এই বর্ষায় চায়ের রাজ্যে

সিলেট চা বাগান
বর্ষায় চা বাগানে ভর করে অপরূপ সৌন্দর্য। মৌলভীবাজার ও সিলেটের এমনই কয়েকটি নয়নাভিরাম বাগান ভ্রমণের গল্প, সেই সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় টিপস পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করছেন ইশতিয়াক হাসান
তুমুল বৃষ্টি। দুটি নোয়া গাড়িতে আমরা ছুটছি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মাধবপুর চা বাগানের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ সামনে একটি গাছের ওপর প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলো। চালকের অবশ্য কোনো হেলদোল নেই! আমরাও ভয় কাটিয়ে চোখ ফেরালাম দুই পাশের চায়ের রাজ্যে। বৃষ্টিতে ধোয়া চা বাগান দারুণ মোহময়। মাধবপুর লেকও পড়েছে বাগানের পরিধির ভেতর। বর্ষায় হ্রদটির সৌন্দর্য যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ওপরে দাঁড়িয়ে চারপাশের পাহাড় আর চা বাগানের সমারোহ দেখতে দেখতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মাধবপুর লেকে যাওয়ার পথে নূরজাহান চা বাগানও মুগ্ধ করবে আপনাকে।
শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ গেলে লাউয়াছড়ার ঢু না মারা সম্ভব? ওই বনে ভোরে যাওয়াই ভালো। তখন ভিড় থাকবে কম। নীরবে হাঁটলে বনও আপনাকে তার গোপন চেহারা দেখাবে। স্বচ্ছ জলের একটা ঝিরি মাড়িয়ে বনের মধ্যে খাসিয়া পাড়াটা দেখে আসতে ভুলবেন না কিন্তু।
চাইলে রাজকান্দি রেঞ্জের আদমপুর বনেও ঘুরে আসতে পারেন। হামহাম জলপ্রপাতও বেশি দূরে নয়। বর্ষায় সেখানে পৌঁছানো একটু কষ্টসাধ্য, তবে বৃষ্টির জলে ফুলেফেঁপে ওঠা হামহামের সৌন্দর্য সেই কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে এ বর্ষায় আরও ঘুরে দেখতে পারেন ভারাউড়া লেক, ক্যামেলিয়া লেক, লাল পাহাড়, শংকর টিলা, গরম টিলা, ডিনস্টন ওয়ার সিমেট্রি, হরিণছড়া গলফ মাঠ ও চা গবেষণা ইনস্টিটিউট।
মৌলভীবাজারের জুড়ি, কুলাউড়া ও বড়লেখার চা বাগানগুলোও মন জুড়িয়ে দেবে। জুড়ি থেকে লাঠিটিলার জঙ্গলে যাওয়ার পথে চমৎকার কয়েকটি বাগান পাবেন। আমার মতে সিলেট বিভাগের সেরা অরণ্য লাঠিটিলা। জুড়ির সাগরনাল বাগান আর বন মন কেড়ে নেবে আপনার।
চা বাগান দেখতে চাইলে সিলেট কিংবা হবিগঞ্জও চমৎকার বিকল্প। সিলেট শহরের সীমানায় রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান মালনীছড়া ও লাক্কাতুরা। তবে একটু কষ্ট করে খাদিমনগরের দিকে এগোলে একই সঙ্গে অরণ্য ও চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। তেমনি ঘুরে আসতে পারেন লালাখােলও। চা বাগান, নদী আর জিরো পয়েন্ট মিলিয়ে জায়গাটি সত্যিই অপরূপ।
তবে সিলেটে আমার প্রথম পছন্দ কানাইঘাটের লুভাছড়া। চা বাগান, নদী, স্বচ্ছ জলে ছড়িয়ে থাকা পাথর আর ব্রিটিশ আমলের সেতু— জায়গাটির জুড়ি মেলা ভার। আর এ মৌসুমে সিলেট গেলে জলের বন রাতারগুল দেখার সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন?
চা বাগান, নদী, স্বচ্ছ জলে ছড়িয়ে থাকা পাথর আর ব্রিটিশ আমলের সেতু— সবমিলিয়ে দারুণ সুন্দর জায়গা লুভাছড়া
হবিগঞ্জেও রয়েছে দারুণ কিছু চা বাগান। ঢাকা-সিলেট পুরনো সড়ক ধরে গেলে তেলিয়াপাড়ার পর থেকেই চোখে পড়বে অসাধারণ সুন্দর কয়েকটি বাগান। এগুলোর শোভা উপভোগের পাশাপাশি সাতছড়ির জঙ্গলেও ঢু মারতে পারেন। হরেকরকম পাখি, ভালুক ও বন্য কুকুরের জন্য পরিচিত সীমান্তঘেঁষা বনটি। রেমা-কালেঙ্গার অরণ্য আর রেমা চা বাগানও কাছেই।
কোথায় থাকবেন
জুড়ি-কুলাউড়ার দিকে রিসোর্টের কিছুটা অভাব থাকলেও শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জে রয়েছে চমৎকার কিছু রিসোর্ট। নিরিবিলি পরিবেশ চাইলে টিলাগাঁও ইকো রিসোর্ট হতে পারে ভালো পছন্দ। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল টি রিসোর্ট অ্যান্ড মিউজিয়াম, নোভাম, বালিশিরা ও পাঙ্গান রিসোর্ট। নূরজাহান চা বাগানের পথেই পাবেন লেমন গার্ডেন রিসোর্ট। কপালগুণে কোনো চা বাগানের ম্যানেজার পরিচিত থাকলে বাগানের বাংলোতে থাকার অভিজ্ঞতার সঙ্গে খুব কম কিছুরই তুলনা চলে।
সিলেট শহরে থাকার মতো হোটেলের অভাব নেই। লালাখালে রয়েছে নাজিমগড় ওয়াইল্ডারনেস রিসোর্ট।
বর্ষায় ভ্রমণে সতর্কতা
- চা বাগান, অরণ্য ও ঝিরিতে হাঁটার সময় জোঁক ও সাপের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
- সঙ্গে ছাতা বা হালকা রেইনকোট রাখুন।
- বৃষ্টিতে পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, তাই ট্র্যাকিং উপযোগী জুতা পরা ভালো।
- মোবাইল ও ক্যামেরা জলরোধী ব্যাগে রাখুন।
- পাহাড়ি ছড়া বা ঝিরির পানি হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, তাই আবহাওয়া খারাপ থাকলে গভীরে না যাওয়াই ভালো।





