নোবেল ২০২৬
স্নায়ুহীন দেহে আলোর ছোঁয়া

এমন এক এককোষী শৈবাল, যার কিনা মস্তিষ্ক নেই। কিন্তু ঠিকই নিজের প্রয়োজনে আলোর উৎস খুঁজে বের করে। কীভাবে? জবাব খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের কপালে জুটল নোবেল। লিখেছেন শুভ রহমান
আমাদের এই বিশাল পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় জীবন তার নিজস্ব অদ্ভুত ও বিস্ময়কর নিয়মে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেয়। মানুষের রয়েছে জটিল মস্তিষ্ক, কোটি কোটি নিউরনের জট পাকানো নেটওয়ার্ক, চিন্তা করার ক্ষমতা এবং চারপাশকে বোঝার অফুরন্ত শক্তি। কিন্তু প্রকৃতির কারসাজি কী অদ্ভুত! কোনো ধরনের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র কিংবা প্রথাগত চোখ না থাকা সত্ত্বেও এমন কিছু অতিক্ষুদ্র জীব পৃথিবীতে রয়েছে, যারা নিখুঁতভাবে জানে আলো কোথায় আছে এবং অন্ধকার কোথায়। পুকুরের শান্ত জলে ভেসে থাকা একরত্তি এককোষী সবুজ শৈবাল ঠিক এভাবেই আলো খুঁজে নেয়। আর প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের এই পরম বিস্ময়কর মেলবন্ধনই এবার মানবজাতিকে এনে দিয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সম্মান।
মস্তিষ্কহীন এই এককোষী শৈবালের বেঁচে থাকার সংগ্রাম এক রূপকথার গল্পের মতো। খালি চোখে যাদের দেখা যায় না, সেই শৈবালগুলোর গায়ে থাকে একটি ক্ষুদ্র কমলা রঙের বিন্দু, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘আইস্পট’ বা চোখের বিন্দু। এটি কোনো চোখ নয়, বরং প্রকৃতির তৈরি এক পরম সূক্ষ্ম আলো ধরার সেন্সর। জার্মানির দুই বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল এই শৈবাল নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন এক জাদুকরী প্রোটিন, যার নাম ‘চ্যানেলরোডপসিন’। প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভিদের এই প্রোটিনের ভেতরে থাকে ভিটামিন এ-এর একটি বিশেষ অণু। বাইরে থেকে যখনই আলোর ফোটন কণা এসে এই অণুতে আঘাত করে, তখন পলকের ভগ্নাংশে প্রোটিনের আকৃতি বদলে যায়। এর ফলে কোষের দরজা বা আয়ন চ্যানেল মুহূর্তের জন্য খুলে যায় এবং বাইরের ধনাত্মক আয়নগুলো ভেতরে প্রবেশ করে এক ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি করে।
শৈবাল যখন জলের ভেতর সাঁতার কাটে, তখন তা নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে থাকে। আলো পাশ থেকে এলে যখনই আইস্পটটি আলোর মুখে পড়ে, তখন বিদ্যুৎ প্রবাহ বেড়ে যায়। অন্যদিকে থাকলে সিগন্যাল কমে যায়। এই বৈদ্যুতিক তারতম্যকে কাজে লাগিয়ে শৈবালের লেজের মতো অংশ বা ফ্ল্যাজেলা গতি বদলে ফেলে। এভাবে কোনো মস্তিষ্ক বা ভাবনার সাহায্য ছাড়াই শুধু প্রোটিনের গেট খোলা-বন্ধের নিখুঁত যান্ত্রিক ও রাসায়নিক হিসেবে শৈবালটি বুঝতে পারে আলো ঠিক কোন দিকে আছে এবং সোজা সেই আলোর উৎসের দিকে সাঁতার কেটে এগিয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ফটোট্যাক্সিস।
দৃষ্টিহীনতা, পারকিনসন্স, স্নায়বিক ও মানসিক রোগ নিরাময়ে অপটাজেনেটিক্সের প্রয়োগ নিয়ে চলছে গবেষণা
পুকুরের এই অতি সাধারণ শৈবালের বেঁচে থাকার কৌশলটি শুধু একটি জৈবিক কৌতূহল হয়েই থাকতে পারত, যদি না যুক্তরাষ্ট্রের দূরদর্শী বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ অন্যভাবে ভাবতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রকৃতিতে প্রাকৃতিকভাবে আলো দিয়ে প্রোটিন বা আয়ন চ্যানেল নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা শৈবালের জন্য রয়েছে, তাকে যদি মানুষের মতো জটিল প্রাণীর স্নায়ুকোষে প্রতিস্থাপন করা যায়, তবে কী ঘটতে পারে! ডাইসেরথ ওই শৈবালের চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিনকে জিনের মাধ্যমে মানুষের স্নায়ুকোষের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে একে একটি ‘আলোক-নিয়ন্ত্রিত সুইচে’ রূপান্তর করলেন।
এভাবেই জন্ম নিল আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের সবচেয়ে বিপ্লবাত্মক পদ্ধতি— ‘অপ্টোজেনেটিকস’। অপ্টোজেনেটিকস আসার পর বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের রহস্য ভেদ করার চাবিকাঠি পেলেন। মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো জট পাকিয়ে থাকে এবং এরা প্রতিনিয়ত বৈদ্যুতিক সংকেতে কথা বলে। সাধারণ অবস্থায় মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোনো অংশ বা স্মৃতি কীভাবে কাজ করে, তা আলাদা করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু অপ্টোজেনেটিকস আসার পর বিজ্ঞানীরা ফাইবার অপটিকসের সাহায্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট নিউরনে আলোর ঝলকানি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তা অন বা অফ করতে পারছেন। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন দেখতে পাচ্ছেন মস্তিষ্কের কোন বিশেষ সার্কিটটি ভয়, আনন্দ, রাগ কিংবা নির্দিষ্ট স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে। শুধু তা-ই নয়, অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং পারকিনসন্স বা অবসাদের মতো জটিল স্নায়বিক ও মানসিক রোগ নিরাময়েও এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ নিয়ে এখন বিশ্ব জুড়ে চলছে জোর গবেষণা।
প্রকৃতির এক অবহেলিত এককোষী শৈবালের বেঁচে থাকার অতিক্ষুদ্র একটি কৌশল যে একদিন মানবসভ্যতার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এত বড় বিপ্লব ঘটাতে পারে, তা হয়তো কউ কোনোদিন কল্পনাও করেনি। মস্তিষ্কের কোনো বালাই নেই যার, সেই ছোট্ট শৈবালের আলো চেনার ক্ষমতা আজ বিজ্ঞানকে নিয়ে গেছে এমন এক উচ্চতায়, যা মানুষের মস্তিষ্ক সম্পর্কে ধারণাকেই চিরতরে বদলে দিয়েছে।
মস্তিষ্কহীন সেই ক্ষুদ্র শৈবাল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রার স্বীকৃতিস্বরূপই ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল। ‘আলোক-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপ্টোজেনেটিকস’ আবিষ্কারের মাধ্যমে স্নায়ুবিজ্ঞানে এক নতুন যুগের ভিত্তি স্থাপন করার জন্য সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে এই তিন বিজ্ঞানীর নাম।



