দুই চাকায় মালয়েশিয়া-৫
জেলি টু কোটা বারু-৯৫ কিলোমিটার

কেলানটান সেতুর উপরে লেখক
আমাদের কাটানো অতি আরামের একটা দিন যেন স্তূপাকারে পড়ে আছে সুন্দর এই হোমস্টেতে। কাল বিকেল থেকেই প্রচুর পরিমাণ চা-কফি পান করে মনটাই ফুরফুরে। জুমন ভাই আর আমার দুজনেরই ক্যাফেইন-কাতরতা আছে। ভালো চা-কফি পেলে দুজনেই বর্তে যাই। সকালটাও শুরু হলো মালয়েশিয়ার জাতীয় পানীয় বলে স্বীকৃত তেহ তারিক পান করে। তেহ তারিক মুলত ঘন দুধ চা; একইসাথে মালয়েশিয়ান সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশও এই পানীয়। অবশ্য আইস মাইলো এই প্রতিযোগিতায় খুব একটা পিছিয়ে নেই! কাল ভিডিও কলে আম্মু বলছিল আমার নাক-মুখ নাকি পুড়ে গেছে। আম্মুর সাথে কথা বলার পরে খেয়াল হলো আমার প্যানিয়ার ব্যাগে ছোট্ট একটা সানস্ক্রিন আছে। সেটা বাংলাদেশ থেকে বয়ে বেড়ালেও ব্যবহার করতে মনে নেই। পোড়া মুখ না হয় সানস্ক্রিনে সারবে, পোড়াকপাল সারবে কীসে?
হোমস্টে থেকে বেরিয়েই বিশাল এক চড়াই। অল্প এগোতেই পথের পাশের সাইনবোর্ডে তাপির পারাপারের সতর্কবার্তা। পাহাড়ের উপর জেলি পলিটেকনিকের গোছানো ক্যাম্পাস। রাস্তায় আজ থেকে থেকেই উড়নচণ্ডী মেঘ হানা দিচ্ছে। পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। কিছুদূর এগিয়েই পড়ল ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া কেলানটান এর সুবিশাল ক্যাম্পাস। মালয়েশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকাল প্রচুর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়তে আসে। আমার চেনা বৃত্তের অন্তত ৮-১০ জন সুবাং জায়া এর টেইলর্স ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। অথচ চিত্রটা ভিন্ন ছিল কিছুদিন আগেও। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আমার মালয়েশিয়ান সহপাঠিনী ছিল। আমার আগে-পরের ব্যাচেও বেশ কয়েকজন মালয়েশিয়ান শিক্ষার্থী দেখেছি। এখনের অবস্থা জানি না। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে প্রচুর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিড় জমাচ্ছে আজকাল।
পথের ধারে বেশ কয়েকটা জামরুল গাছ পড়ল। তলায় ফল বিছিয়ে পড়ে আছে। খাওয়ার কেউ নেই। চট্টগ্রামে আমাদের বাড়িতেও একটা জামরুল গাছ আছে। পাখিদের উদরপূর্তির কাজেই আসে পানসে এই ফল। গরমে কাহিল হয়েই দুইটা ফল কুড়িয়ে নিলাম। জামরুলের বেশিরভাগ অংশই জলীয় বলে চলতি পথে তৃষ্ণাটা অন্তত মেটাবে এই ফল। মজার ব্যাপার হলো, জুমন ভাইয়ের পুরো নাম নিয়াজ জামরুল জুমন। নামে ফলের অংশের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে একটা মজার কাহিনি আছে। জুমন ভাইয়ের চাচাকে যখন জানানো হলো, ওনার একটা ভাইপো ধরণীতে এসেছে, তখন তিনি জামরুল গাছের নিচে বসে ছিলেন। সে উপলক্ষ্যে উনি ভ্রাতুষ্পুত্রের নামকরণ করলেন জামরুল! আমি মাঝে মাঝেই জুমন ভাইকে খ্যাঁপিয়ে বলি, 'ভাগ্যিস আপনার চাচা কদবেল গাছের নিচে বসে ছিলেন না। নইলে আজীবন আপনার নামের মধ্যে কদবেল নিয়ে ঘুরতে হতো।' জুমন ভাই জানতে চাইলেন গাছের নাম কদবেল নাকি কাঠবেল! আমি বোটানির ছাত্রকে বেশি না ঘাঁটিয়ে জানান দিলাম, শব্দটা কাঠগোলাপ।
