সবুজের মাঝে হাসি, ট্রমা কাটানোর পথে মাইলস্টোনের শিশুরা

একদিনের জন্য যেন ফিরে এসেছিল হাসি।
গাজীপুরের পুবাইলের সবুজ প্রকৃতির বুকে একদিনের জন্য যেন ফিরে এসেছিল হাসি। তবে সেই হাসির আড়ালে ছিল এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বয়ে বেড়ানো ভয়, শোক আর দুঃসহ স্মৃতির ভার। গত বছরের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় আহত হওয়া এবং সহপাঠী ও প্রিয়জন হারানো শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ ‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’-এর দ্বিতীয় পর্ব।
রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা ও ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার গাজীপুরের পুবাইলের ছুটি রিসোর্টে দিনব্যাপী এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ছুটি রিসোর্ট পূর্বাচলে।
দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল উন্মুক্ত খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গল্প বলা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, দলীয় কার্যক্রম, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন এবং পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় কাউন্সেলিং। সবচেয়ে আবেগঘন পর্ব ছিল দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্মরণে চারাগাছ রোপণ। প্রতিটি গাছের সঙ্গে যুক্ত করা হয় একজন করে হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের নাম। আয়োজকদের ভাষ্য, এসব গাছ শুধু পরিবেশের জন্য নয়, বরং অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলোর জীবন্ত স্মারক হয়ে থাকবে।
রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার প্রেসিডেন্ট শরীফউল্লাহ বলেন, রোটারির মূল দর্শন মানবসেবা। মাইলস্টোনের শিশুরা যে ভয়াবহ মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব। প্রকৃতির নিবিড় পরিবেশে তাদের মুখে আবার হাসি ফোটানোর এই নিরাময় কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
ছুটি রিসোর্ট পুবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামসুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বাইরেও সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই উন্মুক্ত পরিবেশ শিশুদের মনে জমে থাকা ভয় ও শঙ্কা দূর করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এই উদ্যোগের পরিকল্পনাকারী সাংবাদিক ও রোটারিয়ান শাহনাজ শারমীন জানান, দুর্ঘটনার পর টানা ১২ দিন বার্ন ইনস্টিটিউটে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনিও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, সংবাদকর্মী হিসেবে তিনি যতটা আঘাত পেয়েছেন, শিশুরা তার চেয়েও গভীর ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই উপলব্ধি থেকেই তাদের জন্য এই নিরাময়মূলক আয়োজনের পরিকল্পনা করেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় রেহানা পারভীন শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলায় অংশ নেন। তিনি বলেন, খেলাধুলাই শিশুদের আনন্দে ফিরিয়ে আনার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।
ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেশন পরিচালনা করেন।
পরে আগামীর সময়-কে তিনি বলেন, “শরীরের ক্ষত একসময় সেরে যায়, কিন্তু মনের ক্ষত দীর্ঘদিন থেকে যায়। সেই ক্ষত সারানোর ব্যান্ডেজই হলো ‘মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড’ বা মানসিক স্বাস্থ্য প্রাথমিক সহায়তা।”
দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা শিক্ষার্থী নূরে জান্নাত ইউশা জানায়, এক বছর পেরিয়ে গেলেও সে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। জোরে কোনো শব্দ হলেই ভয় পায়, স্কুলের ঘণ্টার শব্দ শুনলেও আতঙ্কিত হয়। রাতে ঘুমাতে পারে না, দুঃস্বপ্ন দেখে। এমনকি পড়াশোনাতেও প্রভাব পড়েছে। তার ভাষায়, “আগে একটা প্যারাগ্রাফ লিখতে ১০ মিনিট লাগত, এখন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে।”
ইউশা জানায়, দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। নিহত সহপাঠীদের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে সে বলে, “ওদের খুব মিস করি। যদি সামনে পেতাম, আগলে রাখতাম।”
আরেক শিক্ষার্থী জায়না জানায়, দুর্ঘটনায় হারানো বন্ধু নাজিয়া এবং সিনিয়র তাসনিয়া আপুর কথা এখনো প্রতিদিন মনে পড়ে। গেমস ক্লাসে খেলতে গেলেই বন্ধুদের স্মৃতি ফিরে আসে।
শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া জানায়, টিফিন শেষে প্রথম তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতেই তার চোখের সামনে ঘটে ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা, যার স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে।
বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় রেহানা পারভীন আগামীর সময়-কে বলেন, গাছ রোপণের সময় অনেক শিক্ষার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেছে, কারণ তারা এখনো তাদের নিহত সহপাঠীদের গভীরভাবে স্মরণ করে। তাঁর মতে, তিন বা ছয় মাস পরপর কিংবা বছরে অন্তত একবার এমন আয়োজন হলে শিশুদের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে অনেক সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা, রোটারি ক্লাবের কর্মকর্তারা, ছুটি রিসোর্টের প্রতিনিধিরা ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অংশ নেন। আয়োজকদের বিশ্বাস, প্রকৃতির সান্নিধ্য, কাউন্সেলিং ও সম্মিলিত মানবিক উদ্যোগ ট্রমাগ্রস্ত শিশুদের মানসিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।







