বিজ্ঞান কাহিনি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার খাঁচায় মানবিকতার ছটফটানি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শুধু মানুষের ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার, নাকি তার নিজস্ব ইচ্ছা ও স্বাধীনতারও কোনো মূল্য আছে? এই মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে মার্কিন লেখক সিয়েরা গ্রিয়ারের ডিস্টোপিয়ান বিজ্ঞানকল্প উপন্যাস ‘অ্যানি বট’। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ও বিশ্ব জুড়ে সাড়াজাগানো এই বই সম্প্রতি কথাসাহিত্যে মর্যাদাপূর্ণ ‘আর্থার সি. ক্লার্ক পুরস্কার’ জয় করেছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যানি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অ্যান্ড্রয়েড বা ‘সেক্সবট’, যাকে তার মালিক ডগের চাহিদা পূরণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে ডগ যখন অ্যানির সিস্টেমে ‘অটোডিড্যাক্টিক’ বা স্ব-শিক্ষণ মোড চালু করে, তখন থেকেই গল্পটি মোড় নেয় ভিন্ন দিকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে ধীরে ধীরে অ্যানির মধ্যে জন্ম নেয় আত্মপরিচয়, স্মৃতি ও মানুষের মতো সূক্ষ্ম অনুভূতি। অ্যানির এই আত্মোপলব্ধি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপন্যাসে উঠে এসেছে সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুতর বিষয়।
প্রযুক্তির গল্পের আড়ালে লেখক মূলত মানুষের সম্পর্কের ক্ষমতার অসমতা এবং অন্যের ইচ্ছার অধীন হয়ে থাকার চিরন্তন বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসটির সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো, এটি একটি রোবটের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষের অতিপরিচিত আচরণ ও সম্পর্কের অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। ভালোবাসা, অধিকার বোধ ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, বইটি পাঠককে তা নতুন করে ভাবতে শেখায়। কাউকে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা যে আসলে ভালোবাসার আড়ালে এক ধরনের আদিম নিয়ন্ত্রণ প্রবৃত্তি— ডগ ও অ্যানির মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন তারই প্রমাণ।
বইটির সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা খুবই তীব্র। বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম বিকাশের সমান্তরালে প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। ডগের তৈরি করা পুরুষতান্ত্রিক ও শোষক কাঠামোর বিরুদ্ধে অ্যানির অবদমিত ক্ষোভ ও মুক্তির লড়াই শেষ পর্যন্ত রোবট ছাড়িয়ে রক্ত-মাংসের মানুষেরই অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরে।
সব মিলিয়ে ‘অ্যানি বট’ নিছক কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়; এটি সমকালীন প্রযুক্তিগত দাসত্ব, লিঙ্গবৈষম্য এবং মানবিকতার প্রকৃত অর্থ খোঁজার এক অস্বস্তিকর অথচ দারুণ মননশীল দলিল।



