শরীরের চর্বি হবে যোগাযোগের মাধ্যম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শরীরে থাকা পানি ও চর্বি হবে তথ্য বহনের নতুন কেবল। এই অসম্ভব বিষয়টিই বাস্তব করেছে বিজ্ঞান লিখেছেন জেমাম আহমেদ
কল্পনা করুন, আপনার শরীরের ভেতরের রোগ বা শারীরিক সমস্যা শনাক্ত করছে একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র এবং মুহূর্তের মধ্যে সেই তথ্য শরীরের ভেতর দিয়ে অন্য একটি যন্ত্রে পাঠিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিকিৎসা শুরু করে দিচ্ছে! কোনো তার নেই, নেই ক্ষতিকর ব্লুটুথ তরঙ্গের রেডিয়েশন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই কল্পবিজ্ঞানকেও এবার বাস্তবে রূপ দিতে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। মানবদেহের নিজস্ব চর্বিসহ বিভিন্ন টিস্যু ও পানিকে যোগাযোগের মাধ্যম বানিয়ে এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা, যা আগামী দিনে চিকিৎসার সংজ্ঞা পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকানে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, বিজ্ঞানীদের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার শুরুটা হয়েছিল ল্যাবরেটরির ছোট্ট একটি ইঁদুরকে কেন্দ্র করে। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাটি সাধারণ মনে হতে পারে— ইঁদুরের সামনের পা নড়াচড়া করতেই পেছনের পা-টিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাড়া দিল। কিন্তু এই সাধারণ নড়াচড়ার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ ও জটিল প্রযুক্তি। সাধারণত আমাদের শরীরে মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সংকেত বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছায়। কিন্তু এই পরীক্ষায় স্নায়ুতন্ত্রকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তার বদলে সংকেত পাঠানো হয়েছে শরীরের মাংসপেশি বা টিস্যুর মধ্য দিয়ে! একটি অতিক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক স্পন্দন শরীরের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়ে পেছনের পায়ের স্নায়ুর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে সক্রিয় করে তুলেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি এক নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের এই নতুন আবিষ্কারের নাম স্মার্ট ওয়্যারলেস অটোনমাস নেটওয়ার্কিং সিস্টেম, সংক্ষেপে যাকে বলা হচ্ছে ‘সোয়ানস’। সহজ কথায়, বিজ্ঞানীরা একে মানুষের শরীরের ভেতর একটি কৃত্রিম ডিজিটাল স্নায়ুতন্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন। শরীরের ভেতর পেসমেকার কিংবা ইনসুলিন পাম্পের মতো চিকিৎসাযন্ত্র ব্যবহার করা অবশ্য নতুন কিছু নয়। তবে প্রচলিত ডিভাইসগুলোর বড় সমস্যা হলো সেগুলোর ব্যাটারি ও তারহীন যোগাযোগব্যবস্থা। ব্লুটুথ বা রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে এক যন্ত্র অন্যটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে গেলে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। আর বেশি বিদ্যুৎ মানেই বড় ব্যাটারি। বড় আকারের ব্যাটারি শরীরের গভীরে বা পেশির নিচে স্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
নতুন এই গবেষণা সেই সীমাবদ্ধতাকে একেবারে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। মানুষের শরীরে প্রচুর পানি ও লবণ থাকে, যার কারণে আমাদের শরীরের চর্বিসহ বিভিন্ন টিস্যুগুলো চমৎকার বিদ্যুৎ পরিবাহী। বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরের এই স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। ব্লুটুথ তরঙ্গের বদলে তারা শরীরের ভেতরের টিস্যু ব্যবহার করে ক্ষীণ বা মৃদু বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে সফল হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক অ্যালেক্স আব্রামসনের নেতৃত্বে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। তারা দেখিয়েছেন, শরীরের ভেতর দিয়ে সংকেত পাঠাতে অত্যন্ত কম শক্তির প্রয়োজন হয়। এমনকি যখন কোনো সংকেত আদান-প্রদান হয় না, তখন এই যন্ত্রের বিদ্যুৎ খরচ প্রায় শূন্য বা নগণ্য বললেই চলে। বিদ্যুতের খরচ কমে যাওয়ায় বড় ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়েছে। যন্ত্রগুলোকে এখন এত ছোট আকারে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে যে সাধারণ সিরিঞ্জের সুচের মাধ্যমেই এগুলোকে শরীরের মাংসপেশির গভীরে অনায়াসে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে।
ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, সামনের পায়ে একটি মোশন সেন্সর বা নড়াচড়া শনাক্তকারী যন্ত্র বসানো হয়েছিল। আর পেছনের পায়ের সায়াটিক স্নায়ুর সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি ক্ষুদ্র উদ্দীপক যন্ত্র। সামনের পা নড়লেই সেন্সর সেই তথ্য ইঁদুরের শরীরে পরিধানযোগ্য একটি ছোট্ট নিয়ন্ত্রণযন্ত্রে পাঠায়। সেখান থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত শরীরের ভেতর দিয়ে পেভনের পায়ের ইমপ্ল্যান্টে পৌঁছে যায় এবং পা-টি সংকুচিত হয়। এই পরীক্ষায় প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার বা ১৬ ইঞ্চি দূরত্ব পর্যন্ত সংকেত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, দিনে মাত্র একবার সক্রিয় হলে এই যন্ত্রের ছোট্ট ব্যাটারিটি প্রায় এক বছর পর্যন্ত অনায়াসে টিকে থাকবে।



