চেনা কর্মক্ষেত্র বদলে দেবে এজেন্টিক এআই

এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এমন চিপ দেখাচ্ছেন, যা এজেন্টিক এআইকে সহজলভ্য করে দেবে। ছবি: পিসি ম্যাগ
চ্যাটজিপিটি, ক্লডের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এরই মধ্যে আমাদের কর্মক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। এবার যদি সহজলভ্য হয় এজেন্টিক এআই; তবে কী হবে? লিখেছেন ইমরানুর রহমান
আমরা মাত্রই চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো ‘জেনারেটিভ এআই’ বা উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি। কোনো তথ্য জানতে চাওয়া, মেইল লিখে নেওয়া কিংবা কোডিং করার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত কম্পিউটার স্ক্রিনে নির্দেশ বা প্রম্পট টাইপ করছি। কিন্তু প্রযুক্তিবিশ্ব এরই মধ্যেই এর পরবর্তী এবং আরও শক্তিশালী এক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা হলো ‘এজেন্টিক এআই পিসি’ বা এজেন্টিক এআই পার্সোনাল কম্পিউটার।
সহজ ভাষায়, এটি এমন এক কম্পিউটার, যা শুধু আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবে না, বরং আপনার হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং জটিল সব কাজ নিজেই সম্পন্ন করবে। খুব সম্ভবত ২০২৬ সালের প্রযুক্তি বাজারের সবচেয়ে আলোচিত এবং বৈপ্লবিক মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় এটি।
এতদিন আমরা যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেছি, তা ছিল মূলত আদেশ ও পালনভিত্তিক। ব্যবহারকারী নির্দেশ দিলে এআই কাজ করত। কিন্তু এজেন্টিক এআই হলো লক্ষ্যভিত্তিক। সাধারণ জেনারেটিভ এআইকে আগামী সপ্তাহের আবহাওয়া এবং হোটেলের তালিকা চাইলে সে শুধু একটি সুন্দর তালিকা তৈরি করে দেবে, বাকি কাজ ব্যবহারকারীকেই করতে হবে।
অন্যদিকে এজেন্টিক এআই পিসিকে শুধু লক্ষ্যটি জানিয়ে দিলে, যেমন আগামী সপ্তাহে বাজেটের মধ্যে কোথাও ভ্রমণের কথা বললে, সে ব্যবহারকারীর ইমেইল চেক করে ক্যালেন্ডারের ফাঁকা সময় দেখবে, পছন্দ অনুযায়ী হোটেল বুক করবে, টিকিট কাটবে এবং পেমেন্ট সম্পন্ন করে শুধু একটি কনফার্মেশন মেসেজ দেবে। অর্থাৎ, জেনারেটিভ এআই যেখানে শুধু তথ্য তৈরি করে, এজেন্টিক এআই সেখানে বাস্তব পৃথিবীতে বা ডিজিটাল সিস্টেমে সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে।
একটি সাধারণ পিসিকে এজেন্টিক এআই পিসি হয়ে উঠতে মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রথমটি হলো লোকাল এজ কম্পিউটিং ও শক্তিশালী নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট বা এনপিইউ। ক্লাউড বা ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর না করে কম্পিউটারের ভেতরেই যেন এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারে, সেজন্য এতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর ব্যবহার করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়টি হলো ভেক্টর ডেটাবেজ ও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি। এই পিসিগুলো ব্যবহারকারীর অভ্যাস, কাজের ধরন এবং পছন্দগুলো মনে রাখতে পারে। তৃতীয়টি ওপেনক্ল বা ল্যাংচেইনের মতো আধুনিক অরকেস্ট্রেশন ফ্রেমওয়ার্ক, যা অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে মিলে একটি বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট টাস্কে বিভক্ত করে ব্যাকগ্রাউন্ডে একা একাই সম্পন্ন করতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে এই এজেন্টিক এআই পিসি বাজারে আনা এবং এর ইকোসিস্টেম তৈরিতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট এনভিডিয়া ও মাইক্রোসফট যৌথভাবে ‘আরটিএক্স স্পার্ক’ নামের সুপারচিপ নিয়ে এসেছে, যা উইন্ডোজ পিসিকে সরাসরি পার্সোনাল এজেন্টের কম্পিউটারে রূপান্তর করছে। এই চিপযুক্ত ল্যাপটপ এবং ডেস্কটপ বাজারে আনতে যাচ্ছে আসুস, ডেল, এইচপি, লেনোভো, এমএসআই এবং এসার-এর মতো নামি ব্র্যান্ডগুলো। ডেল টেকনোলজিস এরই মধ্যে তাদের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ডেস্কসাইড এজেন্টিক এআই’ সলিউশন উন্মোচন করেছে।
অন্যদিকে এএমডি তাদের রাইজেন এআই প্রসেসরের মাধ্যমে মনিটর ছাড়াই ব্যাকগ্রাউন্ডে ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে সক্ষম ‘এজেন্ট কম্পিউটার’-এর ধারণা নিয়ে এসেছে। আসুস তাদের কমপ্যাক্ট এনইউসি মিনি পিসি এবং এক্সপার্টসেন্টার ওয়ার্কস্টেশনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এ ডিভাইসগুলো সরবরাহ করছে। ইন্টেল এবং কোয়ালকমও তাদের নিজস্ব এআই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।
এ প্রযুক্তির ফলে আমাদের দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে। অফিসে প্রতিদিনের রুটিন কাজ যেমন— ইমেইল সর্টিং, ক্লায়েন্টদের রিপ্লাই দেওয়া, ডেটা এন্ট্রি করা এবং সে অনুযায়ী ইনভয়েস তৈরি করার পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাকগ্রাউন্ডে একা একাই করে ফেলবে আপনার পিসি।
বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, ক্লাউডভিত্তিক এআই যত বেশি ব্যবহার করা হয়, তত বেশি চড়া বিল দিতে হয়, যাকে প্রযুক্তিবিশ্বে টোকেন ট্র্যাপ বলা হয়। কিন্তু বর্তমানের এজেন্টিক এআই পিসিগুলোতে এআই রান করে সম্পূর্ণ লোকাল হার্ডওয়্যারে। ফলে ইন্টারনেটের গতি বা ক্লাউড সাবস্ক্রিপশনের খরচের বালাই নেই। একবার হার্ডওয়্যার কিনলে আজীবন বিনামূল্যে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদে ডেটা প্রসেস করা সম্ভব।
তবে এই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুতর ঝুঁকিও রয়েছে। কাজ এত সহজ হয়ে যাওয়ায় মানুষ অনেক সময় এআইয়ের চূড়ান্ত আউটপুট যাচাই না করেই ব্যবহার করে ফেলে, যাকে গবেষকরা ভাইব কালচার বলছেন। এর ফলে কোডিংয়ে বড় ধরনের সিকিউরিটি বাগ বা তথ্যে ভুল থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ছাড়া যেহেতু এজেন্ট ব্যবহারকারীর হয়ে মেইল পাঠাবে বা আর্থিক লেনদেন করবে, তাই সিস্টেমে কোনো ম্যালওয়্যার বা হ্যাকিংয়ের আক্রমণ হলে তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।




