দুই চাকায় মালয়েশিয়া-৮
বুকিত বাউক (দুনগুন) টু বেসেরাহ-১১১ কিলোমিটার

সাগরের সামনে লেখক
থাইল্যান্ড সীমান্ত ঘেঁষা পাদাং বেসার থেকে তিতিওয়াংসা পর্বতমালা ও কোটা বাহরু হয়ে জোহর বাহরু—দুই চাকায় ১২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিচ্ছেন এভারেস্টজয়ী বাবর আলী। তার প্রতিদিনের ভ্রমণগল্প দুই চাকায় মালয়েশিয়া।
মালয়েশিয়াতে বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি হওয়া রীতিমতো দস্তুর। এটি মূলত পরিচলন বৃষ্টি। এই অঞ্চলে স্থলভাগের চেয়ে জলভাগের পরিমাণ বেশি বলে বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে এই ধরনের বৃষ্টি হয়। দিনের বেলায় সূর্যের অতিরিক্ত তাপে জলাঞ্চল থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উপরে উঠে যায়। পরে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে বিকেল বা সন্ধ্যা নাগাদ বৃষ্টি হয়। মালয়েশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরেও এ ধরনের বৃষ্টি দেখেছি। তবে এই বৃষ্টি আমাদের দেশের মতো একটানা হয় না। বৃষ্টি নামলে কুড়ি মিনিট থেকে এক ঘন্টা অপেক্ষা করলেই ধরে নেওয়া যায় বৃষ্টি থেমে যাবে। যদিও কাল বিকেল থেকে দফায় দফায় বেশ কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াও বেশ গুমোট সে অর্থে। বেরোব বেরোব করছি, এমন সময়ে গোলাগুলির শব্দ! কানে তালা লাগার পাশাপাশি বুকেও কাঁপন ধরে গেল। সুলতানের রাজ্যে আর কোন বিরোধী দল তো নেই। তাইলে কাদের মাঝে গোলাগুলি? একটু হকচকিয়ে গেলেও সাহস করে বাইরে উঁকি দিলাম। দেখি, এক মালয় চাইনিজের নতুন কেনা জিপের সামনে পটকা ফোটানো হচ্ছে! গাড়িকে মোড়ানো হয়েছে লাল সালুতে; আর গাড়ির চারপাশে মহল্লা কাঁপিয়ে ফোটানো হচ্ছে পটকা।যাক বাবা; পটকার উপর দিয়েই গেল। আজ বেরোতে বেরোতে আটটা চল্লিশ। জলে ভেজা রাস্তা। দিনের প্রথমভাগের পথ বনের মধ্য দিয়ে। বুকিত বাউক নামক পাহাড়কে বামে রেখে চলছি। জায়গায় জায়গায় পথ শ্যাওলার মতো পিচ্ছিল হয়ে আছে।
অল্প এগিয়েই সুলতান মিজান পলিটেকনিক। সুলতানের নামে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নামকরণ দেখছি পরশু থেকেই। কুয়ালা তেরেঙ্গানুতে কাল এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের নাম দেখেছি রানির নামে। এই সুলতান পারিবারিক আত্মপ্রচারে বেশ সিদ্ধহস্তই বলা যায়! দক্ষিণ এশিয়ার কুলীন রাজনীতির পারিবারিক ধারা এদিকেও চলে এসেছে দেখছি! দুনিয়াতে পদার্পণ করলে মানুষকে আঁচড় কেটে রেখে যেতে বলা হয়; এদিকে এই সুলতান রীতিমতো খামচাখামচি করছে নিজের এবং পরিবারের নাম রেখে যাওয়ার জন্য! আরো কিছুটা পথ এগিয়ে হাতের বামে বুকিত বাউক হাইকিং ট্রেইলের রাস্তা। অল্প সামনে মা দায়রাহ কচ্ছপ অভয়ারণ্য। কচ্ছপের ডিম ফুটানোর হ্যাচারি আছে এখানে। আজ পাহাড় আর বনই সাথে আছে; সমুদ্র দূরে আপাতত। একটা রাস্তা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে এগিয়ে কুয়ান্টান আর কুয়ালালামপুরের দিকে এগিয়েছে।
আমরা গুগলে গন্তব্যের নাম ক্লিক করে Avoid Tolls, Avoid Highways ক্লিক করে দেই। সেক্ষেত্রে যাত্রাপথে অতি দ্রুতগতির যানবাহন চলা এক্সপ্রেসওয়েকে এড়িয়ে যাওয়া যায়। সাথে এড়ানো যায় টোল বা পথশুল্কের হ্যাপাও।
