প্রকৃতিকে বাঁচাবে জিন এডিটিং!

ছবি: এআই
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আমাদের আশপাশেই বিচরণ করা বহু প্রজাতি আজ অস্তিত্ব সংকটে। বাঁচার উপায়? বিজ্ঞানীদের একদল ভাবছে জিন এডিটিংয়ের কথা। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
ব্রিটেনের জলাভূমির ধারে গ্রীষ্মকালে দেখা মেলে একটি সুন্দর প্রজাপতির। নাম সোয়ালোটেইল। হলুদ-ক্রিম রঙের ডানায় কালো নকশা, নীল ও লাল দাগ এবং পেছনে লেজের মতো অংশ— দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। এটি দেশটির সবচেয়ে বড় স্থানীয় প্রজাপতি। কিন্তু ব্রিটেনে এই প্রজাপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তিত। এখন এটি মূলত পূর্ব ইংল্যান্ডের নরফোক ব্রডস এলাকার জলাভূমিতে সীমাবদ্ধ। জলাভূমি নষ্ট হওয়া, সমুদ্রের পানি ঢুকে পড়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যগাছের সংকট প্রজাতিটির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন বিজ্ঞানীরা একটি নতুন প্রশ্ন করছেন— প্রকৃতি যদি নিজে যথেষ্ট দ্রুত বদলাতে না পারে, তাহলে মানুষ কি প্রযুক্তির সাহায্যে তাকে একটু দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি— জিন এডিটিং।
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের ভেতরে থাকে ডিএনএ। খুব সহজভাবে বললে, ডিএনএ হলো জীবদেহ তৈরির নির্দেশনার একটি বিশাল বই। এই বইয়ের ছোট ছোট অংশকে বলা হয় জিন। কোন প্রাণীর শরীর কেমন হবে, সে কীভাবে বেড়ে উঠবে এবং কিছু রোগ বা পরিবেশগত সমস্যার বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধক্ষমতা কেমন হবে— এসবের সঙ্গে জিনের সম্পর্ক আছে।
জিন এডিটিং হলো ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনার প্রযুক্তি। অনেকটা গল্পের এমন লাইন বদলানোর মতো, যাতে পুরো ঘটনাই বদলে যায়। এই কাজের সবচেয়ে পরিচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো সিআরআইএসপিআর-ক্যাস৯। একে সহজ ভাষায় বলা হয় ‘জিনের কাঁচি’। বিজ্ঞানীরা এমনভাবে এই কাঁচিকে পরিচালনা করতে পারেন, যাতে এটি ডিএনএর নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে কাটতে পারে। এরপর সেই জায়গায় পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।
এই প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানী জেনিফার ডাউডনা ও ইমানুয়েল শারপঁতিয়ে ২০২০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।
সাধারণভাবে আমরা ভাবি, বিপন্ন প্রাণীকে বাঁচাতে হলে তার বাসস্থান রক্ষা করতে হবে, শিকার বন্ধ করতে হবে কিংবা খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। এগুলো এখনো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদের পক্ষে প্রাকৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
জিন এডিটিং হলো ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনার প্রযুক্তি। অনেকটা গল্পের এমন লাইন বদলানোর মতো, যাতে পুরো ঘটনাই বদলে যায়
এই সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজতে যুক্তরাজ্যের অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড ইনভেনটরি বা এরিয়া ৫ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের ‘এক্সিলারেটেড অ্যাডাপ্টেশন’ কর্মসূচি নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তির সাহায্যে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদকে জলবায়ু পরিবর্তন, রোগ, দূষণসহ বিভিন্ন নতুন সমস্যার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা। কর্মসূচিতে ১৪টি গবেষক দল প্রাথমিকভাবে তিন কোটি পাউন্ডের অর্থ পেয়েছে।
এর একটি প্রকল্পে ব্রিটিশ সোয়ালোটেইল প্রজাপতির মধ্যে কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। কৃষিক্ষেতে ব্যবহৃত কিছু কীটনাশক ক্ষতিকর পোকামাকড়ের পাশাপাশি অন্যান্য পতঙ্গের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষকরা দেখতে চান, নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে উপকারী বা বিপন্ন পতঙ্গকে এমন চাপ সহ্য করার ক্ষমতা দেওয়া যায় কি না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি এখনো গবেষণার পর্যায়ে। এর অর্থ এই নয় যে জিন বদলে দেওয়া প্রজাপতি এরই মধ্যে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
শুধু প্রজাপতি নয়, এই কর্মসূচিতে ওক গাছ নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। ওক একটি গুরুত্বপূর্ণ গাছ। এর ওপর অনেক প্রাণী, পোকামাকড় ও অন্যান্য জীব নির্ভর করে। কিন্তু গাছের একটি বড় সমস্যা হলো— এরা মানুষের তুলনায় খুব ধীরে প্রজন্ম বদলায়।
জলবায়ু যদি কয়েক দশকের মধ্যে দ্রুত বদলে যায়, তাহলে একটি গাছের প্রাকৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। গবেষকরা তাই এমন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতের বেশি গরম বা শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে পারে— এমন বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা যায়। ওক গাছের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় বড় প্রশ্ন।
প্রকৃতিতে কোনো প্রাণী একা থাকে না। একটি প্রজাপতি শুধু একটি প্রজাপতি নয়। সে কোনো গাছের ওপর নির্ভর করে, কোনো পাখি তাকে খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, আবার সে নিজেও অন্য জীবের খাদ্য হতে পারে।
তাই একটি প্রাণীর জিন বদলে দিলে তার প্রভাব শুধু সেই প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
ধরা যাক, কোনো প্রজাপতিকে কীটনাশক সহ্য করার ক্ষমতা দেওয়া হলো। তাহলে সেই প্রজাপতির সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু তার সংখ্যা বেড়ে গেলে সে কোন উদ্ভিদ বেশি খাবে? অন্য প্রাণীর খাদ্য হিসেবে কী পরিবর্তন ঘটবে? পরিবেশের ভারসাম্যে কী প্রভাব পড়বে? এসব প্রশ্নের সব উত্তর আগে থেকে জানা কঠিন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভুলের শঙ্কা। গবেষণাগারে কোনো পরিবর্তনের খারাপ ফল দেখা গেলে পরীক্ষা বন্ধ করা যায়। কিন্তু পরিবর্তিত কোনো প্রাণী যদি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানে বংশবিস্তার করে, তাকে আবার পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হতে পারে।
এ কারণেই জিন এডিটিং নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে। নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা যত বড়, তার ঝুঁকিও তত ভালোভাবে বোঝা দরকার। বিশেষ করে এমন কোনো পরিবর্তন যদি বংশের পর বংশ ধরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাহলে ছোট একটি ভুল ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
তাই এখনই জিন বদলে দেওয়া প্রাণী বা গাছকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। এরিয়া কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রথমে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এসব প্রযুক্তি পরীক্ষা করা এবং সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বোঝা। যুক্তরাজ্যে জিনগতভাবে পরিবর্তিত জীব পরিবেশে ছাড়ার ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম ও সরকারি অনুমতির ব্যবস্থা রয়েছে।
তাহলে জিন এডিটিং কি ভালো, নাকি খারাপ?
এর সহজ উত্তর হলো— এটি ভালো বা খারাপ কোনো একটিই নয়; কীভাবে এবং কতটা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।



