ননি ফলের কাছে ফেরা

ননি ফল
কথার
একপর্যায়ে তিনি কাচের একটি বোতল হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এটি ননি ফলের রস। অনেকেই একে
ক্যানসার প্রতিরোধে উপকারী মনে করেন।’ তারপর যেন গল্পের রঙ আরও গাঢ় করতে যোগ করলেন—
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম নাকি নিয়মিত এই রস পান করতেন। বোতলটি
হাতে নিয়েছিলাম, কিন্তু সেদিন ননি ফলকে নয়, বরং মানুষটির বিশ্বাস আর আন্তরিকতাকেই বেশি
মনে ধরেছিল। তারপর দিন গড়িয়েছে, ঋতু বদলেছে। ননির কথা স্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল।
আবার একদিন তার দেখা মিলল। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বীরউত্তম শহীদ মাহবুব সেনানিবাসের বৈশাখী মেলায়। মানুষের ভিড়, রঙিন দোকান আর উৎসবের আবহের মাঝখানে একটি ছোট্ট চারা আমার দৃষ্টি আটকে দিল। তার গায়ে লেখা— ‘ননি ফল’, দাম ৬০০ টাকা। কিনতে পারিনি কিন্তু অদ্ভুতভাবে চারাটি যেন মনে একটি বীজ বুনে দিয়েছিল। সেই বীজের নাম কৌতূহল। তারপর শুরু হলো খোঁজ। এক নার্সারি থেকে আরেক নার্সারি। অবশেষে রংপুরের একটি পরিচিত নার্সারিতে মিলল বহু প্রতীক্ষিত সেই চারা। মনে হয়েছিল, বহুদিনের হারানো কাউকে যেন ফিরে পেয়েছি। চারাটি এনে রোপণ করলাম কর্মস্থল পায়রাবন্দের বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে। মাটিতে বসিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়নি। প্রতিদিনের যত্ন, পানি, আগাছা পরিষ্কার— সব মিলিয়ে গাছটি যেন অজান্তেই আপন হয়ে উঠল।
ননি কোনো বাহারি ফল নয়। এর চাকচিক্য নেই, নেই বাজারের জনপ্রিয় ফলগুলোর মতো আকর্ষণ। কিন্তু তার নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। চিরসবুজ এই ছোট গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Morinda citrifolia। পৃথিবীর নানা দেশে এটি ইন্ডিয়ান মালবেরি, গ্রেট মরিন্দা, চিজ ফ্রুট কিংবা পেইনকিলার ট্রি নামে পরিচিত। আমাদের দেশেও কেউ বলে মরিন্দা, কেউ হুরদি, কেউ আবার রঙ-কাঁঠাল।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ননি শুধু ফল হিসেবেই নয়, মানুষের জীবনযাপনের নানা প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর শিকড় ও কাণ্ড থেকে তৈরি হয়েছে কাপড় রাঙানোর লাল-হলুদ রঙ। বীজ থেকে পাওয়া তেল ব্যবহার হয়েছে ত্বকের পরিচর্যায়। পাহাড়ি জনপদের মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী লোকজ চিকিৎসায় গাছটির নানা অংশ ব্যবহার করে আসছেন বহুদিন ধরে।
আধুনিক গবেষণায়ও ননি ফলের পুষ্টিগুণ নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে। এতে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ উপাদান এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে ক্যানসারসহ জটিল রোগ নিরাময়ে ননির কার্যকারিতা শোনা গেলেও এখনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিকভাবে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই একে ওষুধের বিকল্প নয়, বরং সম্ভাবনাময় একটি পুষ্টিকর ফল হিসেবেই দেখা উচিত।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক




