চমকে উঠলেই চোখের মণি বড় হয় কেন?

প্রতীকী ছবি
গভীর রাত। থমথমে নীরব রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরছেন। চারিদিক সুনসান। মানুষের টিকিটিও নেই। হঠাৎ পেছনে অচেনা কোন প্রাণী ডেকে উঠল। চমকে উঠলেন আপনি। মুহূর্তেই বেড়ে গেল হৃদস্পন্দন, শরীর সজাগ হয়ে উঠল। কিন্তু জানেন কি, একই সময়ে আপনার চোখের মণিও বড় হয়ে যেতে পারে? আর এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের বেশ মজার এক ‘রিফ্রেশ বাটন’!
অন্ধকার ঘরে ঢুকলে চোখের মণি বড় হয়—এ কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। বেশি আলো ভেতরে ঢুকিয়ে ভালোভাবে দেখার জন্যই এমনটা ঘটে। আবার উজ্জ্বল আলোয় চোখের মণি ছোট হয়ে যায়। তবে আলোই চোখের মণির আকার বদলের একমাত্র কারণ নয়। বিস্ময়, মানসিক চাপ, উত্তেজনা, মনোযোগ, শারীরিক পরিশ্রম কিংবা আবেগের কারণেও চোখের মণি বড় হতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিস্ময় ও চোখের মণির এই সম্পর্কের নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে মস্তিষ্ক যেন পুরোনো চিন্তার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন পরিস্থিতির জন্য নিজেকে দ্রুত প্রস্তুত করে। আর চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়া সেই পরিবর্তনের দৃশ্যমান সংকেতগুলোর একটি।
মস্তিষ্কে যেন ‘রিফ্রেশ’ বাটন
গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা যখন এমন কিছু দেখি বা শুনি, যা মোটেও প্রত্যাশা করিনি, তখন মস্তিষ্ক সাময়িকভাবে এক ধরনের উচ্চ সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘অ্যারাউজাল রেসপন্স’ বা তাৎক্ষণিক সজাগ হয়ে উঠার প্রতিক্রিয়া।
এই সময় মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেমে থাকা ছোট্ট একটি অংশ, যাকে লোকাস কোরুলিয়াস বলে, সেটি বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এখান থেকে নরএপিনেফ্রিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা শরীরের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ বা বিপদ মোকাবিলার প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সহজ ভাষায় বললে, মস্তিষ্ক যেন বলে, ‘আরে! ব্যাপারটা তো আমার ধারণামতো হলো না। পুরোনো হিসাব বাদ দাও, নতুন করে ভাবতে হবে!’ এই ‘নতুন করে ভাবার’ প্রক্রিয়াতেই চোখের মণি বড় হতে পারে।
৬৩ জনকে নিয়ে মজার পরীক্ষা
গবেষকেরা ৬৩ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে একটি পরীক্ষা চালান। অংশগ্রহণকারীদের পর্দায় বিভিন্ন রঙের ছবি দেখানো হয়। শুরুতে তাদের দেখা রং মনে রাখতে বলা হয়। পরে আগের ছবিগুলোর ধরন দেখে পরের ছবিতে কোন রং আসতে পারে, তা অনুমান করতে বলা হয়।
কিন্তু মাঝেমধ্যে গবেষকেরা এমন রং দেখান, যা অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছিল না। আর তখনই দেখা যায়, তাদের চোখের মণি বড় হচ্ছে। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যকলাপেও পরিবর্তন দেখা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিস্ময় অংশগ্রহণকারীদের নতুন পরিস্থিতি থেকে দ্রুত শিখতে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ, ভুল অনুমানের সঙ্গে জেদ ধরে বসে থাকার বদলে মস্তিষ্ক দ্রুত নিজের ধারণা বদলাতে পেরেছে।
পুরোনো ধারণা ঝেড়ে নতুন করে শেখা
বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা কোনো পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মস্তিষ্ক একধরনের ‘অটোপাইলট’ মোডে চলে যায়। আমরা আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে থাকি। কিন্তু হঠাৎ অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে সেই অটোপাইলট যেন বন্ধ হয়ে যায়।
চোখের মণি বড় হওয়া তখন শুধু চমকে ওঠার লক্ষণ নয়; এটি মস্তিষ্কের পক্ষ থেকে এক ধরনের ঘোষণা—‘নতুন পরিস্থিতি এসেছে, মনোযোগ দাও!’
তাই পরেরবার হঠাৎ কোনো চমকপ্রদ খবর শুনে কারও চোখ বড় বড় হতে দেখলে শুধু ‘ভয় পেয়েছে’ ভাববেন না। হতে পারে, তার মস্তিষ্ক তখন পুরোদমে পুরোনো চিন্তা ঝেড়ে নতুন বাস্তবতার জন্য নিজেকে রিফ্রেশ করছে। বিস্ময় শুধু আমাদের চমকে দেয় না, কখনো কখনো নতুন করে শেখার জন্য মস্তিষ্কের দরজাটাও খুলে দেয়।
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট







