দুই চাকায় মালয়েশিয়া-৭
তেলাগা পাপান টু বুকিত বাউ (দুনগুন)- ১১৮ কিলোমিটার

সাগরসৈকতে লেখক (ডানে)
মেক্সিকান ক্রিপারে বেষ্টিত রুমস্টে থেকে বেরোতে বেরোতে সোয়া আটটা। কাল থেকে এই রুমস্টের বুড়িকে দেখলেই আতঙ্কে থাকছি আমরা। আমাদেরকে দেখলেই মালয় ভাষায় কীসব জিজ্ঞেস করেন। আমরা প্রথম প্রথম 'নো মালয়' বলে জবাব দিচ্ছিলাম। পরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর উপায়ান্তর দেখিনি; উনি কিছু না কিছু বলেই যাচ্ছেন। আমরা বুঝি বা না বুঝি তাতে ওনার কিছু যায় আসে না! ওনার বলার ইচ্ছে, বলেই যাচ্ছেন। আর না পেরে জুমন ভাইকে বলেই ফেললাম, 'পেট খারাপ করে মুড়ি, আর ঘর নষ্ট করে বুড়ি।' সুবিশাল এই প্রপার্টিতে বুড়ি একাই থাকেন। পরে বুঝলাম, এই নারী সম্ভবত খুবই নিঃসঙ্গ। নিকটস্থ বাড়িটাও যে কয়েকশ মিটার দূরে। এই বয়সে পাড়া বেড়ানোরও উপায় নেই। খানিকটা ঝুঁকে চলাফেরা করেন; হাঁটতে-চলতে বেশ কষ্টই হয় ওনার। নিজের বলা বাক্যের জন্য নিজের উপরই রাগ হলো।
এদিকের সব বাড়িতেই লাল রঙের ডাকবাক্স আছে। আমাদের দেশ থেকে সেই কবে উঠে গেছে ডাকবাক্সের চল। মালয়েশিয়ায় পোস্টম্যানদেরকে মোটরবাইকের পেছনে বাক্স ঝুলিয়ে বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করতে দেখেছি। হারিকেন আর লাঠি হাতে ডাকহরকরার ছবি শৈশব থেকেই মনে গেঁথে আছে। এসব জিনিস অবশ্য বিশ্ব থেকে বহু আগেই তামাদি হয়ে গেছে। তবে মস্তিষ্কের করোটিতে রয়ে গেছে সুকান্ত ভট্টাচার্য এর কবিতায় পড়া কয়েকটা লাইন-
'রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার!'
বিচের পাশের ছোট খাড়িগুলোতে লোকে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। কিছুদূর এগোতেই সুংগাই মেরাং নদী; পাড় ঘেঁষে প্রচুর গোলপাতা। অল্প এগোতেই রেডাং দ্বীপ যাবার জেটি। স্কুবা ডাইভিং আর স্নরকেলের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্য এটি। পথে পড়ছে প্রচুর হোমসস্টে।
প্রচুর সাইক্লিস্ট দেখছি আজ। মূলত রোড বাইক নিয়ে প্র্যাকটিসে বেরিয়েছে ওরা। পথে এক জায়গায় গাছের নানান শেকড় দিয়ে বানানো একটা বাড়ি দৃষ্টিগোচর হলো। বাড়ির বহিরঙ্গে দীনতার ছাপ থাকলেও শেকড়ের সৌন্দর্যে সেটা থোড়াই মালুম হচ্ছে। বিত্তের সাথে বৈভবের যে কোন সম্পর্ক নেই, সেটা আরেকবার মনে করাল এই বাড়ি। এই অঞ্চলে ইকুয়েস্ট্রিয়ান নামক অশ্বে চড়ার স্পোর্টস বেশ জনপ্রিয় বলেই মনে হচ্ছে। অন্যদিন হাতি কিংবা টাপির পারাপারের সাইনবোর্ড দেখেছি, আজ চোখে পড়ছে ঘোড়সওয়ার পারাপারের সাইনবোর্ড। তেরেঙ্গানুর বর্তমান রাজা সুলতান মিজান জয়নাল আবিদিন নিজে ইকুয়েস্ট্রিয়ান খেলেন। সাউথ-ইস্ট এশিয়াম গেমসে পদক জেতার রেকর্ডও আছে তার। সপ্তাহ দুয়েক আগে সুলতান মিজান কাপ নামে একটা প্রতিযোগিতা হয়েছে; সেটার ব্যানার এখনো পথের নানান জায়গায় ঝুলছে। কিছুটা এগিয়ে তেরেঙ্গানু ইন্টারন্যাশনাল এন্ডুরেন্স পার্ক পড়ল। এটি ঘোড়সওয়ারের খেলার জন্য বিশ্বমানের একটি পার্ক। ২০০৮ সালের ইকুয়েস্ট্রিয়ান ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এখানেই।
পথে চলছি আর ভাবছি, কী মসৃণ সব রাস্তা মালয়েশিয়ার! যেন নিস্তরঙ্গ নদীতে নৌকা নিয়ে বেরিয়েছি। কোথাও একটা গর্ত নেই। সাইকেলের চাকা দুটোও মনে মনে এমন পথই কামনা করে নিশ্চয়। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ পেরোতে পেরোতে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, ওরাও সামনে পথ পেলেই চলতে থাকে। চাকা গড়িয়ে চলতেই থাকে।
জায়গায় জায়গায় দৌলত টুংকু লেখা। রাজপরিবারের দীর্ঘায়ু কামনা করতে কত শত সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সকাল থেকে একটা মজার জিনিস খেয়াল করলাম। স্কুটিতে কালো পলিথিন আর ময়লা কুড়ানোর লম্বা লাঠি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। রাস্তায় অপচনশীল কিছু চোখে পড়লেই মোটরসাইকেল থামিয়ে সাথে রাখা কালো পলিথিনে তুলে নিচ্ছে ঝটপট। চলতি পথে ইন্সটিটিউট টেকনোলজি পেট্রোলিয়াম পেট্রোনাস এর বিশাল ক্যাম্পাস৷ মালয়েশিয়ার তেল-গ্যাস ইন্ডাস্ট্রিতে এই ইন্সটিটিউটের বিশাল অবদান আছে। অল্প এগিয়ে বাতু রাকিত থেকে বামে মোড় নিলাম। এদিকের প্রতিটা বাড়ির মাথায় একটা বা দুইটা শিংজাতীয় চোখা জিনিস বিদ্যমান। বিষয়টার পেছনের গল্প ভাষার বিড়ম্বনায় উদ্ধার করা গেল না।
পথে পড়ল ছিমছাম তক জেম্বাল বিচ। এখান থেকে আজকের গন্তব্য দুনগুন অবধি পথ একেবারে সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে। কিছুটা এগিয়েই সুলতান মাহমুদ এয়ারপোর্ট; এটি একদম সৈকতলাগোয়া। বাইরের দিক থেকে রানওয়ে ঘিরে চক্কর কেটে বেরিয়ে গেলাম। এক জায়গায় সুন্দর কিছু রঙিন ঘুড়ি বিক্রি হচ্ছে। দোকানি নেই, তবে ঘুড়ির দাম আর ক্যাশলেস পেমেন্টের কিউআর দেওয়া আছে। কিছুটা এগিয়ে চিন্তাই পান্তাই কিতা সৈকতে থামলাম। দক্ষিণ চীন সাগরের নীলচে সবুজ জলরাশি এখানে একদম চরণছোঁয়া দূরত্বে। তবে ভঙ্গুর সৈকতকে বাঁচাতে ফেলা হয়েছে বিশাল সব পাথর। এখানেই ড্রোন দিয়ে টিকটক করতে দেখলাম একদল মালয় তরুণীকে।
