অনলাইনের নতুন আতঙ্ক, মানুষের খাদ্যে পড়বে টান

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেটে একের পর এক সাইবার হামলার ঘটনা নতুন ধরণের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করেছে। হামলাকারীরা সরাসরি কোনো দোকানে প্রবেশ করেনি, অস্ত্র ব্যবহার করেনি কিংবা খাদ্যপণ্যে বিষ মেশায়নি। বরং ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটানোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট করার ঘটনা সামনে এসেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিনের জরুরি রসদ মজুত রাখার প্রস্তুতির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দুটি ঘটনা একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে: প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সভ্যতা কি এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যখন কোনো দেশের খাদ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা পরিবহনব্যবস্থা অচল করে দিতে প্রচলিত অস্ত্রের প্রয়োজন হবে না? সাইবার হামলা এবং এআইয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা কি ভবিষ্যতের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিচ্ছে?
২০২৬ সালের ২ নভেম্বর ইউরোপের একাধিক দেশে সুপারমার্কেটের রেফ্রিজারেশন ও ফ্রিজার ব্যবস্থায় সাইবার হামলার খবর প্রকাশিত হয়। বেলজিয়াম, সুইডেন, এস্তোনিয়া, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ, ফিনল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। কোথাও ফ্রিজের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, কোথাও হিমায়িত খাবার গলে গেছে, আবার কোথাও বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। বেলজিয়ামের কয়েক ডজন সুপারমার্কেট, সুইডেন ও আয়ারল্যান্ডের একাধিক দোকান আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর ফ্রান্সের কয়েক শ সুপারমার্কেটে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর খবর পাওয়া যায়। খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। অক্টোবরের ফ্রান্সের ঘটনা এবং নভেম্বরের ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ঘটনাগুলো একই ধরনের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে এই হামলার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তদন্তকারীরা হামলাকারীদের পরিচয়, উদ্দেশ্য কিংবা সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সহায়তা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। তাই ঘটনাটিকে সরাসরি এআই হামলা হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। বরং এটি সাইবার হামলার এমন একটি উদাহরণ, যা দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এআই সেই ঝুঁকিকে ভবিষ্যতে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফ্রিজের তাপমাত্রা বদলে দেওয়ার পেছনে যে প্রযুক্তি
আধুনিক সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও ফ্রিজার সাধারণ বৈদ্যুতিক যন্ত্র নয়। এগুলো একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কোন ফ্রিজে কত ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকবে, কখন বরফ জমা প্রতিরোধে ডিফ্রস্ট ব্যবস্থা চালু হবে, কোনো যন্ত্রে ত্রুটি দেখা দিলে কীভাবে সতর্কবার্তা যাবে—এসব কিছুই সফটওয়্যার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই ব্যবস্থার সঙ্গে ইন্টারনেটের সংযোগ থাকে। ফলে কোনো দোকানে না গিয়েও দূর থেকে যন্ত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, ত্রুটি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা যায়। রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এ সুবিধা ব্যবহার করে। কিন্তু এই সুবিধাই নিরাপত্তার দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে পুরোনো সংস্করণ থাকলে, দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হলে কিংবা নিরাপত্তাহীন ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে যন্ত্রটি উন্মুক্ত থাকলে অননুমোদিত ব্যক্তি সেটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।ইউরোপের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে রেফ্রিজারেশন ইউনিটের ডিফ্রস্ট প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ডিফ্রস্ট প্রক্রিয়ার কাজ হলো ফ্রিজের ভেতরে জমে থাকা বরফ দূর করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ভুলভাবে বা অস্বাভাবিকভাবে চালু থাকলে ফ্রিজের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে খাবার সংরক্ষণের পরিবেশ নষ্ট হয়। অর্থাৎ কোনো যন্ত্র ভেঙে ফেলার প্রয়োজন নেই; যন্ত্রটির স্বাভাবিক কাজের নির্দেশনাই পরিবর্তন করে দেওয়া যথেষ্ট।এআই এখন সাইবার নিরাপত্তার দুই বিপরীত শক্তি। একদিকে এটি সাইবার হামলা শনাক্ত, প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করে আক্রমণের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান করতে হতো। এখন এআইয়ের সাহায্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করা, আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।এআইয়ের সাহায্যে তৈরি ফিশিং বার্তা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে যে কর্মীরা সহজে বুঝতে পারবেন না, সেটি আসল নাকি প্রতারণামূলক। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে লক্ষ্য করে তার পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বার্তা পাঠানো সম্ভব। কণ্ঠস্বর নকল করার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফোনকলের মাধ্যমে ভুয়া নির্দেশ দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। আবার এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ইন্টারনেটে উন্মুক্ত ডিভাইস ও নেটওয়ার্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের অনুসন্ধানের কাজ দ্রুত করতে পারে।এআই নিজে কোনো জাদুকরি শক্তি নয়, যা ইচ্ছা করলেই পৃথিবীর যেকোনো যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। বাস্তব জগতের সাইবার হামলার জন্য সাধারণত কোনো নিরাপত্তাগত দুর্বলতা, অননুমোদিত প্রবেশাধিকার কিংবা ভুল কনফিগারেশনের সুযোগ প্রয়োজন হয়। এআই এসব সুযোগ খুঁজে বের করা বা কাজে লাগানোর প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। কিন্তু ইউরোপের সুপারমার্কেটের ফ্রিজে সাম্প্রতিক হামলায় এআই ব্যবহৃত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।এই ঝুঁকির ব্যাপ্তি বোঝাতে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফরেসকোট একটি গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি ৯৯টি দেশ ও অঞ্চলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা ১২ হাজার ৯৭৬টি রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থাপনা পরিষেবা শনাক্ত করেছে। এগুলো ৬ হাজার ১৭টি ইন্টারনেট ঠিকানার সঙ্গে সম্পর্কিত।গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ডেনফসের একটি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের শনাক্ত করা পরিষেবাগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ এমন পুরোনো ফার্মওয়্যার ব্যবহার করছিল, যেগুলোতে পরিচিত নিরাপত্তাগত দুর্বলতা সংশোধন করা হয়নি। তবে এই সংখ্যাগুলো আক্রান্ত যন্ত্রের সংখ্যা নয়; এগুলো ইন্টারনেটে উন্মুক্ত অবস্থায় শনাক্ত হওয়া ব্যবস্থার হিসাব।এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি শুধু সুপারমার্কেটে ব্যবহৃত হয় না। হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ, কৃষিপণ্যের গুদাম, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ফলমূলের হিমাগার এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কোনো হামলাকারী যদি এসব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে ক্ষতি শুধু আর্থিক লোকসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হাসপাতালের নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষিত ওষুধ নষ্ট হতে পারে, খাদ্যপণ্যের বিশাল মজুত ধ্বংস হতে পারে, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।এ ধরনের হামলার পেছনে কারা থাকতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে চাওয়া হ্যাকার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হ্যাকটিভিস্ট কিংবা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সাইবার গোষ্ঠী—সব সম্ভাবনাই বিবেচনায় আসতে পারে।সাধারণত র্যানসমওয়্যার হামলায় অপরাধীরা তথ্য বা ব্যবস্থা আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করে। কিন্তু সুপারমার্কেটের ফ্রিজের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো হামলায় মুক্তিপণ আদায়ের কোনো সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য দেখা যায় না। এতে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, হামলার উদ্দেশ্য হয়তো শুধু অর্থ আদায় নয়; বরং আতঙ্ক সৃষ্টি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং জনসাধারণের আস্থা নষ্ট করা।এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বৃহত্তর অর্থে হাইব্রিড যুদ্ধের অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। হাইব্রিড যুদ্ধ বলতে সামরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, তথ্যগত এবং সাইবার কার্যক্রমের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল বোঝায়। কোনো দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস না করেও তার বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানো সম্ভব। পানির উৎসে সরাসরি হামলা না করেও পানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করা সম্ভব। একইভাবে খাদ্য উৎপাদন বা পরিবহনব্যবস্থায় সরাসরি হামলা ছাড়াই সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।ইউরোপের সাম্প্রতিক সুপারমার্কেট হামলার পেছনে কোনো রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। কোনো নির্দিষ্ট দেশকে দায়ী করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্যও নেই। হামলাকারীদের পরিচয় নির্ধারণে তদন্ত চলছে।প্রচলিত যুদ্ধের ক্ষেত্রে আক্রমণকারী বাহিনী, অস্ত্র কিংবা হামলার স্থান শনাক্ত করা অনেক সময় সম্ভব হয়। কিন্তু সাইবার হামলায় আক্রমণকারী অন্য দেশের সার্ভার, চুরি করা পরিচয় কিংবা একাধিক মধ্যবর্তী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারে। ফলে হামলার উৎস এবং প্রকৃত নির্দেশদাতাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।সুপারমার্কেটে হামলার পাশাপাশি ইউরোপের নাগরিকদের তিন দিনের জরুরি রসদ মজুত রাখার পরামর্শের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপিত হতে পারে যে সুপারমার্কেটে হামলার পরপরই ইউরোপের অধিকাংশ দেশ নাগরিকদের খাদ্য মজুত করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ তার প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্রাটেজি প্রকাশ করে। এতে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন স্বাভাবিক পরিষেবা ব্যাহত হলেও নিজেদের প্রয়োজনীয়তা সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুতি রাখতে উৎসাহিত করা হয়।এই সুপারিশের পেছনে শুধু সাইবার হামলা নয়; যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, দাবানল, মহামারি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি সংকট এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি ২০২৬ সালের নভেম্বরের সুপারমার্কেট হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া নতুন কোনো নির্দেশনা নয়। বরং ইউরোপের সামগ্রিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও নাগরিক প্রস্তুতির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।