আশিক মুস্তাফার গল্প
জলপিপিরা ৩ বোন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘুরতে-ফিরতে, খেলতে খেলতে আদুরে পাখিছানাদের ভাই হয়ে গেল এক পুঁচকে। কেমন করে হলো? কেমন কাটছে দিনগুলো ওদের? পড়ো তো সেই গল্প
দুপুর রোদে এভাবে দাঁড়ানো ঠিক না; তবু বাবুই দাঁড়িয়ে থাকল। নয়ন পুকুরপাড়ে। পুকুরের পুবদিকে গনশার বিল। বিলের শেষ দেখা যায় না। বড়রা বলাবলি করে, এই বিল দিয়ে আগে এখলাছপুরে ডাকাত আসত। আবার এ বিল দিয়েই পালিয়ে যেত। এক বর্ষায় মিরিন্ডা ডাকাত পড়েছিল এখলাছপুরে। মিরিন্ডা ডাকাত মিরিন্ডা খেত আর গ্রামে গ্রামে ডাকাতি করত। বড়রা তার নাম শুনলেই জামা-কাপড় ভিজিয়ে ফেলত! অথচ এ নাম শুনে বাবুই হাসতে হাসতে শেষ। তার বুঝে আসে না; যে ডাকাত মিরিন্ডা খায়, সে আবার ভয়ের হয় কেমন করে? তো, সেবার মিরিন্ডা ডাকাত জিলাপি বুড়ির কানের লতি টেনে নিয়ে গিয়েছিল। কোথায়? অজানা দেশে!
জিলাপি বুড়ি জিলাপি খেত আর সোনার গয়না পরে পাড়া বেড়াত। সকালে এপাড়া, তো বিকালে ওপাড়া। ঘুরত আর কাজির হাট, চাপরাশির হাট ও দূরের মিরগঞ্জ বাজার থেকে জিলাপি এনে আয়েশ করে খেত। ময়রাদের গুণগান গাইত। এই জিলাপি বুড়ির বাড়িতে মিরিন্ডা ডাকাত এসে তার কানের গয়না ধরে টান দেয়। অমনি কানের নরম অংশ গলে গয়না তার হাতে চলে আসে। সেই থেকে রটে যায়, মিরিন্ডা ডাকাত জিলাপি বুড়ির কানের লতি টেনে নিয়ে গেছে।
বউ-ঝিরা এ গল্প শুনিয়ে এখনো ছোটদের ভাত খাওয়ায়। বাবুইও খেয়েছে মিরিন্ডা ডাকাতের গল্প শুনে। তো, এই ভরদুপুরে সে মিরিন্ডা ডাকাতের কথা না ভেবে, মুরগিছানার মতো তিনটা পাখি দেখছে। ছানাগুলো মুরগির বাচ্চার মতো হলেও তাদের গলা তুলনামূলক লম্বা। তারা কচুরিপানার ফাঁকফোকরে লম্বা পা ফেলতে ফেলতে বাবার সঙ্গে খাবার খুঁজছে আর পি-পি-পি... সুরে ডাকছে। আরিফ কাকুই তাকে এই পাখিদের খোঁজ দিয়েছেন। বলেছেন, মা জলপিপি ডিম দিয়ে হারিয়ে যায়। বাকি কাজ বাবাই করে। ডিমে তা দেওয়া থেকে শুরু করে ছানাদের খাবার সংগ্রহ পর্যন্ত— সবই করে বাবা। এ-ও বলেছেন, এই তিনটা ছানাই বোন। আরিফ কাকু এখলাছপুরের পথে পথে ঘোরেন আর পাখিদের সঙ্গে কথা বলেন। বড়রা তাকে ডাকেন পাখি মিয়া বলে। পাখির সঙ্গে তার বড্ড ভাব। পাখিদের নাড়ি-নক্ষত্র তার চেনা!
তো, বাবুই দেখে জলপিপির ছানাগুলোর ওপর দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর সাঁই করে উড়ে যায় একটি ফিঙে। প্রতিবার ফিঙেকে উড়ে আসতে দেখলেই বড় জলপিপিটি শব্দ করে ছানাদের কাছে ডাকে। ছানারাও দৌড়ে বাবার পাখনার নিচে আশ্রয় নেয়। এই ফিঙেটাকে হিস-স্... শব্দ করে তাড়িয়ে দেয় বাবুই। আর তখনই বাবা জলপিপির সঙ্গে চোখাচোখি হয় বাবুইয়ের। একি, জলপিপিটা একটুও ভয় পায়নি তাকে!