পথে পড়ছে ছোট চড়াই। রাস্তার দুপাশে ঘন সবুজ। নিরবিচ্ছিন্ন বন দুপাশে। অরণ্য যে লুন্ঠনযোগ্য, এই বোধ মালয়েশিয়ানদের মাঝে কম। ক্যাম্পুং বুয়ং এর পরে ডানে মোড় নিতে হলো। ছোট কয়েকটা চড়াই বেয়ে ক্যাম্পুং নিবং। পরের মোড়ে এসে রুটি চানাইয়ের একটা দোকানে থামলাম। ততক্ষণে সকাল থেকে ২৫ কিলোমিটারের বেশি চালিয়ে ফেলেছি। জায়গাটা মুক্তবায়ু ভোজসভা বা ওপেন এয়ার ফুড কোর্টের মতো দেখতে। কী খেতে চাই সেটা দোকানের তরুণী মালকিনকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। সে ইংরেজিতে হ্যাঁ-সূচক, না-সূচক কিছুই বলতে পারে না। পাশের টেবিলে সস্ত্রীক বসে থাকা এক মালয় ভদ্রলোকের পাতের খাবারটা দেখিয়ে সেটাই দিতে বললাম। মালয় তরুণী দোকানি এক, দুইয়ের মতো ইংরেজি শব্দের সাথেও পরিচিত নন। এবার ওই মালয় ভদ্রলোক সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেন। ওনার নাম ওয়ান ইসমাইল জাফর। কোথায় যাচ্ছি, কোন দেশ থেকে এসেছি ইত্যাদি স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা উঠে এলো। কথায় কথায় জানালেন, ওনার বোন বিয়ে করেছে এক বাংলাদেশিকে। আগে মালয় তরুণীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের বিয়ে করার একটা হিড়িক ছিল। একই ধর্মের হওয়াটা এক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের পক্ষে ছিল। তবে অনেক বাংলাদেশিই মালয়েশিয়াতে একটা বউ রেখে দেশে আরেকটা বিয়ে করত। ব্যাপারগুলো জানাজানি হওয়ার পর থেকে মালয় সম্প্রদায়ে আস্থার জায়গা হারিয়েছে বাংলাদেশিরা। ওয়ান ইসমাইলের সাথে আমার একটা মিল আছে। আমরা দুজন একই ঘড়ি পরে আছি। আমার ক্যাসিও ঘড়িটার বেল্ট লাল, ডায়াল কালো; ওনার ঠিক উলটো। সেটা নিয়েই খানিকটা হাসাহাসি হলো।
ইসমাইল বিদায় নিয়ে যাওয়ার সময় জানাল, আমাদের খাবার বিল ও দিয়ে দিয়েছে। 'বুকিত বুংগা ফ্রেন্ড' বলে সস্ত্রীক গাড়িতে উঠে গেল। গুগল করে জানলাম, 'বুকিত বুংগা' শব্দের অর্থ পাহাড়ের ফুল! ফের চালানো শুরু করতেই পথের ধারে অনেক বাড়ির সামনেই লটকন বিক্রি হতে দেখলাম। যদিও আমাদের দেশে লটকনের মৌসুম আরো বেশ কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। পথে পড়ল সুদৃশ্য আসসালাম মুকিম মসজিদ। খানিকটা ঘুরেফিরে ফের সাইকেলের স্যাডলে।
কিছুদূর এগিয়ে মূল রাস্তা ছেড়ে বামে ফেল্ডা কামাহাং এর পথ ধরলাম। এখান থেকে সোজা রাস্তা গেছে টানাহ মেরাহ এর দিকে। পথের দুপাশে বিশাল সব পাম বাগান। গাছের গায়ে জন্মেছে নানান আকৃতির ফার্ন। সবুজ গালিচার মতো ঘাস দেখে একটা পাম বাগানে নামার লোভ সামলানো গেল না। চিলতে পায়ে চলা পথ এগিয়েছে বাগানের অভ্যন্তরে অনেক দূর অবধি। এক জায়গায় পানির বোতল দিয়ে বানানো পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নজরে এলো। তেল কোম্পানির টাওয়ারের রেপ্লিকা বানানো হয়েছে জলের বোতল দিয়ে। কে বলেছে, তেলে-জলে মিশ খায় না!
