অ্যান্টার্কটিকার রহস্যময় ডাকঘরের পর্দার আড়ালের জীবন

অ্যান্টার্কটিকার নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অন্তহীন বরফের দিগন্ত, সাদা-কালো পেঙ্গুইনের হাঁটাহাঁটি আর কামড় বসানো হিমশীতল দমকা হাওয়া। যেখানে মানুষের টিকে থাকাই বিস্ময়ের কাছাকাছি।
কিন্তু সেই মৃত্যুশীতল নীরবতার মাঝেও আছে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত এক পরবাস, একটি ডাকঘর। দূরবর্তী বরফময় মহাদেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট কাঠের ঘরটিকেই বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে দুর্গম ডাকঘর, যার ঠিকানা অ্যান্টার্কটিকার পোর্ট লকরয়।
বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু এই আপাত বসবাস অযোগ্য জায়গায় প্রতি গ্রীষ্মে কাজ করেন ৪-৫ জন মানুষ। তাঁরা চিঠি পাঠান, তুষার ঝাড়েন, পেঙ্গুইন গোনেন, আর নিত্যদিনের জীবন কাটান এমন এক ভূমিতে, যেখানে মোবাইল সিগন্যাল নেই, ইন্টারনেটের ছায়াও নেই, এমনকি ঢালাই করা বাথরুমেও নেই ফ্ল্যাশ করার সুযোগ। তবু পৃথিবীর লাখো মানুষের কৌতূহল জাগান এই ডাকঘরের গল্প, কারণ এর প্রতিটি দিন রচিত হয় প্রকৃতির চূড়ান্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের অবিচল জয়ের নেশায়।
পোর্ট লকরয়ের ইতিহাস যতটা কঠোর, তার জন্ম ততটাই রোমাঞ্চে মোড়া। অ্যান্টার্কটিকার গওডিয়া দ্বীপে অবস্থিত এই উপসাগরটি প্রথমদিকে ছিল তিমি শিকারিদের আশ্রয়স্থল। উনিশ শতকের শেষদিকে জার্মান অভিযাত্রী এডওয়ার্ড দালমান এর খোঁজ পান; পরে বেলজিয়ান অভিযাত্রী আদ্রিয়েঁ দ্য গারলাশে এটি নথিভুক্ত করেন। কিন্তু জায়গাটি বড় করে ছড়িয়ে পড়ে ফরাসি অভিযাত্রী জন ব্যাপ্টিস্ট তুশাক্কোতের মাধ্যমে, যিনি তাঁর সমর্থক রাজনীতিবিদ এদোয়ার লকরয়ের নামানুসারে পোর্ট লকরয় নামটি বেছে নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি পরিণত হয় ব্রিটিশদের গোপন সামরিক ঘাঁটিতে— শীতল যুদ্ধের প্রথম নিঃশব্দ পদচারণার স্মৃতিবাহক হয়ে দাঁড়ায় জায়গাটি।
যুদ্ধ শেষে এটি হয়ে ওঠে গবেষণাকেন্দ্র, ১৯৬২ সালে কার্যক্রম থেমে গেলে বহুদিন নিস্তব্ধ পড়ে থাকে। এরপর ইউকে অ্যান্টার্কটিক হেরিটেজ ট্রাস্ট জায়গাটি পুনরুদ্ধার করে, ১৯৯৮ সালে অ্যান্টার্কটিকা ট্রিটির আওতায় একে ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় পোর্ট লকরয়ের দ্বিতীয় জীবন, একটি মিনি–জাদুঘর, একটি ক্ষুদ্র গিফট শপ এবং সেই বিখ্যাত ডাকঘরকে কেন্দ্র করে ঝুলে থাকা হাজার গল্পের পুনর্জন্ম।
আজ যারা এখানে কাজ করেন, তাঁরা প্রতি মৌসুমেই নতুন। কারণ শীতে জায়গাটি মানুষের থাকার অক্ষম। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে, অ্যান্টার্কটিকার সামান্য গলাগলা গ্রীষ্মে, চার থেকে পাঁচজন মানুষের একটি ছোট দলকে পাঠানো হয় ডাকঘরটি পরিচালনা করতে। তাঁরা বরফের দুনিয়ায় কাটান একটানা পাঁচ মাস—নেই কোনো দৈনন্দিন আরাম, নেই বাহুল্য, আছে কেবল কাজ আর অন্তহীন সাদা নীরবতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য যাত্রা।আগের মৌসুমে ক্লেয়ার ব্যালেন্টাইন, লুসি ব্রাজোন, নাতালি করবেট ও মাইরি হিলটনেরা এই কঠিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন— একসময় এখানকার পেঙ্গুইনের সংখ্যা গুনেছেন, দালান বরফমুক্ত করেছেন, আর পাঠিয়েছেন পৃথিবীর প্রায় ৮০ দেশের মানুষকে ৮০ হাজার পোস্টকার্ড। তাঁদের জায়গায় এখন নতুন মুখ এসেছে— প্রতি বছরই যারা এখানে আসে, তারা নিজেদের গল্প লিখে যায় নতুন করে।
