পৃথিবীজুড়ে বিপর্যয় নামলে কোন দেশ সবচেয়ে নিরাপদ?

যদি সত্যিই কোন বৈশ্বিক বিপর্যয় নেমে আসে, যার ধাক্কায় পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে? ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি
হিমালয়ের উঁচুতে হঠাৎ ভেঙে পড়ল একটি হিমবাহের অংশ। সঙ্গে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ধস। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি উপত্যকার দিকে ধেয়ে এল প্রবল স্রোত। সেই আকস্মিক ঢল থেকে ভয়াবহ বন্যায় ডুবে গেল নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা। রাস্তা, সেতু, বসতি সবকিছু যেন প্রকৃতির কয়েক মুহূর্তের তাণ্ডবে তছনছ।
নেপালের সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, বড় বিপর্যয় সব সময় ধীরে ধীরে আসে না। কখনো তা আসে এক মুহূর্তে। পাহাড়ের ওপর কোথাও বরফ ভেঙে পড়ে, কোথাও নদী তার স্বাভাবিক গতিপথ বদলে ফেলে, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জনপদ ডুবে যায়।
আজ নেপালে হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যা। পৃথিবীর অন্য কোথাও দাবানল, ঘূর্ণিঝড় কিংবা ভূমিকম্প। এর বাইরে আছে জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন মহামারির আশঙ্কা, পারমাণবিক যুদ্ধ, বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কিংবা পৃথিবীতে গ্রহাণুর আঘাতের মতো ভয়ংকর সম্ভাবনা।
তাহলে সত্যিই যদি একদিন এমন কোনো বৈশ্বিক বিপর্যয় নেমে আসে, যার ধাক্কায় পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে? তখন কোথায় গেলে মানুষ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে?
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা নেই, যা সব ধরনের বিপর্যয় থেকে পুরোপুরি নিরাপদ। তবে বিভিন্ন বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় একটি দেশের টিকে থাকার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি। আর সেটি হলো অস্ট্রেলিয়া।
জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব হাগেনের পরিবেশবিজ্ঞানী ফ্লোরিয়ান উলরিখ ইয়েনের নেতৃত্বে একদল গবেষক বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে হওয়া শত শত গবেষণা ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছেন। গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণায় তারা খুঁজে দেখেছেন, বড় ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয় দেখা দিলে কোন দেশগুলো নিজেদের সমাজ ও মানুষের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।
গবেষকদের ভাষায়, পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়গুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমটি হলো আকস্মিক সূর্যালোক হ্রাসের পরিস্থিতি। বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, পারমাণবিক যুদ্ধের পর সৃষ্টি হওয়া ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ বা বড় কোনো গ্রহাণুর আঘাতে বায়ুমণ্ডলে ধুলা ও ধোঁয়ার এমন স্তর তৈরি হতে পারে, যা সূর্যের আলোকে ব্যাপকভাবে আটকে দেবে। এতে খাদ্য উৎপাদনসহ পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
দ্বিতীয় ধরনের ঝুঁকি হলো বৈশ্বিক অবকাঠামো বিপর্যয়। এতে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়, বড় ধরনের সাইবার হামলা, মহামারি বা উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় তরঙ্গ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
তৃতীয়টি হলো বৈশ্বিক বিপর্যয়কর জৈবিক ঝুঁকি। প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট কোনো জৈবিক হুমকি যদি ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায় এবং একটি বা একাধিক মহাদেশজুড়ে সমাজব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, সেটি এই শ্রেণির মধ্যে পড়বে।
তবে শুধু বিপদ কতটা বড়, সেটিই নয়; বিপদের সময় একটি দেশ কতটা টিকে থাকতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা এই সক্ষমতাকেই বলছেন ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা রেজিলিয়েন্স।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী, শিল্পভিত্তি বড়, সামাজিক বৈষম্য তুলনামূলক কম, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা আছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার সক্ষমতা বেশি, সেসব দেশ বড় বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকে। ভৌগোলিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এই সব দিক বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়াকে সবচেয়ে এগিয়ে পেয়েছেন গবেষকেরা।
ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন একটি বড় দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া প্রয়োজনে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করার সুযোগ পায়। দেশটিতে ব্যাপক খাদ্য উৎপাদন হয়। আছে বড় শিল্প ও খনিজ খাত। জীবাশ্ম জ্বালানিরও যথেষ্ট মজুত রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং রাজনৈতিকভাবেও তুলনামূলক স্থিতিশীল দেশটি।
গবেষকদের মতে, তিন ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধেই স্থিতিস্থাপক দেশ হিসেবে সরাসরি সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, মহাবিপর্যয় নেমে এলে অস্ট্রেলিয়া হবে পৃথিবীর কোনো ‘নিরাপদ দুর্গ’।
গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, অস্ট্রেলিয়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি, ওষুধ ও সারসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ চালু রাখা দেশটির জন্য জরুরি। অর্থাৎ, দ্বীপ হওয়ার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি সেটিই আবার কোনো কোনো পরিস্থিতিতে দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে। তাই গবেষকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো- পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে গিয়ে সব ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে নিশ্চিন্তে বাঁচা যাবে।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট








