দুই চাকায় মালয়েশিয়া-২
জিত্রা টু কুপাং-১১১ কিলোমিটার

সুংগাই পেনডাং নদীর উপর অবস্থিত তিতি মেরাহ লিভারপুল বা লিভারপুল সেতু
আগের রাতে আসা-যাওয়া মিলিয়ে ছয় কিলোমিটার হেঁটে একটা সিম কিনেছিলাম। ঘটনা হলো আমরা মানুষ দুজন হলেও সিম ছিল একটা। সেটাও বাংলাদেশ থেকে এক বন্ধুবরের দেওয়া। তিনজনে মিলে একটা সিম কেনার ঘটনা নিকট অতীতে আছে আমাদের! গত দুদিন একটা সিমেই চলছিল আমাদের। তবে পাহাড়ি রাস্তায় দুই সাইকেলের সওয়ারির মধ্যে দূরত্ব বাড়লে মুশকিলে পড়তে হবে ভেবেই আরেকটা সিম কেনা।
সেল্ফ রেজিস্ট্রেশন করতে কাউন্টার থেকে বলে দিলেও ভোরে রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, বিদেশিদের ক্ষেত্রে নিজে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ নেই। এর চেয়ে অ-সিম অবস্থাতেই ভালো ছিলাম! তিন কিলোমিটার গিয়ে সকাল সকাল ফের সেভেন-ইলেভেন এ কড়া নাড়লাম। ক্যাশ কাউন্টারের মেয়েটা ইংরেজিতে ক-অক্ষর গোমাংস। কিন্তু পরিচ্ছন্নতাকর্মী গোলগাল ছেলেটা ইংরেজি বোঝে আর অল্পস্বল্প বলতে পারে। ও-ই উদ্ধার করল এ যাত্রা।
প্যাডেলে পা রেখে একটু এগোতেই পড়ল দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্য রীতিতে তৈরি মন্দির শ্রী মুরুগান আলায়াম। শিব-পার্বতী তনয় কার্তিক পূজিত হন এখানে। জিত্রা শহরের রাস্তার ধারে প্রচুর কনকচূড়া গাছ। গাছের তলা আলো করে হলুদ পাপড়ি কালো পিচের উপর বিছিয়ে আছে। মাঝে মাঝেই 'দৌলত টুয়াংকু' লেখা সাইনবোর্ড পড়ছে। মালয় ভাষায় এই শব্দাবলি দিয়ে রাজার দীর্ঘজীবন কামনা করা হয়। জিত্রার সড়কে প্রচুর ট্রাফিক। দুটো মোড় নির্বিঘ্নে পেরোলে পরের ট্রাফিক সিগন্যালের লালবাতিতে থামতেই হয়। টানা চালানোর সুযোগই নেই। থমকে থমকে এগোনো।
শহর ছাড়াতেই ছোট ছোট ক্যাম্পুং বা গ্রাম পড়ছে পথে। অবশ্য প্রাচুর্যের দিক থেকে আমাদের দেশের গ্রামের মতো নয় মালয় গ্রামগুলো। খুব গোছানো প্রতিটা বাড়ি। বাড়ির সামনে চিলতে উঠোন। উঠোনে কমপক্ষে একটি বা দুটি গাড়ি; অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুইয়ের অধিক গাড়িও থাকে। কুবু ব্রিটিশ বলে একটা জায়গা থেকে মূল সড়ক ছেড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম যেন। প্রচুর গাড়ি আর ট্রাফিক সিগন্যাল-দুটো থেকেই মুক্তি মিলল। পথের পাশেই ৩০ কোম্পানির সেনানিবাস। একটাও উঁচু স্থাপনা নেই; সব একতলা বাড়ি। আমাদের দেশের সেনানিবাসগুলোর মতো কড়াকড়িও নেই।
ছিমছাম একটা ছোট্ট রাস্তা ধরে পথ চলছি। ক্যান্টনমেন্টের শেষ মাথায় ছোট্ট কিন্তু সুন্দর একটা টানেল। এগোতেই পথের দুপাশে সুন্দর সব মালয় স্টাইলের কাঠের বাড়ি। মালয়েশিয়ার গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়াকে মাথায় রেখেই কাঠের এসব বাড়ি বানানো শুরু হয়েছিল। খানিক এগোতেই ফাঁকা জমি। দেখেই বোঝা যায় চাষাবাদের জন্য এসব জমিকে নির্বৃক্ষ শ্মশান বানানো হয়েছে। পথের একপাশে একসারি ধানখেত আর এর পেছনে পাহাড়। পথে 'পানতাই জামাই' নামক একটা জনপদ পড়ল। বাংলার জামাই মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে ওখানে কী করে এলো কে জানে!
টানা চালিয়ে লঙ্ঘর। কোথাও অবশ্য পীড়িতদের জন্য অন্নের ব্যবস্থা দেখা গেল না লঙ্ঘর নামের এই গোটা জনপদজুড়ে। তবে লঙ্ঘরের আশেপাশে যেদিকেই চোখ যায়, খালি ধানখেত আর ধানখেত। কিছুটা এগিয়ে মূল রাস্তা ছেড়ে ডানের ছোট রাস্তা ধরলাম। এখানেই সুংগাই পেনডাং নদীর উপর অবস্থিত তিতি মেরাহ লিভারপুল। বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় লিভারপুলের লাল ছোট্ট ব্রিজ।
শতবর্ষেরও বেশি সময় আগে লিভারপুলের টিউবরাইটস লিমিটেড নামক কোম্পানির কাছ থেকে ইস্পাত এনে বানানো হয় এই লাল পুল। সেই থেকে এটি পরিচিত লিভারপুল সেতু নামে। পরবর্তীতে কোন এক সমর্থক লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের লোগো বসিয়ে গেছে লরির পোক্ত একটা টায়ারের উপর। আমি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফ্যান হলেও ব্যাপারটায় বেশ আনন্দ পেলাম। সুংগাই পেনডাং নদীর জল ছানি পড়া বৃদ্ধের ন্যায় ঘোরালো। সাথে জলে ভাসছে প্রচুর পরিমাণ কচুরিপানা।
কিছুটা এগিয়ে রাস্তার ধারেই ধাবা টাইপ একটা রেস্তোরাঁতে নাশতার জন্য থামলাম। প্রচুর খাবারের আইটেম থরে থরে সাজানো আছে। এখানে খাওয়ার সিস্টেমটা কী সেটা মধ্যবয়ষ্কা দোকানি নারীকে বোঝাতে গলদঘর্ম হতে হলো। ব্যাপারটায় সুবিধা করতে না পেরে যখন 'তেরিমা কাসি' (মালয় ভাষায় ধন্যবাদ) বলে বেরোব ভাবছি, রান্নাঘর থেকে এক ছেলে এসে জানতে চাইল, 'What do you want?' এই বাক্যের সৌজন্যে হালে পানি পাওয়া গেল। কথোপকথন চালাতেই বুঝলাম ছেলেটা দারুণ ইংরেজি বলে। তফু আর মাশরুম মেশানো দুই বোল করে সালাদ মিয়ে বসলাম দুজনে। একটা বেশ সুপি টাইপ, অন্যটা একদম শুকনো।
খাবারের ফাঁকে ফাঁকে ছেলেটা আমাদের সাইক্লিং নিয়ে নানান কিছু জিজ্ঞেস করছে। রুটের ব্যাপারে যথেষ্ট কৌতূহলী সে। আমাদেরকে 'অন্য মানেই বন্য' ভেবে নেয়নি একদম। ফের সাইকেলে উঠে পেনডাং নামে ব্যস্ত এক জনপদ। জুমন ভাইয়ের পুরোনো লিগামেন্ট ইস্যুটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আপহিলগুলোতে কষ্টই হচ্ছে। আগামী কয়েক কিলোমিটার আরেকটু ধীরে চালানোর সিদ্ধান্তই নিলেন। এদিকে পথের ধারে অনেক স্কুল। অনেক বাড়ির সামনে শোভা পাচ্ছে অলকানন্দা ফুল। হৃদি আর কবি-দুজনেই অলকানন্দার জলে ভেসে গেলেও আমি ভেসে যাই অলকানন্দা ফুলের শোভাতে।
কিছুটা এগিয়ে পথে পড়ল পাডাং টেরাপ নদী। জলের ঘোলা রং আর তীব্রভাবে সরে যাওয়া দেখেই আঁচ করা যায় নদীর পানি বেড়েছে বহুগুণ। পথের হদিস দেখার জন্য গুগল ম্যাপে ঢুকলেই মালয়েশিয়ার নর্থ-ওয়েস্টার্ন অঞ্চলের বন্যা নিয়ে গুগল আমাকে সাবধানবাণী দিতে থাকে। যদিও তেমন কোন পরিস্থিতিতে আমাদের পড়তে হয়নি এখনো। শহর ছাড়ানোর পর পথের দুপাশের দখল নিল ধানখেত। খেতের আশেপাশে এক পায়ে ধ্যানরত প্রচুর তপস্বী বকের দেখা মিলছে। তপস্বীর দেখা মিললেও মালয় দেশে বুদ্ধদেব বসুর তরঙ্গিণীর দর্শন পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
