কেন নেপোলিয়নকে ত্যাগ করেছিলেন ফরাসিরা
ফিচার ডেস্ক

নেপোলিয়নকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক কৌশলবিদ বলা হয়। তিনি তার জীবনে ৬০টিরও বেশি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে মাত্র ৭টি যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। ছবি: সংগৃহীত
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট— একসময় যিনি ফরাসিদের চোখে ছিলেন অপরাজেয়, ফরাসি বিপ্লবের অস্থির সময়ের পর যিনি এনে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামরিক গৌরব আর দিগন্তবিস্তৃত সাম্রাজ্য। কিন্তু ১৮১৫ সালে এসে সেই ফরাসিরাই চিরতরে হাত তুলে নেয় তাদের এই মহানায়কের ওপর থেকে। কেন ফরাসিরা তাদের প্রিয় সম্রাটকে পরিত্যাগ করেছিল, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ শোষণ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস।
নিচে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে উন্মোচন করা হলো সেই কারণগুলো:
লাগামহীন সেনা সংগ্রহ এবং তরুণ প্রজন্মের বলিদান
নিচে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে উন্মোচন করা হলো সেই কারণগুলো:
লাগামহীন সেনা সংগ্রহ এবং তরুণ প্রজন্মের বলিদান
নেপোলিয়নের যুদ্ধ মানেই ছিল লাখ লাখ ফরাসি তরুণের বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি বা 'কনস্ক্রিপশন'। ১৮১২ সালে রাশিয়ার বিপর্যয়কর অভিযানে নেপোলিয়ন প্রায় ৫ লাখ সেনা হারান। এই বিশাল ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং সাম্রাজ্য রক্ষা করতে ১৮১৩ সালে তিনি প্রায় ১০ লাখ নতুন সেনা সংগ্রহের ডাক দেন। এই নতুন সেনাদের একটি বিশাল অংশই ছিল অনভিজ্ঞ কিশোর ও তরুণ, যাদের যুদ্ধের কোনো প্রশিক্ষণই ছিল না। ফরাসি কৃষকরা আর তাদের সন্তানদের এই অন্তহীন যুদ্ধের আগুনে ছুড়ে দিতে চাইছিল না। ফলে ফরাসিদের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করে।
গণহারে দলত্যাগ এবং অবাধ্যতা
গণহারে দলত্যাগ এবং অবাধ্যতা
১৮১৪ সালে যখন যুদ্ধ সরাসরি ফ্রান্সের মাটিতে এসে পৌঁছায় (ক্যাম্পেইন অব ফ্রান্স), তখন ফরাসি জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। যুদ্ধের প্রথম তিন মাসেই ফরাসি সেনাবাহিনী থেকে অবিশ্বাস্য হারে সৈনিকরা দলত্যাগ বা পলায়ন করতে শুরু করে। বহু তরুণ সামরিক দায়িত্ব এড়াতে ফ্রান্সের বিভিন্ন বনাঞ্চলে লুকিয়ে থাকে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা একসময় নেপোলিয়নের ভক্ত ছিল, তারাই এখন এই 'অবাধ্য' বা পলাতক তরুণদের আশ্রয় দিতে শুরু করে। ফরাসিরা বুঝতে পেরেছিল, নেপোলিয়ন ক্ষমতায় থাকলে ফ্রান্স কোনোদিন শান্তির মুখ দেখবে না।
'মহাদেশীয় ব্যবস্থা' বা অর্থনৈতিক অবরোধের মহাবিপর্যয়
নেপোলিয়নের একটি বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল তার অর্থনৈতিক নীতি, যা 'কন্টিনেন্টাল সিস্টেম' বা মহাদেশীয় ব্যবস্থা নামে পরিচিত। এই নীতির মাধ্যমে তিনি ব্রিটেনের সঙ্গে সব ইউরোপের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটেনকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করা। কিন্তু ফলাফল হয় উল্টো। ব্রিটিশ নৌবাহিনী ফ্রান্সের বন্দরগুলো অবরোধ করায় বোর্দো, নঁত এবং মার্সেইয়ের মতো বড় বড় ফরাসি বন্দরগুলোর বাণিজ্য স্তব্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ফ্রান্সের মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী শ্রেণি বিপুল পরিমাণ অর্থের সম্মুখীন হয়। ফ্রাঁর (ফরাসি মুদ্রা) মান হু হু করে কমতে থাকে এবং মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়।
করের বোঝা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
করের বোঝা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ
যুদ্ধের বিশাল খরচ মেটাতে নেপোলিয়ন পরোক্ষ ভোগের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করেন। একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, অন্যদিকে অতিরিক্ত করের বোঝা— সব মিলিয়ে ফরাসি জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। মিত্রবাহিনী যখন ফ্রান্সের মাটিতে প্রবেশ করে, তখন তারা দেখতে পায় ফরাসি জনগণ প্যারিসের দুর্নীতিবাজ ও চোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে। অনেক অঞ্চলে মিত্রবাহিনীকে 'উদ্ধারকর্তা' হিসেবে স্বাগত জানানো হয়। মানুষ বোনাপার্টের চেয়ে 'বুর্বো রাজবংশের' প্রত্যাবর্তনকে বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করে, কারণ তারা জানত বুর্বোরা ফিরলে ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্য আবার শুরু হবে এবং কলকারখানাগুলো সচল হবে।