টানা চালিয়ে জাম্বাতান আংকাত নামক লিফট ব্রিজ। লন্ডনের বিখ্যাত টাওয়ার ব্রিজের আদলে ২০১৯ সালে বানানো হয়েছে এটি। সেতু পেরিয়ে কুয়ালা তেরেঙ্গানু নামক শহরে প্রবেশ করলাম। এই শহরই তেরেঙ্গানু প্রদেশের রাজধানী। ব্যস্ত শহরের মূল হ্যাপা ট্রাফিক ফাঁসও হাজির হলো শহরের সাথে সাথে। কোন সিগন্যালে না আটকেই পেরিয়ে যাই, আবার কোনোটাতে আটকে থাকি বেশ খানিকটা সময়। এই প্রদেশে আজ সাপ্তাহিক ছুটি বলে অনেক অফিসই বন্ধ। নইলে এই ফাঁসে আরো লম্বা সময় আটকে থাকতে হতো। শহর আমার ভালো লাগে না। ঈশ্বরের বানানো গ্রাম ছেড়ে মানুষের বানানো শহর দেখতে কে চায়? তাই জোর কদমে প্যাডেল চালাই। শহরের শেষ মাথায় সুদৃশ্য সুলতান ইসমাইল মসজিদ। মারাং এর অল্প আগে সাড়ে এগারোটা নাগাদ ছোট্ট একটা খাবার দোকানে থামলাম। ততক্ষণে সকাল থেকে চালিয়ে ফেলেছি ৫৩ কিলোমিটার রাস্তা। কফি আর নাসি কেরাবু খেতে খেতেই পরিচয় হলো ইউসুফের সাথে। এই খাবার দোকানের সমুদ্রলাগোয়া পেছনের ক্যাফেটা চালায় ইউসুফ। নাম ইয়ান বিচ ক্যাফে; ওর ছেলের নামে নাম। গড়পড়তা মালয়েশিয়ানদের চেয়ে যথেষ্ট ফিট ও। মালয়রা পাশে যতটা বাড়ে, উচ্চতায় ঠিক ততটা বাড়ে না। অনেকেই মোটরসাইকেলে বসলে যানবাহনটাকেই ঠিকঠাক খুঁজে পাওয়া যায় না অনেক সময়! অবশ্য মালয় চাইনিজরা একেবারেই উলটো।
কথায় কথায় ইউসুফ জানাল কয়েক মাস আগেই ও লাদাখ ঘুরে এসেছে। এবার গল্প মোড় নিল সেদিকেই। রয়েল অ্যানফিল্ড নিয়ে লাদাখের মানচিত্র ছেনে ফেলেছে ও। খাওয়া শেষে বিল দিতে গিয়ে জানলাম ইউসুফ আমাদের খাবার বিল দিয়ে দিয়েছে। পরে পেছনের ক্যাফেতে গিয়ে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসলাম। সাথে ওর ক্যাফের সামনের সৈকতেও কিছুক্ষণ সময় কাটানো হলো।
ফের চলা শুরু করতেই পেরোলাম সুংগাই মারাং নদী। রাস্তায় প্রচুর ফিলিস্তিনের পতাকা। ফিলিস্তিনি জনগণের যৌক্তিক দাবির সাথে একাত্মতা জানিয়ে কেলানটান আর তেরেঙ্গানু প্রদেশের লোকেরা প্রচুর ফিলিস্তিনের পতাকা লাগিয়েছে পথে পথে। অনেক রেস্তোরাঁতে শোভা পায় 'ফ্রি প্যালেস্টাইন' লেখা ব্যানার। পুলাও ক্যারেংগার পর থেকে রাস্তার ধারে প্রচুর ফলের দোকান। জাম্বুরা, ড্রাগন, কলাজাতীয় ফলই বেশি। গরমে নাস্তানাবুদ হয়ে দুপুর নাগাদ মসজিদ হাফেজ আব্দুল্লাহতে থামলাম। মাথায়-মুখে পানি ধুয়ে পেট ভরে পানি পান করা।
