা ডাবের পানির মতো পানীয় হাতের কাছে রাখুন।
লোডশেডিং চলাকালীন করণীয়
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মনে বিরক্তি ও অস্থিরতা কাজ করে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করলে বা মেজাজ গরম করলে শরীর আরও বেশি উত্তপ্ত হয়। তাই প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নিজেকে শান্ত রাখা। যে কাজ করছিলেন, তা থেকে সাময়িক বিরতি নিন। ঘরের সবচেয়ে খোলামেলা জায়গা, যেমন বারান্দা বা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। অন্ধকার ঘরে তাড়াহুড়ো করে কিছু খুঁজতে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে এবং শরীর অকারণে ঘেমে যায়। একটি শান্ত মনই এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রথম ধাপ।
শরীর ঠান্ডা রাখার উপায়
হালকা পোশাক : সুতির, হালকা রঙের এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। এটি শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
ভেজা কাপড়ের ব্যবহার : একটি ভেজা তোয়ালে বা গামছা ঘাড়ে, কপালে বা হাতে-পায়ে জড়িয়ে রাখুন। এটি দ্রুত শরীর শীতল করে।
ঠান্ডা পানিতে গোসল : সম্ভব হলে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নিন। এতে শরীর সতেজ হবে এবং গরমের অনুভূতি অনেকটাই কমে যাবে।
হাতপাখার ব্যবহার : চার্জার ফ্যান না থাকলে হাতপাখাই হতে পারে আপনার সেরা বন্ধু। বাতাস চলাচল শরীরকে ঠান্ডা রাখে।
ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল
পর্দা টেনে দিন : দিনের বেলায় ঘরের জানালা বা দরজার পর্দা টেনে রাখুন। বিশেষ করে যেসব দিকে সরাসরি রোদ আসে, সেদিকের পর্দা অবশ্যই টেনে দেবেন। এতে বাইরের গরম ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
সন্ধ্যায় জানালা খুলুন : দিনের গরম কমে গেলে বা সন্ধ্যার পর যখন বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করে, তখন ঘরের দরজা-জানালা খুলে দিন। এতে ঘরে জমে থাকা গরম বাতাস বেরিয়ে যাবে এবং প্রাকৃতিক বাতাসে ঘর ঠান্ডা হবে।
বরফের ব্যবহার : একটি বাটিতে কয়েক টুকরো বরফ নিয়ে তা চার্জার ফ্যানের সামনে রাখুন। ফ্যানের বাতাসে বরফ গলা পানির ঠান্ডা বাষ্প ছড়িয়ে পড়ে ঘরকে একটি প্রাকৃতিক এয়ারকুলারের মতো ঠান্ডা করবে।
নিচের তলায় থাকুন : তাপ সব সময় উপরের দিকে ওঠে। তাই সম্ভব হলে বাড়ির উপরের তলার চেয়ে নিচের তলায় বেশি সময় কাটান।
বিশেষ সতর্কতা
শিশু ও বয়স্কদের যত্ন : বাড়ির শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ সদস্যদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখুন। তাদের শরীর যেন পানিশূন্য না হয়ে যায়, সেদিকে লক্ষ রাখুন এবং তাদের আরামের ব্যবস্থা করুন।
খাবারের সুরক্ষা : লোডশেডিংয়ের সময় বারবার ফ্রিজের দরজা খুলবেন না। এতে ভেতরের ঠান্ডা বেরিয়ে যায় এবং খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সুরক্ষা : বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর টিভি, কম্পিউটার, ফ্রিজের মতো মূল্যবান বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সুইচ বন্ধ করে দিন বা প্লাগ খুলে রাখুন। কারণ বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় ভোল্টেজ ওঠা-নামার কারণে যন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।
লোডশেডিং একটি জাতীয় সমস্যা এবং এর সমাধান সময়সাপেক্ষ। কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি এই কঠিন সময়ে টিকে থাকতে সাহায্য করে। নিজের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশীরও খোঁজখবর নিন, বিশেষ করে যারা একা থাকেন বা অসুস্থ। একে অপরের সাহায্যে এই অসহনীয় গরম আর লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।