অ্যান্টার্কটিকায় জীবন মানেই সীমাহীন ত্যাগ। টয়লেট আছে কিন্তু সেটিতে পানি ঢেলে ফ্ল্যাশ করা যায় না, পানীয়জল আসে গলন্ত বরফ থেকে, গোসল সপ্তাহে একবার করাই সাফল্য ধরা হয়, আর বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ? মাঝে মাঝে কোনো গবেষণা জাহাজ পাশ কাটিয়ে গেলে তবেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন। রাত বলে কিছু নেই, দিনের মধ্যেই সূর্য ঘুরে ঘুরে থাকে আকাশের মাথায়। আর মাঝরাতে যদি দমকা হাওয়া ওঠে, তাহলে ক্ষুদ্র ঘরগুলোর ভেতরেও মনে হয় বরফের পর্বত হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।
কোনো কোনো মৌসুমে তো এমনও হয়েছিল— ডিসেম্বরের শুরুর দিকে এত তুষার পড়েছিল যে পোর্ট লকরয়ের সব ঘর বরফে চাপা পড়ে যায়। যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর জাহাজ এইচএমএস প্রটেক্টর ছুটে এসে বরফ খুঁড়ে উদ্ধার করে ডাকঘর, জাদুঘর আর গিফট শপের পথ।
মাঝখানে একবার কাজ শেষে জানা যায়—ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই কঠিন সময়টিও আজ পোর্ট লকরয়ের কিংবদন্তির অংশ।
ডাকঘরে কাজের ভেতরেও আছে বিস্ময়। পৃথিবীর চারদিক থেকে আসা দর্শনার্থীরা শখ করে এখানে পোস্টকার্ড পাঠান, আর কর্মীদের সেই কার্ড সাজিয়ে রাখা, সিল মারা এবং বিভিন্ন দেশের ঠিকানায় পাঠানোর এক বিরামহীন দায়িত্ব থাকে। চিঠিপত্রের পাশাপাশি তাঁদের আরেক কাজ— পোর্ট লকরয়ের গেনটু পেঙ্গুইন উপনিবেশ মনিটর করা। পাখিগুলো কতটা বংশবৃদ্ধি করছে, কতগুলো বাসা সক্রিয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনে জনসংখ্যার ওঠা-নামা কেমন— সব নথিভুক্ত করতে হয়। এই কারণে জায়গাটিকে পেঙ্গুইন ডাকঘর নামেও ডাকা হয়। মানুষ আর পেঙ্গুইনের এই অদ্ভুত সহাবস্থান পৃথিবীর কোথাও নেই অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া।তবু এত প্রতিকূলতার মাঝেও যারা এখানে আসে, তারা কেউ আফসোস করে না। অনেকেই বলেন, এ যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে নিজের সঙ্গে নিজের একাকী মধুচন্দ্রিমা। কেউ বলেছেন, দুনিয়ার সব শব্দ থেকে দূরে এসে বরফের ফিসফিসে রাতগুলো মানুষকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়। আর কেউ তো সোজাসাপ্টা বলেছেন— পেঙ্গুইনে ভরা একটি দ্বীপে পাঁচ মাস থাকতে কারোরই ভালো লাগে না!
পরের মৌসুমে আবার নতুন দল আসবে, নতুন পায়ের শব্দ পড়বে বরফের প্রান্তরে, আর নতুন গল্প জমা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচিত্র ডাকঘরের দোরগোড়ায়। শত বিপদ–বাধা সত্ত্বেও পোর্ট লকরয় বেঁচে থাকবে, কারণ মানুষ বিস্ময় খুঁজে পাওয়ার ক্ষুধা আজও হারায়নি। দূরত্ব যতই হোক, এখানে পৌঁছে যায় পৃথিবীর কৌতূহল; বরফের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট সেই ডাকঘর যেন মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যতই দূরে যাক, গল্প আর আবেগের চিঠি সব শেষে পৌঁছে যায়।
সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার, বিবিসি, ভেইল ম্যাগাজিন

