বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ শিখরে

৮৪৮৫ মিটার উঁচু মাকালুর চূড়ায় আরোহণ মোটেই সহজ কাজ নয়। আছে জীবনের ঝুঁকিও। শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছানোর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন এই এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী
মাকালু নামক এই পর্বতের আচরণ রহস্যময়। আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায় এখানে। মানিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় কী! বিকাল নাগাদ তিন নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছে আরেক বিপত্তি। তাঁবুতে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই জানা গেল আমার ক্লাইম্বিং গাইড আং কামির বহন করে আনা পাঁচটি অক্সিজেন সিলিন্ডারই গায়েব। সে দিনকয়েক আগে তিন নম্বর ক্যাম্প অবধি পৌঁছে দিয়ে গেছে দুজনের জন্য পাঁচটি অক্সিজেন সিলিন্ডার। এখন উপায়? সে অবশ্য কালবিলম্ব না করে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে।
হিমালয়ের এ উচ্চতায় কোনো কিছু খোঁজা মোটেও সহজ কাজ নয়। ব্যাকপ্যাক থেকে পানি বের করে পান করার মতো মামুলি কাজ করতেই বুকে হাঁপ ধরে যায়। আর এ তো বরফ খুঁড়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার বের করার প্রাণান্ত চেষ্টা!
ক্যাম্প-২ থেকে ক্যাম্প-৩-এর পথটুকু আমাদের ভালোই পরীক্ষা নিয়েছে। তখনো জানতাম না এর ঠিক ৯ দিন বাদেই এ পথে আমি চিরতরে হারাব আমেরিকান পর্বতারোহী বন্ধু শেলি জোহানসেনকে।
রাতের হিমালয় স্তব্ধ আর ধ্যানগম্ভীর। এর চিরচেনা মৌনতাকে খানখান করে দিচ্ছে আমাদের পায়ের ক্রাম্পন
পাথর, বরফ আর তুষারের গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে ক্যাম্প-৩ অবধি প্রায় আট ঘণ্টার পথ; সঙ্গে বিষফোড়ার মতো যাতনা দিয়েছে টানা তুষারপাত। আমাদের ইচ্ছা ছিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা নাগাদ চূড়ার উদ্দেশ বেরোনোর। ৭৪০০ মিটার উচ্চতার তিন নম্বর ক্যাম্প থেকে পৌঁছাতে হবে ৮৪৮৫ মিটার উঁচু চূড়ায়। সাড়ে ৪টায় বেরিয়ে পড়ল দুই ফরাসি বন্ধু ইয়ান আর অ্যালেক্স। আরও ঘণ্টাখানেক এখানে-ওখানে খোঁজাখুঁজি চালিয়েও মিলল না অক্সিজেন বোতলের দেখা। উল্টো আং কামি এই বেগার খেটে চূড়ান্ত কাহিল। হঠাৎ করে ভোজবাজির মতো উদয় হলো কানাডিয়ান অভিযাত্রী দলের ফেলে যাওয়া তিনটি অক্সিজেন বোতল; এর মধ্যে একটি অর্ধেক ব্যবহৃত। তা-ই সই।
তিন নম্বর ক্যাম্পের গোটাচারেক তাঁবুকে পেছনে ফেলে এগোতে শুরু করলাম রাত ৯টা নাগাদ। সঙ্গী ক্লাইম্বিং গাইড আং কামি। খানিক পর বেরিয়ে আমাদের পিছু নিল লাকপা রিনজে শেরপা। সে যাচ্ছে আমার অন্নপূর্ণা-১ অভিযানের পর্বত-সখা ফুর্বার মরদেহ খুঁজতে। মাকালু অঞ্চলের সন্তান ফুর্বা এ পর্বতেই প্রাণ হারিয়েছে গত জানুয়ারিতে। আজকে রাতের হিমালয় স্তব্ধ আর ধ্যানগম্ভীর। এর চিরচেনা মৌনতাকে খানখান করে দিচ্ছে আমাদের পায়ের ক্রাম্পন (জুতার নিচে সংযুক্ত কাঁটাবিশেষ। মূলত আইস ক্লাইম্বিংয়ে ব্যবহৃত হয়। ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম কিংবা এ দুইয়ের সংমিশ্রণে তৈরি) উদ্ভূত বরফের ওপর চলার খচরমচর শব্দ। এ ছাড়া চারদিক নিথর, নিস্তব্ধ। পয়লা মের রাত; বুদ্ধপূর্ণিমার চরাচর ভাসিয়ে নেওয়া আলোর মধ্যে পথচলা! দুধসাদা জ্যোৎস্নায় থইথই করছে চারপাশ। পথের ওপর চোখ রাখব কি; চাঁদের আলোয় চির মহামৌনী হিমালয় দেখেই কূল পাচ্ছি না।