আজ প্রচণ্ড গরম। রাস্তার পাশে নেই ছায়াদানকারী কোন গাছও। ক্যাম্পুং বা গ্রামগুলোও বেশ দূরে দূরে বলে থামার সুযোগও কম। আজ যে ক্যাম্পুংগুলো পথের ধারে পড়ছে, সেগুলোতে অন্যান্য প্রদেশের ক্যাম্পুং এর মতো প্রাচুর্যের চিহ্ন কম; সম্পদের দিক থেকে ঠিক বাহুল্য নেই কোথাও। অধিকাংশ বাড়িতেই কিছুটা হলেও মলিনতার ছাপ। অবশ্য কেলানটান প্রদেশ হিসেবে মালয়েশিয়ান উপদ্বীপ বা পশ্চিম মালয়েশিয়ার সবচেয়ে গরিব প্রদেশ। আর পুরো মালয়েশিয়ার কথা ধর্তব্যের মধ্যে নিলে সবচেয়ে ধনহীন প্রদেশ হিসেবে আসে সাবাহ এর নাম।
পথের ধারে ওমরাহ হজের প্যাকেজের সাইনবোর্ড। মাত্র ২৫০০ রিঙ্গিত বা ৭৫,০০০ টাকায় সেরে আসা যাবে ওমরাহ; এর মধ্যে ফ্লাইট টিকেটও অন্তর্ভুক্ত। আজ হাতি পারাপারের সাবধানবাণী না থাকলেও অপ্রত্যাশিতভাবে ঘোড়া পারাপারের একটা সতর্কবার্তা চোখে পড়ল। গরমে কাহিল হয়ে
আপাত গন্তব্য পাসির মাস এর দিকে এগোচ্ছি।নানান আকারের পাম গাছ কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই দর্শন হয়ে গেল। পাম বাগানের আধিক্যের কারণেই এদিকে খুবই পাতলা বসতি। বাড়ির সীমানা দেওয়ালের উপর-নিচ ফুলের টবে মোড়ানো দেখে মুগ্ধ হয়ে একটা মালয় বাড়ির সামনে থামলাম।
কড়া আর চড়া রোদ বেশ মুশকিলে ফেলছে আজ। পথে মসজিদ মুকিম বুকিত টুকু দেখে ঢুকে পড়লাম। ভরপেট ঠান্ডা পানি পান করে জুমন ভাই মসজিদের ফ্লোরেই শুয়ে পড়ল। মালয়েশিয়ান মসজিদগুলো নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে অনন্য। মসজিদগুলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীগুলোর মিলনস্থল হিসেবেও কাজ করে। লুবক জং এর পর থেকে পথের পাশে ছোট ছোট অনেকগুলা ক্যাম্পুং। কিছু জায়গায় একইরকম দেখতে অনেকগুলো লট বাংলো বানিয়ে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য খদ্দের ধরতে চমকপ্রদ সব অফার শোভা পাচ্ছে বিলবোর্ডে। একইসাথে বেড়েছে খাবারের দোকানের সংখ্যাও। দোকানির হরেক রকম খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছে।
টানা চালিয়ে ১টা ৪০ নাগাদ পাসির মাস। মূল শহরে না ঢুকে কেলানটান নদীর উপর বানানো সেতুর পানে এগোলাম। কেলানটান বিশাল নদী। মালয়েশিয়ায় এসে এই প্রথম নদী দেখে মন ভরে গেল। নদীবিধৌত অঞ্চলের সন্তান বলে বড় নদী দেখলেই আমার আনন্দ হয়। অবশ্য বড় নদীর হ্যাপাও বড়। এই অঞ্চলে বেশ অনেকগুলো বন্যার জন্ম দিয়েছে কেলানটান নদী। সেতুর উপর উথালপাথাল বাতাসে বেশ খানিকটা সময় বসে রইলাম। সেতুর ওপারেই ডি'উমি নাসি উলাম নামে খাবারের দোকান। এখানের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাসি উলাম নামে খাবারটাই পাতে তুললাম। নাসি উলাম নামক এই খাবারে ভাতের সাথে মূলত নানান ঔষধিগুণ সম্পন্ন সবজি আর তৃণ খাওয়া হয়। থানকুনি পাতা, আম পাতা, রাম তুলসীসহ নানান জাতের পাতা অন্তর্ভুক্ত থাকে এই ডিশে। ওরা সাথে এক কাপ করে হার্বাল চাও দেয়। ঠান্ডা জাতীয় কিছু না খেতে অভ্যস্ত আমি গত কদিনে প্রচুর ঠান্ডা পানীয় খাওয়াতে একটু ভুগছিলাম। দুপুরের খাবারটা আমার দারুণ কাজে এলো।
খাবারের পর কিছুক্ষণ জিরিয়ে ফের চলা শুরু। আজকের গন্তব্য কোটা বারু সবে ১৯ কিলোমিটার আর। রাস্তার দুপাশে প্রচুর প্রাইভেট ক্লিনিক চোখে পড়ছে। গত পাঁচদিনে কোথাও এমন ক্লিনিক নজরে আসেনি। কিছুটা এগিয়ে কোটা বারু অভিমুখের বড় রাস্তা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত ছোট রাস্তা ধরলাম। এদিকে মহাসড়কের ভিড় নেই। পথে ছোট ছোট ক্যাম্পুং পড়ছে। প্রায় প্রতিটা বাড়ির সামনে নানান রঙের বাগানবিলাসের ঝাড়। আর চোখে পড়ছে প্রচুর মাদ্রাসা; প্রতি কিলোমিটারে ২-৩টা করে। পৌনে চারটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম কোটা বারুতে।
তড়িঘড়ি করে গোসল দিয়ে বেরোলাম পাসার সিতি খাদিজা দেখতে।। আমি একাই বেরোলাম; জুমন ভাইয়ের ভোট ঘুমানোর বক্সে। আমাদের হোটেল থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ। মালয় থেকে বাংলা করলে পাসার সিতি খাদিজা শব্দত্রয়ের অর্থ দাঁড়ায় খাদিজা মহোদয়ার বাজার। নবিজির ব্যবসায়ী স্ত্রী হযরত খাদিজা (র.) এর সম্মানার্থে এই বাজারের নামকরণ করা হয়।
এই অষ্টভুজাকার বাজারের নামকরণের পেছনে সুন্দর একটা ব্যাখ্যাও আছে। এই বাজারের অধিকাংশ বিক্রেতাই নারী। স্থানীয় শাকসবজি থেকে স্বর্ণ, জিরা থেকে হীরা-সবই মেলে এক ছাদের নিচে। তবে একটাই অসুবিধা, বিকাল ৫.৩০টাতেই মার্কেটের ফটকে তালা পড়ে যায়।
শেষ বিকেলটা কাটালাম আল-কোরান রেহাল পার্ক এর আশেপাশে। কোরান রাখার রেহালের আকৃতির এই স্থাপনা অতীব সুন্দর। পাদাং মারদেকা আর মসজিস মোহাম্মদীতে ঘুরে এগোলাম আমার পছন্দের স্ট্রিট আর্ট দেখতে। শেষবার মালয়েশিয়া এসে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলাম দেয়ালে আঁকা শিল্পকর্মগুলো দেখে। গণমানুষের রাস্তার শিল্প দেখলাম পাঁচটা রাস্তা ঘুরে ঘুরে। এর মধ্যে তিনটা রাস্তাতেই ফিলিস্তিনের ম্যুরাল। গণমানুষের কন্ঠস্বর হয়ে উঠাই স্ট্রিট আর্টের মূল শক্তি। রাতের ডিনার সারলাম ছোট বোন স্বর্ণার পাঠানো গ্র্যাব (ফুড ডেলিভারি ও রাইড শেয়ারিং অ্যাপ) এর ফুড কুপন ব্যবহার করে। ওর মতে, এবার পেনাং না যাওয়ার শাস্তি নাকি গিফট হিসেবে পাঠানো এই কুপন!