পেন্ডক চেগার পেরিয়ে থামলাম ওয়াট থামকিরিওং-এ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ওয়াট শব্দের অর্থ বৌদ্ধ বিহার। এটি মূলত থাইল্যান্ড বা শ্যামদেশীয় স্থাপত্যরীতিতে বানানো। এই অঞ্চলের থাই বংশোদ্ভূত লোকেদের হাতেই এটি গড়া। প্রবেশপথের কাছেই মূল প্রেয়ার হলে ভগবান তথাগত বন্দনা চলছে। মূল মন্দিরের তিন-স্তর বিশিষ্ট ছাদ অতীব মোহনীয়। পুরো আঙিনাজুড়েই দারুণ সব স্থাপনা আছে এখানে।
সাথে আছে বিহারের শ্রমণদের আবাস আর থাই ভাষা শেখার একটি স্কুলও। আর মূল কম্পলেক্সের পেছনে সুদৃশ্য একটি ফুটবল মাঠও আছে। শুধু বোধিবৃক্ষের অভাব আছে প্রাঙ্গণজুড়ে।
ওয়াট এর পর থেকে শুরু হলো ছোটো ছোটো অনেকগুলো আপহিল। চড়াইয়ের পরে রাস্তার সমতল অংশে প্রচুর সাপ-গিরগিটি জাতীয় প্রাণী দ্রুতগতির গাড়ি চাপা পড়ে মরে আক্ষরিক অর্থেই চিড়েচ্যাপটা হয়ে আছে। পরের জনপদ সুংগাই তিয়াং। একটু এগিয়ে মসজিদ আল ফালাহতে থামলাম পানি পানের বিরতিতে। এই মসজিদটিও অসম্ভব সুন্দর। বিশাল প্রাঙ্গণজুড়ে মসজিদ; সাথে ছোট্ট, ছিমছাম একটা পার্কও আছে মসজিদের ভেতর।
ফের পথে নামতেই পথের দুপাশে বেশ ঘন জঙ্গল। সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সাপ-গিরগিটির পিষ্ট হবার হারও। পথে পড়ল মুদা নামে বিশাল এক নদী। মুদা নামক এই নদী কেদাহ প্রদেশের দীর্ঘতম নদী। পানি যথারীতি ঘোলা, আপস্ট্রিমে বন্যার কারণেই সম্ভবত।
জোরে প্যাডেল চালিয়ে পৌঁছালাম জেনেরি। এরপর থেকে ছোট চড়াইগুলো রূপ নিল বড়োসড়ো চড়াইয়ে। কিছুক্ষণ চালিয়ে থামলাম ওয়াট থাই চ্যারিয়ন নামক বৌদ্ধ বিহারে। বিশাল এক প্রেয়ার হল আছে এখানেও। মূল মন্দিরের কারুকার্যগুলো যথারীতি থাই রীতির। বিহার প্রাঙ্গণেই শ্রমণদের আবাস আর পেছনে যথারীতি ফুটবল মাঠ। এখানে বোধিবৃক্ষ না থাকলেও সপ্তপর্ণ বলে খ্যাত ছাতিম গাছ আছে। গরম থেকে বাঁচতে ছাতিমতলায় জিরিয়ে নিলাম খানিক। জুমন ভাই কাঠের একটা ছাউনি পেয়ে রীতিমতো গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে আছে।
জেনিয়াং এর ঠিক আগে রাস্তার পাশের এক দোকানে লাঞ্চ সারলাম পৌনে তিনটা নাগাদ। নাসি কুকুস বেরেম্পাহ নামে একটা খাবার চাখা হলো। এই খাবারের মূল আকর্ষণ হলো স্পাইসি সাম্বল। ঝালেঝোলে একাকার হয়ে সেটাই চাখলাম; সাথে আইস মাইলো। রাস্তার ধারে এক জায়গায় মুখ থুবড়ে পড়া এরোপ্লেন দেখে চক্ষু চড়কগাছ। পরে বুঝলাম স্থাপনাটা এরোপ্লেন আকারের বানানো। পথে বেশ কয়েক জায়গায় রাস্তা সংস্কার চলছে। এর মধ্যেই চারটা নাগাদ ঝেঁপে নামল বৃষ্টি।
বাড়ির সামনের ফাঁকা বারান্দায় রেস্তোরাঁ খুলে বসেছে এক তরুণী। ওদের গ্যারেজে সাইকেল ঢুকিয়ে আইস সিরাপ গলাধঃকরণ করলাম। আধা ঘন্টা বাদে বৃষ্টি থামলে ফের পথে। কুপাং এসে আজকের দিনের মতো যাত্রা শেষ। উঠলাম কুপাং হাসপাতালের ঠিক বিপরীতের বুংগা রায়া নামক হোমস্টেতে। মালয় ভাষায় জবার নাম বুংগা রায়া। মজার ব্যাপার হলো, মালয়েশিয়ার জাতীয় ফুল এই জবা।
ছবি: লেখকের সৌজন্যে
