দীপিকা পাড়ুকোনের টোল ছাড়া অন্য কোন টোলে আমি আগ্রহী নই! কাল রাতের বৃষ্টির ফলে আজ অনেক জায়গাতেই রাস্তায় জল জমে আছে। রাগী সূর্যটা এখনো তার কাজ পুরোদমে শুরু করতে পারেনি। চলতে চলতে সাড়ে নয়টা নাগাদ পাকা নামক শহরে। পাকা থেকে পাকাপাকিভাবে বন-পাহাড়কে বিদায় দিলাম। এবার ফের সমুদ্র ঘেঁষে পথচলা।
রাস্তায় মেকানিক্যাল সুট পরা প্রচুর লোকজনকে মোটরসাইকেলে চেপে সামনের দিকে যেতে দেখছিলাম। খানিক বাদেই রহস্যের মীমাংসা হলো। এদের অনেকেই পেট্রোনাসে কাজ করেন। অল্প এগিয়েই শুরু হলো পেট্রোনাসের সীমানা। সুবিশাল ফ্যাক্টরি, দৈর্ঘ্যে কয়েক কিলোমিটার হবে। রাস্তার দুধারেই বিস্তৃত এটি। আকার এবং আকৃতি দেখে সমীহ জাগে। পেট্রোনাসের পুরো এলাকাজুড়ে রাস্তার ডিভাইডারে শোভাবর্ধনাকারী নানান উদ্ভিদ। হাঁ করে পেট্রোনাস তেল, গ্যাস, গ্যাস প্রসেসিং ফ্যাক্টরি, তেল টার্মিনাল, গ্যাস টার্মিনাল, ক্রুড অয়েল টার্মিনাল, ইথিলিনসহ নানান কারখানা দেখছি। স্থাপনাগুলোর সামনে অসংখ্য মোটরসাইকেল স্তূপাকারে রাখা। মেকানিক্যাল স্যুট পরা পেট্রোনাসের কর্মীদের বাহন এগুলো। এখানেই আছে সুলতান ইসমাইল পাওয়ার স্টেশন। এটি মালয়েশিয়ার বৃহত্তম গ্যাসে-চালিত পাওয়ার স্টেশন। পেট্রোনাস শুধু তেল, গ্যাসই সরবরাহ করে না; একইসাথে জলীয় বাষ্প আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাসের জোগানও দেয়। নিজেদের দেশের পাশপাশি পার্শ্ববর্তী ধনী দেশ সিঙ্গাপুরের জ্বালানির জোগানদাতাও পেট্রোনাস।
পেট্রোনাস অঞ্চল শেষে ক্যাম্পুং লাবোহান। এই জনপদের প্রথমেই পড়ল ছোট্ট কারতিহ নদী। পরের লোকালয় কারতেহ। খানিক বাদেই আবার শুরু হলো পেট্রোনাসের সুবিশাল এলাকা। একটু অবাক হলাম একটা ফুটওভার ব্রিজের মতো স্থাপনা দেখে। মালয়েশিয়ায় এই কদিনের সাইক্লিং-এ কোথাও ফুটওভার ব্রিজ চোখে পড়েনি। একটু পরে খেয়াল করলাম, এটি ফুটওভার ব্রিজ নয়। পেট্রোনাসের কর্মীদের সাইকেল আর মোটরসাইকেল পারাপারের জন্য ওভারপাস এটি। এগারোটা নাগাদ থামলাম কেমাসিক বিচে। এখানেই সকালের খাবার সারলাম। গত দুদিন ধরে রাতের খাবার সেরে ফেরার পথে কোন একটা বেকারি আইটেম কিনে নিয়ে আসছি। সেভেন ইলেভেন বা জায়ান্ট নামক সুপারশপ থেকেই কিনি মূলত। সকালে কফির সাথে সেটা গলাধঃকরণ করলে আরামসে ঘন্টা দুই-আড়াই সাইকেল চালানো যায়। কেমাসিক সৈকতের অদূরে স্বল্প পানিতে সাগর গর্ভে আছে পাথুরে গুহা। এই সামুদ্রিক গুহাগুলোতে শুধু ভাটার সময়েই যাওয়া যায়। অনেক মালয়ের ভিড় গুহার অন্দরে-কন্দরে। গুহা দেখে ফের সাইকেলে। পরের লোকালয়ের নাম কিজাল। এখান থেকেই ফের সমুদ্র দূরে সরে গেলাম। সমুদ্র আর আমাদের মাঝে আছে একসারি মোহনীয় পাহাড়। শহর দেখার চেয়ে পাহাড়েই চোখ দুটো বুঁদ হয়ে আছে। টানা অনেকক্ষণ গগনভেদী অট্টালিকা দেখলে দৃষ্টি আর স্নায়ুর উপর আঘাত আসে। কিজাল পেরিয়ে সুংগাই চুকাই নদী। সোনালি গম্বুজের দৃষ্টিনন্দন সুলতান আহমেদ মসজিদ পড়ল পথে। রোদ পড়ে গম্বুজের চূড়াগুলো যেন জ্বলছে। এই শহরের অন্যতম স্মারকচিহ্ন এই মসজিদ।