প্যারিস ধ্বংসের আশঙ্কা ও সিনেটের বিদ্রোহ
প্যারিস ধ্বংসের আশঙ্কা ও সিনেটের বিদ্রোহ
১৮১৪ সালের মার্চ মাসে যখন মিত্রবাহিনী নেপোলিয়নের জেনারেলদের পরাস্ত করে প্যারিসের দোরগোড়ায় চলে আসে, তখন ফ্রান্সের পরিচালনা পর্ষদ বা সিনেট বুঝতে পারে যে নেপোলিয়নের হঠকারিতার কারণে পুরো প্যারিস শহরটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। রাজধানী ও দেশের অস্তিত্ব রক্ষার্থে, ২ এপ্রিল ১৮১৪ সালে ফরাসি সেনেট নেপোলিয়নকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে ভোট দেয়। তার বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন এবং শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার অভিযোগ আনা হয়।
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন এবং অন্তিম পতন
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন এবং অন্তিম পতন
প্যারিস থেকে বিতাড়িত হয়ে নেপোলিয়নকে এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু ১৮১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। তবে ফরাসিদের মনে আর সেই পুরনো উন্মাদনা ছিল না। ইউরোপীয় শক্তিগুলো দ্রুত একত্রিত হয়ে ১৮১৫ সালের ১৮ জুন ঐতিহাসিক 'ওয়াটার্লু যুদ্ধে' নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। এবার ব্রিটিশরা তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের অত্যন্ত প্রত্যন্ত এক দ্বীপ 'সেন্ট হেলেনা'-তে নির্বাসনে পাঠায়, যেখানে কড়া পাহারায় ১৮২১ সালে এই মহানায়কের মৃত্যু হয়।
সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় তথ্য:
সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় তথ্য:
জন্ম ও উত্থান: নেপোলিয়ন ১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট কর্সিকা দ্বীপে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ফরাসি বিপ্লবের সময় একজন সাধারণ আর্টিলারি (কামান শ্রেণি) অফিসার থেকে নিজের যোগ্যতায় তিনি ফ্রান্সের সম্রাট পদে আসীন হন।
কোড নেপোলিয়ন: ১৮০৪ সালে তিনি 'কোড নেপোলিয়ন' বা ফরাসি দেওয়ানি আইন প্রবর্তন করেন। এটি ছিল আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আইন-কানুন, যা আজও বিশ্বের বহু দেশের আইনি ব্যবস্থার ভিত্তি।
সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ: ১৮০৪ সালের ২ ডিসেম্বর নটর ডেম ক্যাথেড্রালে এক জমকালো অনুষ্ঠানে নেপোলিয়ন নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট ঘোষণা করেন। প্রথা ভেঙে তিনি পোপের হাত থেকে মুকুট না নিয়ে নিজের হাত দিয়ে নিজের মাথায় মুকুট পরিধান করেছিলেন।
অপরাজেয় সেনাপতি: নেপোলিয়নকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক কৌশলবিদ বলা হয়। তিনি তার জীবনে ৬০টিরও বেশি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে মাত্র সাতটি যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। অস্টারলিটজের যুদ্ধ (Battle of Austerlitz) তার সামরিক জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
উচ্চতা নিয়ে বিতর্ক: প্রচলিত আছে যে নেপোলিয়ন খুব খাটো ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তার উচ্চতা ছিল প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, যা সেই আমলের একজন গড় ফরাসি পুরুষের সমসাময়িক বা কিছুটা বেশিই ছিল। ফরাসি ও ব্রিটিশ পরিমাপের পার্থক্যের কারণে এই বিভ্রান্তি ছড়ায়।
মিসর অভিযান ও রোসেটা স্টোন: ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়নের মিসর অভিযানের সময় তার সঙ্গে যাওয়া ফরাসি সেনারা 'রোসেটা স্টোন' আবিষ্কার করে। এই পাথরটির মাধ্যমেই পরে প্রাচীন মিসরের হায়ারোগ্লিফিক লিপির রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হয়েছিল।
সূত্র: দ্য কালেক্টর






