টোটো কোম্পানি
ট্রেন টু লাসা

বর্তমানে গণচীনের একটি স্বশাসিত অঞ্চল তিব্বত। মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত এই ভূখণ্ড তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। ঘুরে এসে লিখেছেন এলিজা বিনতে এলাহী
২০২৫ সালের শুরুতেই ঠিক করেছিলাম, তিব্বত যাব। বহুদিনের স্বপ্ন, অদেখা এক রহস্যভূমি। কিন্তু সময়ের জটিলতায় প্রথম পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দ্বিতীয়বার ভুল করিনি। চীনের ভিসা, তিব্বতে প্রবেশের বিশেষ অনুমতি— সব ঠিকঠাক হাতে পেয়ে যখন যাত্রার দিন এলো, মনে হলো ঘোরের মধ্যে আছি।ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি তিব্বত এক নিষিদ্ধ দেশ, আর রহস্যে ঘেরা এক নগরীর নাম লাসা। কঠোর ধর্মীয় নিয়ম, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা আর দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান— সব মিলিয়ে তিব্বত যেন পৃথিবীর বুকে এক আলাদা জগৎ। হিমালয়ের উত্তরে, বরফে ঢাকা এ মালভূমির গড় উচ্চতা প্রায় ১৪ হাজার ফুট।এখন তিব্বত গণচীনের একটি স্বশাসিত অঞ্চল। তবে রহস্যের আবরণটা পুরোপুরি সরে যায়নি। বরং সে রহস্যই টেনে নিয়ে যায় ভ্রমণপিপাসু মানুষকে। আর সেই টানেই আমাদের যাত্রা— চীনের জিনিং শহর থেকে লাসা পর্যন্ত প্রায় ২১ ঘণ্টার এক রেলভ্রমণ।
ঢাকা থেকে শুরু করে কুনমিং, সেখান থেকে জিনিং— দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে পৌঁছালাম সেই শহরে, যাকে বলা হয় তিব্বতের প্রবেশদ্বার। আমরা ছিলাম দুই দলে। আমাদের দলে সাত, আরেক দলে পনেরোজন। পুরো দলের দায়িত্বে মোহাম্মদ আলী হোসেন সুজন ও আইরিন হোসেন।জিনিং পৌঁছে মনে পড়ছিল এক বাঙালির কথা— শরৎ চন্দ্র দাস। ১৮৭৯ সালে তিনি কাঞ্চনজঙ্ঘা পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিব্বতে। তার পরিচয় আজও রহস্যে ঢাকা। কেউ বলেন গুপ্তচর, কেউ বলেন অভিযাত্রী। তার লেখা ভ্রমণবৃত্তান্তে যে তুষারময় নিঃসঙ্গতার বর্ণনা, তা যেন আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে তিব্বতের পথে।
আমরা অবশ্য অনেক সহজ পথে চলেছি, রেলপথে। তবু মনে হচ্ছিল, সেই একই অজানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। জিনিং রেলস্টেশনে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ল শৃঙ্খলা। কোনো কোলাহল নেই। তিব্বত পারমিট আর পাসপোর্ট পরীক্ষা শেষে অপেক্ষা করতে লাগলাম ট্রেনের জন্য।
স্টেশনের অপেক্ষমাণ কক্ষটি বড়, পরিচ্ছন্ন আর চারদিকে খাবারের দোকান। সবাই ট্রেনের জন্য কিছু শুকনো খাবার কিনে নিল। কারণ আগেই শুনেছি, ট্রেনে খাবারের খুব বেশি বিকল্প নেই। আমার ব্যাগে ছিল খেজুর, বাদাম আর চকলেট বার। ঘোষণা এলো, লাসাগামী ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসেছে। প্রতিটি কোচের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন গার্ডরা, ওভারকোট আর হ্যাট পরা। মনে হচ্ছিল, যেন পুরনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য। আমাদের কোচ নম্বর ৫। চারজনের স্লিপার কামরা। ওপরে দুজন, নিচে দুজন। ব্যাগ গুছিয়ে বসতেই ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
শুরুতেই বিস্ময়, মিনিট কুড়ির মধ্যে কয়েকটি বিশাল টানেল পার হলাম। পাহাড় কেটে তৈরি এই রেলপথ প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ— বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলপথ। ২০০৬ সালের আগে তিব্বতে কোনো রেলপথই ছিল না। এখন সেই অভাব পূরণ হয়েছে এই ‘প্লাটো ট্রেন’-এর মাধ্যমে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক জায়গায় এই রেলপথ ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে গেছে। শ্রমিকদের বরফ খুঁড়ে টানেল তৈরি করতে হয়েছে, অক্সিজেন নিয়ে কাজ করতে হয়েছে ভাবতেই অবাক লাগে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি। ধূসর পাহাড়, কোথাও লাল আভা, কোথাও হলদেটে রঙ। মাঝেমধ্যে বরফে ঢাকা শৃঙ্গ উঁকি দিচ্ছে। হিমবাহ গলে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট হ্রদ। দূরে ইয়াকের পাল ঘাস খাচ্ছে, যদিও সেটি আসলে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি।
মনে হচ্ছিল বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে বাস্তবে চলে এসেছি। ট্রেনের ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে। উচ্চতার কারণে শ্বাসকষ্ট হতে পারে, তাই এ সতর্কতা।
খাবার গাড়িতে গিয়ে কফি খেলাম। ভাষার সমস্যায় স্থানীয়দের সঙ্গে খুব বেশি কথা বলা গেল না।সন্ধ্যা নামতেই বাইরের দৃশ্য অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তখন কাজ একটাই— নিজেদের মধ্যে গল্প, ছবি তোলা, আর রাতের খাবার। যা ছিল তাই ভাগাভাগি করে খাওয়া। তারপর ঘুমের প্রস্তুতি।
আমার শোবার জায়গা ছিল ওপরের বার্থে। শুয়ে আছি; কিন্তু ঘুম আসছে না। শ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে, মাথাও ব্যথা করছে। উচ্চতায় এই উপসর্গ স্বাভাবিক তা জানি। পানি খেয়ে নিজেকে সামলে রাখলাম। হঠাৎ রাত ৩টার দিকে ঘুম ভেঙে গেল। ট্রেন থেমে আছে, ট্যাংগুলা স্টেশন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০৬৮ মিটার উঁচুতে, বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আলোয় ঝলমল করছে স্টেশনটি। কেউ কেউ নেমে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল নেমে যাই। কিন্তু সবার ঘুম ভাঙানো ঠিক মনে হলো না। তাই আধশোয়া অবস্থায়ই সে দৃশ্য ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা করলাম। ভোর হতে না হতেই আবার নতুন দৃশ্য। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট বসতি— একই রকম বাড়ি, নিস্তব্ধ পরিবেশ। একসময় ট্রেন থামল ইয়াং বা জিং স্টেশনে। উচ্চতা ৪৩০৫ মিটার। এখান থেকেই বোঝা যায়, আমরা সত্যিই ‘পৃথিবীর ছাদ’-এ পৌঁছে গেছি।
দুপুরে খাবার গাড়িতে গিয়ে ভাত, সবজি, মুরগি আর মাছ খেলাম। খাওয়ার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে হঠাৎই চোখে পড়ল আধুনিক কিছু ভবন। মনে হলো, গন্তব্য আর দূরে নয়। অবশেষে প্রায় সাড়ে একুশ ঘণ্টা পর পৌঁছালাম লাসা। এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রায় ৭০০টি টানেল পার হয়েছি। কিছু টানেল ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেল টানেল, ফেঙ্গুওশান।
ঢাকা থেকে রওনা হয়ে প্রায় আড়াই দিনের যাত্রা শেষে দাঁড়িয়ে আছি তিব্বতের রাজধানীতে। লাসার উচ্চতা প্রায় ১১ হাজার ৯৪৫ ফুট।
স্টেশন থেকে বের হতেই স্থানীয় ট্যুর কোম্পানির প্রতিনিধি আমাদের ঐতিহ্যবাহী উত্তরীয় দিয়ে স্বাগত জানালেন।
লাসা— অর্থ ‘দেবতাদের আবাসস্থল’। শহরে ঢুকেই মনে হলো— নিঃশব্দ, পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম। কোথাও তাড়াহুড়া নেই, একধরনের শান্তি ছড়িয়ে আছে। বাসে করে হোটেলে পৌঁছালাম। নাম, তাশি নোটা। মূল সড়কের পাশেই একটি তোরণ রয়েছে হোটেলের। সেই তোরণ ধরে লম্বা একটি সড়ক চলে গেছে হোটেল বরাবর।
হোটেলের সদর দুয়ার ভারি সুন্দর। মনে হচ্ছে ছোটখাটো কোনো প্রাসাদের দুয়ার। সব আনুষ্ঠানিকতা মিটিয়ে যার যার কক্ষে গেলাম আমরা।
পরের দুই দিন বিশ্রাম। শরীরকে এই উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
তিব্বত ভ্রমণের আগে জেনে নিন
- বিশেষ অনুমতি ছাড়া তিব্বতে প্রবেশ সম্ভব নয়। চীনের ভিসার পাশাপাশি প্রয়োজন ট্রাভেল পারমিট, যা কেবল অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে পাওয়া যায়।
- ভ্রমণের মাধ্যম আকাশপথ, সড়কপথ ও রেলপথ— তবে রেলভ্রমণই সবচেয়ে রোমাঞ্চকর।
- উচ্চতা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রথম দুই দিন বিশ্রাম নেওয়া, ধীরে চলাফেরা করা ও প্রচুর পানি পান করা জরুরি। আবহাওয়া খুব দ্রুত বদলায়। তাই গরম কাপড়, সানগ্লাস, সানস্ক্রিন অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।
- নগদ অর্থ রাখা প্রয়োজন। কারণ অনেক জায়গায় ডিজিটাল পেমেন্ট নেই।
- তিব্বতিরা ধর্মপ্রাণ। তাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি।
- ইন্টারনেট সীমিত। আগে থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য ডাউনলোড করে রাখা ভালো।