১টা নাগাদ চুকাই শহর পেরিয়ে গেলাম। জিরাফের মতো উঁচু গলার বিল্ডিংগুলো অবশেষে সরল দৃষ্টিসীমা থেকে। চুকাই শহরের শেষ মাথায় নীল গেইটের উপর সোনালি গম্বুজওয়ালা ফটক। বড় বড় হরফে সেলামাত জালান এবং তেরিমা কাসি লেখা। মালয় ভাষায় বিদায় আর ধন্যবাদ জানাতে বহুল ব্যবহৃত হয় এই শব্দগুলো। ক্যাম্পুং চেন্দর থেকে ঢুকে পড়লাম নতুন প্রদেশ পাহাং-এ। মালয়েশিয়ান উপদ্বীপের সর্ববৃহৎ প্রদেশ এটি। পশ্চিম মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট তাহান এর অবস্থানও এই প্রদেশে। তবে এই প্রদেশের সুলতানের কোন শুভেচ্ছাবাণী দেখা গেল না কোথাও। চেন্দর মসজিদে থামলাম পানি পানের জন্য। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে ফের পথে। আজ গরম কিছুটা কম হলেও সাইকেল চালাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। উলটোদিক থেকে ধেয়ে আসা হেড উইন্ড গতি তুলতেই দিচ্ছে না। স্রোতের বিপরীতে নৌকা বাওয়ার অনুভূতি হচ্ছে। কিছুটা এগিয়ে পাহাং এন্ডুরেন্স পার্ক। তেরেঙ্গানুর মতো এখানেও ঘোড়সওয়ারের খেলা হয়। গেবেং-এ এসে পারলিস প্রদেশের পর প্রথমবারের মতো রেলপথ চোখে পড়ল। গেবেং বিখ্যাত শিল্পাঞ্চলের জন্য। রাস্তার দুপাশে বিশাল সব ইন্ডাস্ট্রি। আর কাঁচামাল আনা-নেওয়া করতে গিয়েই রাস্তায় বিশাল সব গর্ত। পুরো মালয়েশিয়ায় এরচেয়ে বাজে রাস্তা আর পাইনি। চোখ দুটো পথেই নিবদ্ধ রাখতে হচ্ছে। নানান সাইজের গর্ত; কোনোটাকে এড়িয়ে, কোনোটাকে পেরিয়ে এগোচ্ছি। ততক্ষণে আকাশের অবস্থা সঙ্গিন। বৃষ্টির আশন্কায় ভীত হয়ে জোর কদমে প্যাডেল চালালাম। বালক নামে একটা লোকালয়ে পৌঁছাতেই এক বালিকার দোকানে গেড়ে বসলাম। আমাদের ইচ্ছে ছিল এখানেই দুপুরের খাবার সারার। কিন্তু আপাতত পানীয় ছাড়া আর কিছু নাই। আমি নিলাম কপি পানাস (হট কফি) আর জুমন ভাই নিল কপি সেজক (আইস কফি)।
দুনিয়া কাঁপানো বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে এর মধ্যে। ঝুম বৃষ্টির তাণ্ডব চলল মিনিট কুড়ি ধরে। কফি শেষ করতে করতেই বৃষ্টি শেষ। এবার ফের সাইকেলে চড়ে বসলাম। দুই কিলোমিটার সামনে যেতেই বৃষ্টির নিশানাও নেই। হঠাৎ করে আমার মাথা নিশানা করে উড়ে এলো কয়েকটা মৌমাছি। আমি হ্যান্ডেলবার টলমল করেও শেষ মুহুর্তে সামলে নিলাম। কিন্তু আমার পেছনে থাকা জুমন ভাইকে হুল ফুটিয়ে দিলো কয়েক জায়গায়। বেশ ফুলেও গেছে পিঠের কয়েক জায়গায়। চুলকাতে চুলকাতে টিশার্ট ছিঁড়ে ফেলেছেন জুমন ভাই। পথে থেমে অনেকগুলো সবজিসমেত মি সুপ খাওয়া হলো। জুমন ভাইয়ের হুল ফোটানোর ব্যাপারটার সুরাহা দরকার। আমার সাথে ওষুধের একটা বড় বোঁচকা আছে। সেটা নিজে বাদে অন্য কারো কাজে লাগলে আমি খুশিই হয়। চিকিৎসার সরঞ্জাম বের করতে হোমস্টেতে যাওয়া প্রয়োজন আগে। এই বেলা সাইকেলে গতির ঝড় তুললাম; তাও শেষরক্ষা হলো না। আড়াই কিলোমিটার বাকি থাকতে ফের বৃষ্টির খপ্পরে। মিনিট বিশেক আবার বৃষ্টির কাছে গচ্চা গেল। মূল সড়ক থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটা ছোট সড়ক ধরে হোমস্টে এর পথ ধরলাম। বকুল ফুল বিছানো পথ ধরে চলে এলাম রেড ব্রিক হোমস্টে-তে। বাড়ির সামনে বিশাল সব ক্যাকটাস। খানিক বাদেই এলো হোমস্টে এর মালিক। যতগুলো হোমস্টে-তে থেকেছি, এটাতেই প্রথমবারের মতো মালিকপক্ষের দেখা পেলাম। মালিক মালয় ভদ্রলোক সিলভিয়া প্লাথের মতো ভাষায় জানতে চাইলেন, 'তুমি কি আমাদের মতো লোক?' উত্তর দিলাম বঙ্গ উপসাগরের উপকূলে আমার সাকিন।