আধা ঘণ্টা এগোতেই প্রাণান্তকর সব চড়াইয়ের মুখোমুখি। দড়ি আর জুমারের (দড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সরঞ্জাম) সাহায্যে একটা পেরোতেই হাজির হয় অন্যটা। ঢাল খাড়া হলে চোখ নিবদ্ধ রাখতে হয় পথেই; এদিক-ওদিক তাকানোর উপায় নেই তখন। একটা বড় বরফের ময়দানের শেষের দিকে চার নম্বর ক্যাম্প। কেউ অবশ্য ৭৬০০ মিটার উচ্চতার এ ক্যাম্প এখন ব্যবহার করে না খুব একটা।
যত এগোই, গন্তব্য মাকালু চূড়ার সঙ্গে দূরত্ব কমে। বাঁক ঘুরতেই পথ আগলে দাঁড়ায় একটা খাড়া বরফের দেয়াল। রিনজে জানাল, এখানেই কোথাও পা হড়কে পড়ে গিয়েছিল ফুর্বার।
শীতের কামড় হাড় ভেদ করে মজ্জায় গিয়ে ঢুকছে যেন। স্থানে স্থানে ছোট ছোট ক্রেভাস (তুষার ফাটল)।মুখব্যাদান করে থাকা উদ্যত সব হাঁ যেন পাতালে প্রবেশের কপাট। একবার এর ভেতরে পড়ে গেলে জাগতিক আলো-হাওয়ার সঙ্গে চিরতরে আড়ি।
এতক্ষণ বরফের সমুদ্রে দু-একটা পাথর উঁকি দিচ্ছিল। ফ্রেঞ্চ ক্যুলোয়াতে (পর্বতের মধ্যকার খাড়া, সংকীর্ণ খাত; ক্যুলোয়া দিয়ে আরোহণ অপেক্ষাকৃত বিপজ্জনক) পালটে গেল দৃশ্যপট। এখন পাথরের সমুদ্রের ফাঁকে ফাঁকে বরফ-তুষারের অবস্থান। ফ্রেঞ্চ ক্যুলোয়াতে ফরাসিদের সঙ্গে দেখা; কাকতাল আর কাকে বলে! দুই ফরাসি বন্ধুকে অতিক্রম করে গেলাম এখানেই। আমাদের দুজনের চলার গতি বেশ ভালো। তিন নম্বর ক্যাম্প থেকে সবার পরে শুরু করেও একে একে সবাইকে পেরিয়ে গেছি।
অন্তহীন পথচলার ফাঁকে নেপালি আর টুটাফুটা ইংরেজি মিলিয়ে আং কামি জানান দিল চূড়া আর বড়জোর মিনিট কুড়ির পথ!
ততক্ষণে গলা চৈত্রের শুকনো জমির মতো খটখটে। একটু চোখ বুলিয়ে নিতেই মোটামুটি একটা সমতল চাতাল পাওয়া গেল। থার্মোফ্লাস্কে বয়ে আনা কফির রসসুধা পান করলাম ওখানে বসে। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে সবে রাত ৪টা বেজে ২০ মিনিট। সূর্যদেব অলস নয়নে চোখ মেলার প্রতীক্ষায় থাকি। মিনিট ত্রিশেকের অপেক্ষার পর ভোরের প্রথম কিরণে মাকালু শৃঙ্গের শ্বেতশুভ্র দ্যুতির ঝলক।
চূড়া আর আমাদের মাঝে আছে ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ গিরিশিরা। এখান থেকে মাকালুর পাথুরে চূড়াকে মনে হচ্ছে আকাশের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশু! অতি সন্তর্পণে ওর ঘুম ভাঙাতে হবে!
চূড়ার পবিত্র ভূমিতে পরম স্পর্শের অনুভূতি এলো নেপাল স্থানীয় সময় ৫টা ৩০ মিনিটে। আং কামির ব্যাকপ্যাক থেকে বেরোল প্রেয়ার ফ্ল্যাগ বা প্রার্থনার পতাকা। আর আমার ব্যাকপ্যাক থেকে বেরিয়ে এলো লাল-সবুজ পতাকা। এই প্রথমবারের মতো ২৭,৮৩৮ ফুট উঁচু বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত মাকালুর হিমশীতল বাতাসে মিশে গেল কোনো বাংলাদেশির তপ্ত নিঃশ্বাস!