ফের চলা শুরু দুটো নাগাদ মারচাং। এদিকে প্রচুর পরিমাণে পরিত্যক্ত পুরনো বাড়ি; লতাপাতা গ্রাস করতে শুরু করেছে অনেক বাড়িকেই। পুটিহ পাসির অতিক্রম করতেই পেয়ে বসল ঝিরঝিরে বৃষ্টি। তবে এই বৃষ্টিতে শরীর ভিজছে না; সাইকেল চালাতেও কোন অসুবিধা হচ্ছে না। উলটো তাপমাত্রা কমায় বেশ আরামই লাগছে বলা যায়। রাস্তার ধারে হরেক রকমের জাগুং বা ভুট্টা বিক্রি হচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে কেনার লোকেরও অভাব নেই।
চারটা নাগাদ থামলাম দুপুরের খাবার সারতে। লাকসা পেনাং নামে একটা সুপ-নুডলস অর্ডার করলাম। মুখে দিয়ে ঢোক গিলতেই মনে হলো ঝালে পাকস্থলী পর্যন্ত পুড়ে যাবার দশা! ডেজার্ট হিসেবে চেন্ডল খেয়ে কিছুটা ধাতস্থ হওয়া গেল।
এখান থেকে আজকের গন্তব্য খুব বেশি দূরে নয়। রান্তাউ আবাং বিচে প্রি-ওয়েডিং ফটোশুট হচ্ছে দেখে থামলাম। বর-কনের বন্ধু-বান্ধবীরা জায়গাটাকে মুখর করে রেখেছে। এর মধ্যে শুরু হলো ঝড়ো হাওয়া। মিনিট দশেক এগোতেই ভয়াবহ বৃষ্টি। এক বাড়ির সামনে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিলাম সাইকেল সমেত। আধা ঘন্টা সময় এখানেই কেটে গেল। জুমন ভাই একটা গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই একটা ন্যাপ নিয়ে নিল। এবার বৃষ্টি পরবর্তী জল-কাদা সঙ্গী করে ফের চলা। নিজেরদের পেছনের চাকার কাদায় নিজেদেরই ডুবে মরার দশা। মাঝে মাঝেই দ্রুতগতির ব্যক্তিগত গাড়িগুলো আমাদের গায়ে কাদার নানান বাটিক ডিজাইন উপহার দিয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে বেশি না ভেবে পথেই মনোযোগ দিলাম।
প্রবেশ করলাম কুয়ালা দুনগুন শহরে। এই শহরে বাইসাইকেলের আলাদা লেইন আছে; আছে দৌড়ানোর জন্যও আলাদা পথ। রাষ্ট্র যখন সব ধরনের নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম চালায়, তখনই একটা দেশ সামগ্রিকভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। লেইন ধরে চালিয়ে শহর ছাড়ালাম। শহরের ঠিক বাইরের হোমস্টে-তে
পৌঁছে গেলাম ছয়টা নাগাদ। আজকে পুরোদিনে পথ অতিক্রম করেছি ১২৪ কিলোমিটার। এতদিন যে সব হোমস্টেতে ছিলাম, সেখানে মালিকপক্ষের কাউকে পাইনি। এই হোমস্টে এর মালিককে পাওয়া গেল। কাছেই অন্য বাড়িতে থাকেন। তবে ভদ্রলোক মালয়ের ভূমিপুত্র নন; মালয় চাইনিজ তিনি। আমাদের এই হোমস্টে এর ঠিক পেছনেই পাহাড়। পাহাড়ের নাম বুকিত বাউ। ৫ কিলোমিটারের একটা হাইকিং ট্রেইল আছে ৪৭২ মিটার উঁচু এই পাহাড়ে।