ফিঙেটা চলে যেতেই ছানাদের নিয়ে ফের কচুরিপানার ভেতরে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। পোকামাকড় ও জলজ কীটপতঙ্গ ধরে ছানাগুলোকে খাওয়ায় বাবা জলপিপি। আর পি-পি-পি... সুরে ডাকে। নীলচে ধূসর রঙের পাখিটির মাথায় দুই পাশে সাদা লম্বা দাগ। এই দাগ একেবারে ঘাড় পর্যন্ত নেমে গেছে। লম্বা পায়ের রঙ মেটে। পাখনা কিছুটা জলপাই রঙের। ঠোঁটের রঙ সাদাটে। আর চোখ গাঢ় কালো। এত কাছ থেকে সে জলপিপিদের আর কখনো দেখেনি। সে তাদের দেখছে আর মনের ভেতর অন্য রকম এক অ্যাডভেঞ্চার ভাব হচ্ছে। এই পাখিদের পোষ মানানোর কথাও ভাবছে। তার কাঁধে, মাথায় এই ছানাগুলো বসে থাকবে, আর সে এখলাছপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ঘুরবে। ক্লাস করবে। এখলাছপুর বাজারের ভাইরাল তাজু ভাই তার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে। কিন্তু সে তাকে পাত্তা না দিয়ে বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফিরবে! ঢাকায় থাকা তুতুন, রাফিন আর ইফসিদের বলতে পারবে, সে জলপিপি পোষে। এ ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ চোখের পলকে সাঁই করে এসে ফিঙেটা ছোঁ মেরে একটা ছানাকে তুলে নিয়ে যায়। উড়ে গিয়ে বসে বাঁশঝাড়ে। তারপর পাশের কড়ইগাছে।
বাবুই হুমড়ি খেয়ে দৌড়াতে থাকে। দুই হাত তুলে ফিঙেটাকে ভয় দেখাতে থাকে। ফিঙেও নাছোড়বান্দা। বাবুই ঢিল খুঁজতে থাকে। একটা ঢিল খুঁজে পেছন থেকে হাত টেনে জোরসে মারে ফিঙেটার দিকে। ভয় পেয়ে সে ঠোঁট থেকে ছেড়ে দেয় ছানাটাকে। দৌড়ে গিয়ে ছানাটা কুড়িয়ে হাতে নেয় বাবুই। আহা, তুলতুলে ছানাটার বাঁপাশের ডানাটি যেন ভেঙেই গেল।
নিয়ে গেল বাড়িতে। মাকে দেখাল। মা একটু হলুদ বাটা লাগিয়ে পাতলা কাপড় বেঁধে দিলেন ডানায়। বাবুইয়ের চোখে পানি। সে কী করবে, বুঝতে পারছে না। একবার ঘরে যায়, আবার পুকুরপাড়ের দিকে দৌড়ায়। ছানাটার রেস্ট দরকার। মা বললেন, ‘বাচ্চাটাকে তার পরিবারের কাছে দিয়ে আয়।’
বাবুই নিয়ে যায় পুকুরপাড়ে। বাবা পাখি আর ছোট্ট জলপিপির দুই বোন জলাশয় থেকে পুকুরপাড়ে ওঠে ঘুরঘুর করে। বাবাটা ঘোরে আর পি-পি-পি... করে ডাকে। এই ডাক যেন কান্না হয়ে বাজে। বাবুই ছানাটাকে রাখতেই বাবা জলপিপি তার গায়ে গা ঘষতে থাকে। ডানায় ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে। বাবুই এ দৃশ্য দেখে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা গড়িয়ে আসে। সে বাড়ির পথ ধরে। উঠোনে এসে পেছনে ফিরে তাকায়। বাবা জলপিপি ছানাদের নিয়ে তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
সেদিন থেকে বাবুইদের বাড়িতে তারা থাকতে শুরু করে। বাবুইয়ের মা বলেন, ‘ভালোই হলো বাবুই, তোর তো বোন নেই। এখন থেকে এরাই তোর বোন।’ তিন বোনকে নিয়ে বাবুইর যে কী গর্ব!