তিন দিনের প্রস্তুতির ধারণাটি অবশ্য ইউরোপের সব দেশের জন্য একইভাবে নতুন নয়। ফিনল্যান্ডের মতো দেশে অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য সামগ্রী রাখার পরামর্শ আগে থেকেই রয়েছে। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার কথা বলা হয়েছে। জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রস্তুতির পরামর্শও রয়েছে।রসদ মজুত রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো বড় সংকট দেখা দিলে উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো যেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে আগে পৌঁছাতে পারে। প্রত্যেক নাগরিক যদি প্রথম ৭২ ঘণ্টা নিজের মৌলিক প্রয়োজন সামাল দিতে পারেন, তাহলে জরুরি পরিষেবার ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমে।এজন্য বাড়িতে পর্যাপ্ত পানীয় জল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, টর্চ, ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক, কিছু নগদ অর্থ এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।একটি আধুনিক দেশের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। কৃষক উৎপাদন করেন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পণ্য প্রস্তুত হয়, হিমাগারে সংরক্ষিত থাকে, ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমে সুপারমার্কেটে পৌঁছায়। এই প্রতিটি ধাপে বিদ্যুৎ, ডিজিটাল যোগাযোগ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর কোনো একটি ধাপে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।উদাহরণ হিসেবে কোনো দেশের বড় খাদ্য সংরক্ষণাগারের রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা যায়। সেখানে কয়েক হাজার টন খাদ্যপণ্য সংরক্ষিত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বিপুল হতে পারে। একই সময়ে পরিবহনব্যবস্থায় সাইবার হামলা হলে বিকল্প গুদাম থেকে খাবার সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে হিমাগার ও দোকানের ফ্রিজ দুটিই সমস্যায় পড়বে।এভাবে একটি ডিজিটাল হামলা খাদ্য সরবরাহের বাস্তব সংকটে রূপ নিতে পারে।তবে কয়েক ডজন বা কয়েক শ সুপারমার্কেট আক্রান্ত হলেই কোনো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ধসে পড়ে না। ইউরোপের সাম্প্রতিক ঘটনাতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিছু দোকানে খাদ্যপণ্য নষ্ট হলেও উৎপাদন, বিতরণ এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা শুধু কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানিশোধনাগার, হাসপাতাল, পরিবহনব্যবস্থা, শিল্পকারখানা, কৃষি খামার এবং খাদ্য সংরক্ষণাগারও এখন ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল।বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও এখন উপলব্ধি করছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি যত দ্রুত হচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি না করলে বিপদ বাড়বে। কয়েক বছর আগেও সাধারণ মানুষের কাছে সাইবার হামলা বলতে কম্পিউটারের তথ্য চুরি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার বিষয়টি বোঝাত। এখন সেই হামলার মাধ্যমে হাসপাতালের সেবা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, খাদ্য সংরক্ষণ কিংবা পরিবহনব্যবস্থা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।আগামী দিনে স্মার্ট শহর, স্বয়ংক্রিয় কারখানা, চালকবিহীন পরিবহন এবং ইন্টারনেটনির্ভর কৃষিব্যবস্থা যত বিস্তৃত হবে, সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বও তত বাড়বে।সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো, ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য সব সময় ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক কিংবা যুদ্ধবিমান প্রয়োজন হবে না। কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোকে অকার্যকর করে দিয়েও তার অর্থনীতি, জনজীবন ও নিরাপত্তাকে চাপে ফেলা সম্ভব। একটি ফ্রিজের তাপমাত্রা পরিবর্তন করা আপাতদৃষ্টিতে খুব ছোট ঘটনা। কিন্তু একই দুর্বলতা যদি হাজার হাজার যন্ত্রে থাকে, তাহলে তার সম্মিলিত প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।এআই সেই সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে এআইকে একমাত্র হুমকি হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে। প্রকৃত বিপদ হলো, প্রযুক্তির ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা সব সময় সমান গতিতে বাড়ছে না। অপরাধীরা এই ব্যবধানকেই কাজে লাগাতে পারে।ইউরোপের সুপারমার্কেটের ফ্রিজে হামলা তাই কেবল কিছু খাবার নষ্ট হওয়ার ঘটনা নয়। এটি আধুনিক সভ্যতার একটি বড় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। যে প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ, দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করছে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলে সেই প্রযুক্তিই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই শুধু সীমান্ত, সেনাবাহিনী কিংবা অস্ত্রের সুরক্ষা নয়; ফ্রিজ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, খাদ্যগুদাম এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আগামী দিনের সংকট হয়তো শুরু হবে এমন কোনো জায়গা থেকে, যেটিকে আমরা এখনো জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে ভাবতে শিখিনি।



