বর্শার আঘাতে ধরাশায়ী নিয়ান্ডারথাল

নিয়ান্ডারথালের কাঁধের হাড়ে পাওয়া গেছে গোলাকার ১৫ মিলিমিটারের ছিদ্র। ছবি: এআই
প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর ইতিহাস মানেই অন্ধকার, রহস্য আর টিকে থাকার এক নির্মম লড়াই। সম্প্রতি প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি আবিষ্কার সেই সুদূর অতীতের পর্দা সরিয়ে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে ৭৫ হাজার বছর আগের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শানিদার গুহা’ থেকে পাওয়া এক নিয়ান্ডারথালের জীবাশ্মে মিলেছে ধারালো কাঠের বর্শার গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রকাশিত এই গবেষণা বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, এটি মানবজাতির বিবর্তনের ইতিহাসে বর্শার আঘাতে বা কোনো অস্ত্র দিয়ে হত্যার প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হতে পারে।
জাগরোস পর্বতমালায় অবস্থিত শানিদার গুহাটি প্রাগৈতিহাসিক মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল। সেখানে ‘শানিদার এ’ নামে পরিচিত আনুমানিক ৪৫ বছর বয়সী এক নিয়ান্ডারথালের বাম কাঁধের হাড়ে পাওয়া গেছে ১৫ মিলিমিটারের একটি গোলাকার ছিদ্র।
আধুনিক স্ক্যানিং ও থ্রি-ডি ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে হাড়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, এই ছিদ্র কোনো সাধারণ হাড় ক্ষয় বা পশুর কামড়ের চিহ্ন নয়। কোনো এক ধারালো কাঠের বর্শা ওপর থেকে তীব্র শক্তিতে সোজা তার বুক ও ফুসফুস ভেদ করে পিঠের হাড় পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আঘাতের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে হাড়ের কিছু ক্ষুদ্র অংশ ছিটকে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। মুহূর্তেই সে মারা যায়।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, নিয়ান্ডারথালের দেহের এই ক্ষতের প্রকৃতি ও আঘাতের কোণ ইঙ্গিত করে, এটি সরাসরি একটি ‘কিল শট’ বা প্রাণঘাতী আক্রমণ ছিল। তবে গবেষকরা দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলছেন।
এটি হতে পারে দুজন নিয়ান্ডারথালের মধ্যকার কোনো লড়াই অথবা তখনকার আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের মধ্যবর্তী সংঘর্ষের ফলাফল।
এ ছাড়া সে সময়ে বিশালাকার ম্যামথ বা প্রাগৈতিহাসিক পশু শিকার করার সময় নিয়ান্ডারথালরা কাছে গিয়ে শক্ত কাঠের বর্শা বিঁধিয়ে দিত। কোনো পশুর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের সময় অসাবধানতাবশত বা দুর্ঘটনাবশত সঙ্গীর বর্শার আঘাতেও এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
কাঠ যেহেতু যুগের পর যুগ মাটিতে টিকে থাকে না এবং পচে যায়, তাই অস্ত্রটির অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। তবে হাড়ের ভেতরের মসৃণ গোলাকার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট করে দেয়, কোনো ধারালো শক্ত কাঠের চোখা মুখই এই আঘাত হেনেছিল। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, শানিদার গুহায় পাওয়া এই নিয়ান্ডারথালটি শুধু সহিংসতারই শিকার ছিল না; বরং তার জীবন ছিল ভালোবাসা ও পরিচর্যার এক অনবদ্য দলিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুর অন্তত এক বছর বা তারও আগে নিয়ান্ডারথালটির মুখে ও দাঁতে এক ভয়াবহ আঘাত লেগেছিল। সেই গুরুতর আঘাতে তার মুখের একপাশ পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে খাবার চিবানো বা কথা বলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকা সেই আদিম যুগে এমন গুরুতর আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল।
কিন্তু হাড়ের ভেতরের নিরাময় বা হিলিং চিহ্ন প্রমাণ করে, আঘাত পাওয়ার পরও সে দীর্ঘদিন বেঁচে ছিল। এর অর্থ একটাই— তার দল বা পরিবারের অন্য নিয়ান্ডারথাল সদস্যরা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে যত্ন করেছিল, খাবার চিবিয়ে খাইয়ে দিয়েছিল এবং তাকে রক্ষা করেছিল।
একই নিয়ান্ডারথালের দেহে আমরা চরম সহিংসতা এবং প্রগাঢ় অনুকম্পার সমান্তরাল প্রমাণ দেখতে পাচ্ছি। একদিকে তাদের নির্মমতা, অন্যদিকে তাদের একে অপরের প্রতি গভীর যত্নশীলতা, যা আধুনিক মানুষের আচরণেরই প্রতিফলন।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট



